in ,

সুন্দরবনে কয়েকদিন (প্রথম কিস্তি)

২০১১ সালকে জাতিসংঘ ‘আন্তর্জাতিক বন বর্ষ ২০১১’ ঘোষণা করেছিল। এই উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ বন বিভাগ এবং সেইফের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উৎসব ২০১১’ আয়োজন করা হয়। উৎসবটি ২৩ থেকে ২৬ ডিসেম্বর সুন্দরবন এলাকায় আয়োজন করা হয়। সেইফে কাজ করার সুবাধে আমিও সুন্দরবনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সঙ্গে সুন্দরবন দেখাও বোনাস হিসেবে পেলাম। ঠিক হল ২২ তারিখ দুপুর তিনটার দিকে রওনা দেব সদরঘাট থেকে লঞ্চে করে। উৎসবে অংশ গ্রহণ করার জন্য যারা সুন্দরবন যাবে তাদের সবার জন্য একটি লঞ্চ ভাড়া করা হলো চারপাঁচ দিনের জন্য। লঞ্চের নাম এমভি জামাল-১। ঢাকা থেকে সরাসরি নদীপথে সুন্দরবন যাওয়ার অভিজ্ঞতা সম্ভবত খুব বেশি মানুষের থলেতে জমা হয় না। এই দিক থেকে আমি বেশ ভাগ্যবান বলতে হবে।

আমার ভাগ্যে এই টাইপের ভ্রমণ বেশ কয়েকটা হয়েছে। যেমন নদীপথে ঢাকা থেকে সরাসরি সেন্টমার্টিন। পায়ে হেঁটে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ। এই টাইপের ভ্রমণগুলা এক কথায় বলতে গেলে অসাধারণ হয়। তবে এই সুন্দরবন ভ্রমণটায় বাড়তি একটা সমস্যা আছে। সেটা হইল যেহেতু অফিসের কাজে যাচ্ছি তাই নানা রকম দায়িত্ব থাকবে।

তাই এটা শুধু নিছক ভ্রমণ না। তবুও কাজের বাইরে ভ্রমণটা হয়তো কিছুটা উপভোগ করা যাবে।

প্রথম দিন
সকালে ঘুম থেকে উঠেই অফিসের দিকে দৌড়, কারণ অফিসে অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে সেগুলো শেষ করতে হবে। আগের দিনই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম তাই ব্যাগ গোছানো নিয়ে কোন দুঃশ্চিন্তা ছিল না। অফিসে কাজ শেষ করতে করতে বিকাল হয়ে গেল। কাজ শেষে সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা দিলাম সাইকেল নিয়ে। ব্যাগটা দিয়ে দিলাম সহকর্মী মাসুম ভাইকে। সদরঘাট পৌঁছাতে পৌঁছাতে পাঁচটার মত বেজে গেল। মালামাল লঞ্চে তুলে দিয়ে সবাই অপেক্ষা করতে থাকলাম মশিউর ভাইয়ের জন্য।

তিনি তখনও লঞ্চ ঘটে এসে পৌঁছাননি আর তাঁকে ছাড়া তো যাওয়াও যাবে না। নিজেদের ভাড়া লঞ্চ বলে রক্ষা, তা না হলে কোনভাবেই এভাবে লঞ্চ দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না। কনকনে শীতের মধ্যে সবাই অপেক্ষা করতে লাগল কখন মশিউর ভাই আসবেন। শুধু যে মশিউর ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা তাও না, অপেক্ষা করতে হচ্ছে নূর ভাইয়ের জন্যও। তিনি কয়েকজনকে নিয়ে কম্বল কিনতে গিয়েছেন। অপেক্ষার প্রহর গণতে শুরু করলাম আমরা। অবশেষে অপেক্ষার প্রহরে ইতি টেনে সবাই সন্ধ্যার দিকে জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হলেন। সবাই লঞ্চে উঠার পর সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিল এমভি জামাল-১। অবশেষে আমরা রওনা দিলাম সুন্দরবনের উদ্দেশে।

লঞ্চের ডেকে তাঁবু করে থাকা। ছবি: লেখক

এর মধ্যে ঘুরে ঘুরে পুরা লঞ্চটা দেখে নিলাম। লঞ্চটা মোটামুটি মাঝারী মানের। তবে বরিশালের মতো অত বড় লঞ্চ না। এই ধরনের লঞ্চে আগেও উঠেছি কিন্তু সেটা অল্প দূরত্বের জন্য। এবারই প্রথম এমন একটা লঞ্চে প্রায় ৪/৫ দিন থাকা হচ্ছে। নিচ তলাটা পুরাপুরি রাখা হয়েছে খাবারের জন্য। আর বিভিন্ন জিনিশপত্র রাখার জন্য। ডেকোরেটর থেকে ভাড়া করে আনা টেবিলচেয়ার সাজিয়ে রাখা হয়েছে যাতে সবাই এখানে বসে খেতে পারে। আরেকটা অংশ রান্নাবান্নার ব্যবস্থা। রান্নার দায়িত্বে টুলু বাবুর্চি। যাঁরা ভ্রমণ বাংলাদেশ, টিওবির গেট-টুগেদার অথবা ম্যাডভেঞ্চার গিয়েছে তাদের কাছে তিনি বেশ পরিচিত।

মনে মনে সবারই প্ল্যান ছিল আসেপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে যাবে। সাথে প্রকৃতির কিছু ছবি তুলবে। কারণ এই সুযোগ এর আগে কেউ পায়নি। কিন্তু লঞ্চ রাতে ছাড়ার কারণে সেই আশার গুড়ে কাদা পড়লো। প্রথম রাতে সবাই জায়গা খোঁজা শুরু করল কে কোথায় থাকবে। অনেকের জন্য ক্যাবিনে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাকি সবার জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কে কোন তাঁবুতে থাকবে সেটা ঠিক করতে করতেই রাতের খাবারের ডাক পড়ল দশটার দিকে। আমার নিজের তাঁবু আছে বলে আমার কোন তাঁবুতে থাকবো সেই চিন্তা নাই। শুধু সুন্দর দেখে একটা জায়গা ঠিক করে তাঁবু সেট করা। বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধ পার হয়ে লঞ্চ তখন মুন্সিগঞ্জ পার হচ্ছে।

আমাদের লঞ্চ এমভি জামাল-১

প্রথম দিন রাতের খাওয়া ঠিক করা হল খিচুরি ও ডিম ভাজা। খাওয়ার পর ছোট একটা মিটিং করে কার কি দায়িত্ব সেটা ভাগ করে দেয়া হল। আমাকে দেওয়া হল খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে। খাবারের মূল দায়িত্বে ছিলেন রিমন ভাই আর রাহাত ভাই। তাঁদের সঙ্গী হলাম আমি আর ইসমাইল। মিটিং শেষ করে ঘুমাতে যাব কিন্তু ইচ্ছা হলো লঞ্চে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে হাঁটতেও ইচ্ছা করলো না ঠাণ্ডার কারণে। তারপর ভোরে আবার উঠতে হবে। তাঁবুতে ঢুকে যখন স্লিপিং ব্যাগে ঢুকবো তখন ঘড়িতে প্রায় ১:৩০ মিনিট।

দ্বিতীয় কিস্তি
শেষ কিস্তি

ফেসবুকে আমার পেইজ:
https://www.facebook.com/liferiderun/

আমার অন্যান্য লেখা পড়তে চাইলে নিচের লিংকে ক্লিক করতে পারেন:
http://liferiderun.net/

ফিচার ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বট-পাকুড়ের সবুজ সংসারে

ময়নামতির দেশে ম্যাজিক প্যারাডাইজে!