fbpx

নারিকেল জিঞ্জিরায় জোৎস্না রাত্রি-প্রথম পর্ব

সেন্ট মার্টিন নাম শুনলেই কেমন যেনো বিদেশ বিদেশ লাগে, নামটা ঠিক আমাদের দেশীয় নয় এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ব্রিটিশ ভূ-জরীপ দল এই দ্বীপকে ব্রিটিশ-ভারতের অংশ হিসাবে গ্রহণ করে। জরীপে এরা স্থানীয় নামের পরিবর্তে খ্রিষ্টান সাধু মার্টিনের নামানুসারে সেন্ট মার্টিন নাম প্রদান করে। এরপর ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের বাইরের মানুষের কাছে, দ্বীপটি সেন্ট মার্টিন নামেই পরিচিত লাভ করে।

সেন্ট মার্টিন জেটিতে কেয়ারী ভ্রাতৃদ্বয়। ছবি: লেখক

নামকরণ যাই হোক এই দ্বীপের সৌন্দর্য অতুলনীয় সে বিষয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই।যারা কয়েক যুগ আগে গিয়েছেন তারা নাকি আরো অনেক বেশি সুন্দর দেখেছেন কিন্তু আমরা এখনো যতটুকু দেখতে পাই আমাদের দেশের তুলনায় সেই বা কম কিসে?

গতবছর মৌসুম শেষ হয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু যাবো যাবো করে আর যাওয়া হয়ে উঠছিলো না ঠিক, বসন্তের এক উদাস দুপুরে রাজনগরের মাথিউরা চা বাগানের মাঝখানে চমৎকার এক লেকের পাড়ে বসে সেবাস্তিন দাদা আর আমি প্ল্যান ফাইনাল করে ফেললাম এপ্রিলেই চলে যাবো সেন্ট মার্টিন। কিন্তু উনি আবার সংসারী মানুষ বউ-মেয়ে থাকে বগুড়ায় আর উনি থাকেন চায়ের দেশে। সাথে সাথে মূঠোফোনে হয়ে গেলো আলাপ তারাও রাজী এক পায়ে, এবার আর থামায় কে?

টিপু ৭ যাত্রী তোলায় ব্যস্ত। ছবি: লেখক

এর মধ্যে চাটগাঁইয়া বদ্দা আসিফ ভাই ফাইনাল প্রুফ শেষ করে কোথায় যাবে ভাবতে ভাবতে আমাকেই ফোন করলো আমাদের প্ল্যান শুনেই একমত হয়ে গেলেন একসাথে যাওয়ার জন্য ওনারা চট্টগ্রাম থেকে যোগ দিবেন ৩ জন ও ঢাকা থেকে ৪ জন হবু ডাক্তার আপা।

এতটুকু পর্যন্তই শেষ হতে পারতো কিন্তু না বিকেলে বাসায় ফিরে যখন এই প্ল্যান আমাদের জয়িতা দি শুনলো সাথে সাথেই স্বপরিবারে যাওয়ার জন্য চরম আগ্রহী হয়ে গেলো এবং এটাও নিশ্চিত করলো সিলেট থেকে ছোটভাই নিলয় আর ঢাকা থেকে দুই দেবর যুক্ত হচ্ছে আমাদের সাথে এমন করে হয়ে গেলাম ১৫ জন।

নাফ নদী পাড়ি দেওয়া শুরু করতেই সঙ্গ নিলো গাঙচিলের দল। ছবি: আসিফ ভাই

কোথায় থাকবো ভাবতেই মনে পড়লো অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যমেই জেনেছি এই মুহূর্তে নাকি ড্রিম নাইট রিসোর্ট থেকেই সাধ্যের মধ্যে সবচেয়ে সৌন্দর্যময় সমুদ্র উপভোগ করা যায়, সমুদ্র নাকি এসে গড়াগড়ি খায় ড্রিম নাইট রিসোর্টের আঙিনায়। আবার এটাও শুনেছিলাম অনেক আগে থেকেও নাকি রুম পাওয়া যায়না অবশেষে তাদের পেজে নক করে ফোন নাম্বার নিয়ে কথা বললাম, তারা রুমও বুকিং নিলেন আমরাও স্বস্তি পেলাম। এদিকে আসিফ ভাই চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফের সৌদিয়া বাসে টিকেট নিয়ে রেখেছিলেন সাথে কেয়ারী ডাইন অ্যান্ড ক্রুজ শিপের টিকেট। 

নোনা জলে সিক্ত পঞ্চ পাণ্ডব সাথে ব্যাস্ত এক চিত্রগ্রাহ। ছবি: সাদিয়া

আমরা সিলেটী গ্রুপ সকালের পাহাড়ীকা এক্সপ্রেসে চলে আসলাম চট্টগ্রাম, স্টেশনে নেমে চলে গেলাম জামালখানে অবস্থিত ‘মেজ্জান হাইলে আইয়ুন’ রেস্টুরেন্টে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজ্জান গোশতে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। খাওয়া শেষে দামপাড়া গিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা এরমধ্যে আসিফ ভাইসহ তিনজন উপস্থিত, কিচ্ছুক্ষণ পরে বাস ছাড়লো উঠেই ঘুম, সারাদিন ট্রেন জার্নির কবলে সিলেটী পার্টির শরীরে ঘুমের অফুরন্ত চাহিদা।

পেরিয়ে যাই শাহ পরীর দ্বীপ। ছবি: লেখক

সকালে জাহাজ ঘাটে নামার পরে বাথরুমের সিরিয়াল পেয়ে ধন্য হলাম। তারপর নাস্তা সেরে নিলাম। রোহিঙ্গাদের আনাগোনা চারপাশে দেখতে থাকলাম।জাহাজ ছাড়ার সময় হয়ে এলো কিন্তু ঢাকা থেকে যারা আসছে তাদের খোঁজ নেই এখনো, একদম শেষ পর্যায়ে আসলেন তারা উঠে পড়লাম সবাই মিলে জাহাজে। শুরু হলো বাংলাদেশ আর মায়ানমারের সীমান্ত ঘেরা নাফ নদী দিয়ে সেন্ট মার্টিন যাত্রা, জাহাজের সবাই তো যাচ্ছেই সেই সাথে রওনা হলো ডানা জাপটে উড়ে বেড়ানো অসংখ্য গাঙচিল।

মোহনা পেরিয়ে জাহাজ প্রবেশ করলো সমুদ্রে নীল জলের অপরুপ দৃশ্য, যতদূর চোখ যায় শুধুই নীল। এর মধ্যে কিছু অতি উৎসাহী পর্যটক গাঙচিলকে চিপস খাওয়ানো তাদের ঈমানী দায়িত্ব মনে করে চিপস খাওয়ালো। সাথে একজন টিপস বিস্কুট ও দিলো, কিন্তু চিপস আর বিস্কুটের প্যাকেটটা সমুদ্রে ফেলা যে উচিৎ নয় সেই বিষয়টি নিজের দায়িত্ব মনে করলো না, গিয়ে বলার পরেও শুনতে হলো জানেন আমি কে?

ঐ দেখা যায় সেন্ট মার্টিন। ছবি: লেখক

আপনি সমুদ্রে প্লাস্টিক ফেলে দূষিত করেছেন এর থেকে বড় পরিচয় বোধহয় আমার জানার প্রয়োজন ছিলোনা তাই আর জানতে চাইনি, দয়া করে আপনারা কেউ এই কাজটি করবেন না।

তীরের দেখা মিলেছে, এবারা নামার পালা। ছবি: লেখক

দূর থেকে নীল জলের মাঝে নারিকেল জিঞ্জিরা দ্বীপটি দৃশ্যমান হতে শুরু করলো ক্রমশই, একটা সময় জাহাজ ঘাটে ভিরলো সমুদ্রের নিস্তরঙ্গ জলের বুকে যাত্রা এবারের মতো শেষ হলো। ঘাটে নামার পরেই বুঝতে পারলাম কয়েক হাজার পর্যটক পা ফেলেছে এই ছোট্ট দ্বীপটিতে যার দরুন বেড়ে গেছে সবকিছুর দাম ৩০ টাকার ভ্যানভারা অনায়াসে ১০০ টাকা হাকাচ্ছে। রিসোর্টে আগে থেকেই বলে রাখায় রিসোর্টে হায়দার ভাই দুপুরের খাবার তৈরি করে রেখেছিলেন সবাই ফ্রেস হয়ে খাওয়া শুরু করলাম। এখন যেনো এটাই সবচেয়ে বড় কাজ। কোরাল মাছ, আলু ভর্তা, ডাল দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে খেয়ে এবার সমুদ্র জলে নামার পালা।

এবার জলে নামার পালা। ছবি: আসিফ ভাই

ড্রিম নাইট রিসোর্টের একটু বাম পাশে আমরা একটা পার্সোনাল পুল বানিয়ে ফেললাম। ৩ টায় গিয়ে নামলাম আস্তে আস্তে জোয়ার শুরু হলো আমাদের উপরের দিকে নিয়ে আসলো যখন ৫ টা বাজে। আমরা প্রায় অনেকপথ ভেসে চলে এসেছি তীরের কাছে। সূর্যাস্ত উপভোগ করলাম বিচে বসে।সন্ধ্যার পরে জাহাজ ঘাটে খোলা নৌকায় বসে ভেসে আসা বাতাসে সমদ্রের গর্জন শুনে শুনে গল্প চলতে থাকলো বাজারে গিয়ে ফিস ফ্রাই ও খাওয়া হয়ে গেলো এর মধ্যে।

সূর্যাস্তের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ি ফেরা। ছবি: লেখক

রিসোর্টে ফিরে রাতের খাবারের বেশ বড়সড় প্রস্তুতি দেখতে পেলাম হায়দার ভাই খুব ব্যস্ত রূপচাদার বার-বি-কিউ হচ্ছে। সেই সাথে ড্রিম নাইট রিসোর্টের ভয়ংকর সৌন্দর্য চোখে পরলো।ভরা পূর্নিমার রাতে সমদ্রের জল ফুলে ফেপে উঠেছে ঢেউ এসে আছরে পড়ছে রিসোর্টের সিড়িতে, হ্যামকে শুয়ে এ দৃশ্য দেখতে দেখতে অগণিত সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। এই রিসোর্টের প্রধান আকর্ষণ মনে হয় দুইটি হ্যামক, রিসোর্টে যারা থাকেন তাদের মধ্যে একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলে হ্যামক দখলের। হ্যামকে দোল খেতে খেতে সমুদ্রের নীল জল থেকে ভেসে আসা বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে বসে প্রিয়জনের পাশে কাটিয়ে দেওয়া যায় স্মরণীয় কিছু সময়।

ডাক পরলো রাতের খাবারের তাই সবাই উঠে পরলাম। খাওয়াও শেষ হলো কিন্তু বার-বি-কিউর স্বাদ এখনো যেনো জিহবায়, মুখে লেগে আছে। 

ড্রিম নাইট রিসোর্টের ফিস বার বি কিউ। ছবি: লেখক

ভ্রমণ কালীন সময়ে নিজেদের ব্যবহৃত অপচনশীল দ্রব্য যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

ড্রিম নাইট রিসোর্টে যোগাযোগ:
01874-550500

ফেসবুক পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/DreamNightResorts/

ফিচার ছবিঃ সাজু রহমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top