পর্বতবিষয়ক চলচ্চিত্র উৎসব এবং পর্বত আরোহনের গল্প

১০ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ঢাকার আই.সি.এম.এ.বি মিলনায়তনে পর্বতবিষয়ক চলচ্চিত্র উৎসব। পর্বতবিষয়ক এই উৎসবের নাম ‘ঢাকা মাউন্টেইন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২০’। উৎসবটির আয়োজক পাহাড়-পর্বতবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘অদ্রি’। দিনব্যাপী এ উৎসবে বিভিন্ন দেশের মোট আটটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। বেশ কয়েকদিন আগে- ডিসেম্বর মাসের শেষেই ‘ভ্রমণগুরু ওয়েব সাইট’ এ আমার একসময়ের সহকর্মী সবুজ ভাই জানালেন, তাঁর অন লাইন ভ্রমণ সাইটে যারা লিখেন তাদের পরিবার অথবা বন্ধুদের নিয়ে তিনি একসঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার মুভিগুলো দেখতে যাবেন। টিকিট সংগ্রহের দায়িত্ব সবুজ ভাইয়ের।

‘ভ্রমণগুরু’র নির্ধারিত লেখকসংখ্যা আটজন। পযর্টক, পর্যটন পরামর্শক এবং একই সঙ্গে লেখক – তারাই অন লাইন ওয়েব সাইটটি- ‘ভ্রমণগুরু’তে নিয়মিত লেখেন।

পর্বতবিষয়ক চলচ্চিত্র উৎসবের সকালের শোতে (১০-১২:৩০) Tha Mountain Life, 121, Safe Haven, Hors piste, Ges Return to Earth, The high road, The Nose Speed Record, United States Joe’s এবং বিকালের শোতে ৪:৩০-৭০০ টায় Return to Earth, The high road, The Nose Speed Record, United States Joe’s মুভি দেখানো হয়। সকালের শোতে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হয়ে উঠেনি। শীতের প্রকোপ আর ছুটির দিনে ঘরের দায়িত্ব শেষে রওনা হলাম দুপুরের পর। সাপ্তাহিক ছুটির কারণে রাস্তা-ঘাট বেশ ফাঁকা। প্রতিদিনের ঢাকার বিপরীত দৃশ্য। ঘণ্টাখানেক আগেই পৌঁছে গেলাম নীলক্ষেতের আই.সি.এম.এ.বি ভ্যেনুতে।

‘ঢাকা মাউন্টেইন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২০’ এর পোস্টার

নীলক্ষেতের আই.সি.এম.এ.বির রুহুল কুদ্দুস মিলনায়তনের আশে পাশে বেশ ভিড়। প্রায়ই আসা-যাওয়ার পথে অতিক্রম করি এ স্থাপনাটিকে। কিন্তু আজ অনেকদিন পর ক্যাম্পাসের ভেতরে আসলাম। একসময়ে আমারও ক্যাম্পাস ছিল – আই.সি.এম.এ.বি । জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স পরিক্ষা শেষে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ভর্তি হয়েছিলাম এখানে। ছবি, আমান, সুমন, মামুন, সুমন্ত, রেবার সঙ্গে সন্ধ্যার ক্লাস শেষে তুমুল আড্ডা। পাশের বিল্ডিং – পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমিতে নিয়মিত ঝালমুড়ি খাওয়া আর জমিয়ে আড্ডা দেওয়া আমাদের রুটিনে পরিণত হয়েছিল। পড়তে এসে বন্ধত্ব হলো অনেকের সঙ্গে, বন্ধু পেলাম কিন্ত আই.সি.এম.এ.বির কোনো ডিগ্রী হলো না। বছর শেষে ৪টি কোর্সের ৩টিতে পাশ করলেও Financial Accounting & Cost Management এ ফেল করায় মনে হলো এ সার্টিফিকেট আমার জন্যে নয়। একাউন্টিংয়ের সঙ্গে তেমন কোনো পরিচয় আমার এ জন্মে ছিলনা। শুধুমাত্র এস.এস.সিতে বাণিজ্যিক গণিত ও বুক কিপিংয়ে ৯৮ পেয়েছিলাম। সে আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে আরোও কিছুদিন ক্যাম্পাস থেকে আসা-যাওয়া করলাম। অবশেষে আমাদের সকলের আই.সি.এম.এ.বি ডিগ্রী অর্জনের দায়িত্ব বন্ধু মামুনের উপর অর্পিত করে আমরা বিসিএসে ঝুঁকে পড়লাম।

‘ঢাকা মাউন্টেইন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২০’ লেখক এবং ট্যুর মেট শেহরীন। ছবি: খন্দকার রিয়াদ

অনেকদিন পর মুভি দেখতে এসে -দেখা হয়ে গেলো অনেক অ্যাডভেঞ্চার পাগলদের সঙ্গে। দর্শনার্থীর সংখ্যা দেখে মনে এরকম অ্যাডভেঞ্চার পাগলদের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দ্রুতই বেড়েছে।

প্রকৃতি বরাবরই আমাকে খুব টানে। অ্যাডভেঞ্চারই হোক অথবা নিসর্গ প্রকৃতি ভ্রমণ- নদী, ঝর্ণা, পাহাড়, সন্ধ্যার আকাশ, আকাশ ভরা তারা, পূর্ণিমা, শরতের ভোর, ঝরা সাদা শিউলি ফুল সবুজ ঘাসে বিছিয়ে থাকা, দিগন্ত জোড়া কাশবন, হেমন্তের বাতাসে পাকা ধানের ঘ্রাণ, শীতের কুয়াশা জড়ানো সবুজ দূর্বা ঘাসের ডগায় সাদা মুক্তোর মতো শিশির বিন্দু – নিস্বর্গ প্রকৃতির সৌন্দর্য আমাকে নিমগ্নতা করে রাখে। ভিতরের শূন্যতাকে আরও রিক্ত করে। তখন শূন্যতায় যেনো ঘর নয় বাইর আমাকে ডাকে। ডুবে যেতে ইচ্ছে করে প্রকৃতির কোনো নির্জনতায় অথবা অদম্য কোনো অ্যাডভেঞ্চারে।

মনে মনে হিসেব করলাম, মনে হলো, আমার ভ্রমণের কিছু গল্প আছে- গল্পগুলো বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে। এইসব গল্প পাঠকদেরকে বলি, প্রকাশিত অথবা অপ্রকাশিত- এগুলো আর আমার গল্প নেই, সবই যেনো রূপকথার গল্প। আমার গল্পগুলো যেন রূপকথার আয়না। নিজেকে দেখা কিন্তু ঠিক দেখতে যেমন নয়, যা দেখতে যেমন হয়-তেমন।

পর্বত আরোহন, পর্বতের জীবনযাপন আর বাই সাইকেল রাইড নিয়ে দেখা মুভিগুলো দেখে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম।

বছর কয়েক আগের কথা; সালটা ছিল ২০০৩। তখনও বাংলাদেশে ট্রেকিং রেওয়াজ সেভাবে শুরু হয়ে উঠেনি। সেবার ভারত ভ্রমণে গন্তব্য ছিল – দেরাদুন, সিমলা, নৈনিতাল, দিল্লী। হাওড়া থেকে যাত্রা করে দুন এক্রপ্রেসে দুই দিন দুই রাত কাটানোর পর তৃতীয় দিনে সূর্য হঠাৎই বললো – ‘হিমালয়ের ট্রেকিং করবো কী না? পাহাড়ে ২৮ কিলোমিটার হাঁটতে পারবো কী না? সে সময় অবধি ট্রেকিংয়ের কোন পূর্বপ্রশিক্ষণ ছিল না। আমার ৩০ বছর জীবনে তখনও পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা কেবল মাধবকুন্ড আর সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ মন্দির পর্যন্ত । হাওড় এলাকায় বাড়ি হওয়ার কারণে শুকনা মৌসুমে সদর জেলার বাড়ি থেকে গ্রামের বাড়ি আসা-যাওয়ার জন্য কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হয় কিন্তু সেটা পাহাড়ে নয় সমতলে।

সে অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে সূর্যকে প্রশ্ন করলাম – ২৮ কিলোমিটার হাঁটলে কী পাবো?

উত্তরে শুনলাম ‘হিমালয়’।

২০০৩ সালে উত্তরাঞ্চলে কেদারনাথ শৃঙ্গে সূর্য ও লেখক। ছবি: স্থানীয় প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার

কল্পনার চোখে ভেসে উঠলো – শাদা বরফের শৃঙ্গ- হিমালয় আর শেরপাদের ছবি।

২০০২ সালের মে মাসে দার্জিলিংয়ে প্রতিষ্ঠিত তেনজিং নোরগের মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট এ প্রথমবারের দার্জিলিং ট্যূরে কিছুটা সময় কাটিয়েছিলাম। তখন ইচ্ছে হয়েছিলো, নিজের মনে মনে ভাবছিলাম, একটু আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবো কিনা? চেষ্টা করে দেখবো নাকি, শেরপাদের মত পাহাড়ে যেতে পারি কিনা?

দার্জিলিংয়ে তেনজিং নোরগের মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে লেখক। ছবি: এম হোসাইন সবুজ

হিমালয়ের শৃঙ্গ কেদারনাথ

পাহাড় আর সমুদ্রের দূর্গম প্রকৃতির বন্য সৌন্দর্য আমাকে অনেক বেশি মুগ্ধ করে। ২০০৩ সালে হিমালয়ের শৃঙ্গ – কাঞ্চনজঙ্গার সঙ্গে প্রথম দেখা দার্জিলিং এ। এক দূনির্বার আকর্ষণ আর রহস্যের চাদর যেনো খুঁজে পাই হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্গায়। সেবছরেই আমাদের প্রথম ট্রেকিংএর অভিজ্ঞতা হয়। রুদ্রপ্রয়াগ থেকে মন্দাকিনীর কিনার ধরে ধরে পৌছে গিয়েছিলাম উত্তরাঞ্চলের চার ধামের অন্যতম হিমালয়ের শৃঙ্গে–তীর্থ কেদারনাথে। গৌরীকু- থেকে চড়াই-উৎড়াই পথে ২৮ কিলোমিটার পায়ে হাঁটার পথ। সেবারে হিমালয়ের শ্বেত-শুভ্র শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গকে দেখেছিলাম হাতের নাগালের দূরত্ব থেকে ।

২০০৩ সালে উত্তরাঞ্চলে কেদারনাথ শৃঙ্গে লেখক। ছবি: সূর্য

বিভিন্ন সময়ে পবর্ত আরোহন অথবা পায়ে হেঁটে পাহাড়ে ট্রেকিং ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে ভ্রমণগুরুতে।

১. ২০১৬ সালে কাশ্মীরে ১১০০১ ফুট উচুতে পেহেলগাঁও এ ট্যুলিয়ান লেক -– উচ্চতা ১১০০১ ফুট

২. ২০১৭ সালে- ভূটানের প্রধান ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির টাইগার্স নেস্টে – উচ্চতা ১০০০০ ফুট

৩. ২০১৮ সালে – নেপালের অন্নপূর্ণা বেসক্যাস্প – ১৩০০০ ফুট

৪. ২০১৮ সালে – নেপালের হিমালয় বেসক্যাস্প – ১৩০০০ ফুট

৫. ২০১৯ সালে ইন্দেনেশিয়ার নুসা পেনিডায় এক ডাইনোসর বীচ

৬. ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম শৃঙ্গ- সান্দাকফু- ১১৯৪১ ফুট

লেখক পরিচিতি:
লেখক, প্রাবন্ধিক ও পরিবেশবিদ। প্রকাশিত বই ‘আমার মেয়েঃ আত্মজার সাথে কথপোকথন, ৭১ মুক্তিযোদ্ধার মা, বাংলাদেশের উপকূল: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য, জীবনীগ্রন্থ সরদার ফজলুল করিম, সম্পাদনা: সরদার ফজলুল করিম দিনলিপি, মাঃ দুইবাংলার সাহিত্য সংকলন, শিশু বিশ্বকোষ ইত্যাদি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top