সীতাকুণ্ড ডায়েরি: বাড়বকুণ্ডের পথে

সকালে মামার নিজ হাতে বানানো চা খেয়ে বের হলাম বাসা থেকে। আজকে আমরা যাবো বাড়বকুণ্ড। আগের রাতে মামা যে আমাদের উপদেশ দিচ্ছিলেন আমরা এতো কেন ঘুরি, সকালে আবার বিদায়বেলায় নিজেই বললেন, ‘আসলে আমিও অনুপ্রেরণা পেলাম। চেষ্টা করবো এখন থেকে ঘুরে বেড়াতে।’ ভ্রমণের কিছুটা সার্থকতা বটে!

তীর্থধামের পথে। ছবি: ফারাবি ভাই

গ্রীন লাইনের কাউন্টারের সামনে অপেক্ষা করছিলাম। একটু পরেই আসলেন রুপম ভাই আর ফারাবি ভাই। মিনিট দশেক পর সাইফ ভাইও হাজির। তেহজীব সহ আমরা রওনা হলাম। আমাদের বাড়বকুণ্ড বাজারে নামতে হলো। সেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন রুপম ভাইয়ের বন্ধু মোস্তফা ভাই। বাড়বকুণ্ড বাজার থেকেই আমাদের গন্তব্যের শুরু। ঢাকা-চট্টগ্রামগামী যেকোন বাসে উঠে বাড়বকুণ্ড বাজার বললেই হবে। বাজার থেকে সোজা হাঁটা শুরু করতে হবে। পথে একটা রেললাইন পড়ে। সেখানে আমরা কিছু ছবিও তুললাম। তারপর হাঁটা ধরলাম। শুরুতে রাস্তা কিছুটা কর্দমাক্ত ছিল।

খুশি ট্র‍্যাকার। ছবি: তামান্না আজমী

আজকে সাইফ ভাই আমাদের গাইড হিসেবে কাজ করছেন। বাড়বকুণ্ড মোটামুটি পুরোটা ঘুরে দেখেছেন উনি। আজকে আমাদের দেখাবেন। আগের দিনই বলছিলেন সাইফ ভাই, এই ট্রেইলে গেলে কতো যে পেয়ারা খাওয়া হবে, আপু! হাঁটা শুরু করতেই দেখলাম, লোকজন ঝুরি ভর্তি করে পেয়ারা নিয়ে ফিরছেন। সবার কমবেশি পেয়ারা বাগান আছে। বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রির উদ্দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। আহা! কি সুন্দর দেশি পেয়ারা। এগুলো তো ঢাকায় চোখেও পড়ে না আজকাল। এক ঘণ্টার কিছু কম সময় লাগলো আমাদের বাড়বকুণ্ড তীর্থধামে পৌঁছাতে।  

মন্দির চত্বরে আমরা। ছবি: সাইফ ভাই
মন্দিরের অংশবিশেষ। ছবি: মোস্তফা ভাই

বেশ কয়েকটা মন্দিরের সমাবেশ এই তীর্থধামে। সবচেয়ে পুরানো মন্দিরটা সম্ভবত কাল ভৈরব মন্দির। এই মন্দিরের কুণ্ডের পানিতে আগুন জ্বলে। বৈজ্ঞানিক কারণটা হচ্ছে, মিথেন গ্যাসের প্রভাব। যতোদূর জানা যায়, এখানে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল।

এরকম একতলা সিঁড়ি ভেঙে কুণ্ডের কাছে যেতে হয়। ছবি: মোস্তফা ভাই
মন্দিরের প্রবেশপথ। ছবি: মোস্তফা ভাই
অগ্নিকুন্ড। ছবি: মোস্তফা ভাই

তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, সীতার অগ্নিপরীক্ষার আগুনই নাকি কিছুটা এখানে এসে পড়েছিল। এবং এই আগুন সবসময় জ্বলে। পানি ছিটালেও নিভে না। কুণ্ডের কাছে যাওয়াই যায় না, এতো গরম! এখন এই অংশটা বাঁধাই করে দেওয়া হয়েছে। অগ্নিকুণ্ডের পাশের পানিতে ক্রমাগত বুঁদ বুঁদ উঠছে আর সেই পানি কিন্তু বেশ ঠাণ্ডা। আমি ভেবেছিলাম পানিটা গরম হবে বুঝি। এই মন্দিরের ব্যাপারে আরেকটা জনশ্রুতি আছে, এখানে নাকি নরবলি দেয়া হতো। যাই হোক না কেন, চারপাশের পাহাড়ঘেরা অরণ্যের মাঝে মন্দিরের অবস্থান বেশ গা ছমছমে অনুভূতি সৃষ্টি করে!

দর্শনার্থী। ছবি: মোস্তফা ভাই
শিবলিঙ্গ। ছবি: মোস্তফা ভাই

মন্দির দেখা শেষ করে আমরা বাড়বকুণ্ড ঝর্ণার খোঁজে বের হলাম। এই তীর্থেই বাংলাদেশের একমাত্র উষ্ণ প্রস্রবন, সহজ বাংলায়, গরম পানির ঝর্ণার অবস্থান। এই পানিতে নাকি গন্ধক মেশানো। হিন্দু ধর্মের অনেকে সেখানে পূন্যের আশায় এবং রোগ নিরাময়ের জন্য ডুব দিয়ে থাকেন। মন্দির থেকে নেমে হাতের বাম দিকের ঝিরিপথ ধরে এগোলে প্রথমে একটা খুম পড়বে। সেটা পার হয়ে কিছুদূর হাঁটলে আরেকটা খুম। এই দ্বিতীয় খুমটা বেশ গভীর। আমরা সাবধানে পার হলাম।

ঝিরিপথ। ছবি: সাইফ ভাই
খুম। ছবি: সাইফ ভাই
পারাপার। ছবি: সাইফ ভাই

তারপর আবার কিছুটা হেঁটে তৃতীয় খুমের সাথে ছোট্ট একটা ক্যাসকেডের মতো আছে। এর উপরেই ঝর্ণাটা। আমরা অবশ্য একেবারেই পানি পাইনি। কিন্তু ঝর্ণাটার যতো কাছে যাচ্ছিলাম, মুগ্ধতা ঘিরে ধরছিল!

অবাক তাকিয়ে রই। ছবি: সাইফ ভাই
ছুটে চলা। ছবি: সাইফ ভাই
আমার একটা পাহাড় কেনার শখ! ছবি: সাইফ ভাই

চারপাশে বিশাল বিশাল সব পাথর পাহাড় ধ্বসের সাক্ষ্য বহন করছে। আর সেই ধ্বসের জন্যেই, পুরো জায়গাটা একটা অন্যরকম আবহ তৈরি করেছে। হয়তো বা পাথরগুলো এভাবে না থাকলে এতো ভালো লাগতো না। ভাবছিলাম, কতো নিষ্ঠুর আমরা মানুষেরা। আমাদের মন ভোলানোর জন্য পাহাড়কে পর্যন্ত ধ্বসে পড়তে হয়। 

গরম পানির ঝর্ণার কাছে। ছবি: সাইফ ভাই
ভয়ংকর সৌন্দর্য। ছবি: সাইফ ভাই
এমন অনেক পাহাড়ও দেখা যাবে। ছবি: তামান্না আজমী

সাইফ ভাই আর ফারাবি ভাই পাথরের উপর দিয়ে হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠে পড়লেন অন্য কোন ঝর্ণা আছে কিনা দেখতে। একটু পরেই ফারাবি ভাই ফিরে বললেন, পুরো ভৌতিক পরিবেশ। মোটামুটি অনেক ট্রেইলেই হেঁটেছি। এই ট্রেইলটা আমারও কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল। খুব সুন্দর আর রহস্যময়ও বটে! আমরা আবার ফিরতি পথে চললাম। ফেরার সময় সেই দ্বিতীয় খুমটাতে সবাই গোসল করলো। আমি অবশ্য নামিনি। ওরা বলছিল, পানি নাকি খুব ঠাণ্ডা। 

পাহাড় ধ্বস। ছবি: তামান্না আজমী
খুমে গা ভেজানো। ছবি: তামান্না আজমী

আবার আমরা সেই ঝিরি পথের কাছে এসে গেলাম। এদিক থেকে আরো বামের পথ ধরলে একটা পাহাড় আছে। সেই পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগলাম। পাহাড়টা খুব সংকীর্ণ পথ। পাহাড়ের গায়েই আবার ফোকরের মতো করা আছে। সেখানে হাত রেখে সিঁড়ির মতো ধাপ বেয়ে উঠে পড়লাম।

ক্লান্তিহীন হেঁটে চলা। ছবি: ফারাবি ভাই
পাহাড়ি মেয়ে। ছবি: সাইফ ভাই
পাহাড়ের গায়ের ফোকরগুলো অদ্ভুত। ছবি: সাইফ ভাই
প্রাকৃতিক তোরণ। ছবি: ফারাবি ভাই

এদিকে আমাদের কিন্তু থেমে থেমে পেয়ারা খাওয়া চলছিলই। কিছু খাচ্ছি, কিছু পকেটস্থ করছি পরে খাবো বলে। এই ট্রেইলে শুধু পেয়ারা বাগান না, দেখলাম বিদেশি গাব, এবং প্রচুর লেবুও পাওয়া যায়। কিছু লোক দেখলাম বাঁশ কাটছে। জিজ্ঞেস করতে জানা গেল, এখানে নাকি প্রচুর বানরের উপদ্রব। বানর দল বেঁধে এসে ফলের বাগান নষ্ট করে। তাই বাঁশের ব্যবস্থা। 

গাছ থেকে পেড়ে খাওয়ার মজাই আলাদা। ছবি: মোস্তফা ভাই
বিদেশি গাব। ছবি: সাইফ ভাই

আমরা এক জায়গায় বসে কলা, বিস্কুট খেয়ে নিলাম সবাই। সাইফ ভাই নিশ্চিত হওয়ার জন্যে স্থানীয় কয়েকজনের কাছে ঝর্ণায় যাওয়ার দিক নির্দেশনা চাইলেন। ওনারা নানারকম ভয়ংকর কথা বলে আমাদের মানা করলেন যেতে। কিন্তু পথে নেমে ফিরে যাওয়া তো শিখিনি। আমরা হাঁটা ধরলাম। কঠিন না মোটেও, সহজ আছে ট্রেইলটা। কিছু সময় পরই একটা ঝর্ণার কাছে পৌঁছে গেলাম। বৃষ্টির অভাবে শুকনো, নিস্প্রভ ঝর্ণা।

প্রাণহীন ঝর্ণা। ছবি: ফারাবি ভাই

চলে গেলাম পরেরটায়। সেটাও একইরকম। এরপর যে ঝর্ণাটা আছে, সেখানে যেতে পারিনি। গভীর খুম এবং জঙ্গলে ঘেরা। যাওয়া সম্ভব না। সাইফ ভাইয়ের খুব ইচ্ছা ছিল আমাদের আরেকটা ঝর্ণায় নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু বাকিরা আর যেতে রাজি হলেন না। অগত্যা, বাড়বকুণ্ড ট্র‍্যাকিংয়ের সমাপ্তি ঘোষণা করে ফিরে চললাম। তবে এই ট্রেইলটা এতো বেশি সুন্দর যে পরের বর্ষায় এখানে আবার যেতেই হবে। তখন নিশ্চয়ই কোন সব ঝিরি-ঝর্ণায় গা ভেজাবো, ভাবছিলাম আমি। 

ভূতূড়ে খুম। ছবি: তামান্না আজমী
ঐ দূর পাহাড়ের ধারে। ছবি: ফারাবি ভাই

ট্রেইল থেকে বের হতে ঘণ্টা দেড়েকের মতো সময় লাগলো। রুপম ভাই বলছিলেন, আমার গোসল করতে হবে। সেদিন প্রচণ্ড রোদ ছিল আর গরমটাও পড়েছিল বেশ। হাঁটতে হাঁটতে একটা পুকুর পেয়ে গেল ওরা। দেরি না করে একেকজন ঝাঁপ দিল পুকুরে। অনেক সময় নিয়ে গোসল করলো সবাই। দুই তিনটা বাচ্চা ছেলেও ছিল সেখানে। জিজ্ঞেস করলাম, এই গ্রামের নাম কি? উত্তরে জানালো, গ্রামের নাম অনন্তপুর, আর পুকুরের নাম তালপুকুর। চমৎকৃত হয়ে গেলাম! ঠিক যেন হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের কোন পাতায় বসে আছি। নাম শুনে মায়া পড়ে গেল! 

অনন্তপুর গ্রামের তালপুকুর। ছবি: তামান্না আজমী
ডুব। ছবি: তামান্না আজমী

গোসল সেরে পরে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম সবাই। যদিও তখন বিকেল হয়ে গিয়েছে। আমাদের মোস্তফা ভাই বাঁশবাড়িয়া যাওয়ার বাসে উঠিয়ে দিলেন। আমরা নেমে গেলাম বাঁশবাড়িয়া বাজার। বাজারের ভেতর দিয়ে সরু পিচ ঢালা পথে সিএনজিতে মিনিট দশেক লাগে সমুদ্র উপকূলে পৌঁছাতে। এই সমুদ্র সৈকতের মূল আকর্ষণ হল, প্রায় আধা কিলোমিটারের বেশি একটা লোহার ব্রীজ, যার উপর দিয়ে হাঁটা যায় সমুদ্রের বুকে। জোয়ারের সময় ব্রীজটা পানির নিচে চলে যায়।

সাগরের সৈকতে। ছবি: ফারাবি ভাই
দুর্বার, দুর্বিনীত আমি সাগরের মতো। ছবি: মোস্তাক হোসেন

এটাকে যদিও সমুদ্র সৈকত বলে সবাই, গুগল ম্যাপে এটাকে খাল হিসাবে দেখায়। আসলে এটা বাঁশবাড়িয়া ঘাট, এখান থেকে সন্দ্বীপ যাওয়া যায়। তবে এখানে সমুদ্রের মতোই বড় ঢেউ আছে। আছে সারি সারি ঝাউ গাছ। বিশাল একটা বালুময় চরও জেগেছে সেখানে। খুব ভালো লাগছিল পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। ঢেউগুলো এসে পায়ে বাড়ি খাচ্ছিলো। দূরে সূর্যটা অস্ত যাচ্ছিলো। অপার্থিব কয়েকটা মুহূর্ত ছিল। 

আবার এলো যে সন্ধ্যা। ছবি: তামান্না আজমী
আমাকেও সাথে নিও, নেবে তো আমায়? ছবি: ফারাবি ভাই

সন্ধ্যা নেমে এলো। আমাদেরও যাওয়ার সময় হয়ে গেল। সৌভাগ্যবশত সেখান থেকেই ঢাকার বাস পেয়ে গেলাম। সাইফ ভাই খুব করে বলছিলেন ওনার বাসায় যাওয়ার জন্যে। এই যাত্রা অপারগতা প্রকাশ করলাম। কিছু বাকি রেখে যেতে হয়। নাহলে আবার ফেরার তাগিদ থাকে না। 

ট্রেইলের ভিডিও দেখতে চাইলে ক্লিক করুন নিচের লিংকে:
https://youtu.be/p5iUKuJrV5k

আমার পুরানো ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন এই লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে জায়গা নোংরা করবেন না। ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: সাইফ ভাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top