fbpx

রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড: কক্সবাজারের নতুন ভ্রমণ গন্তব্য

কক্সবাজার কয়েক দিন থাকলে অনেকেই খুব বোর হতে থাকে। ঘোরার জায়গার খুব অভাব শহরটাতে। বিশেষত সঙ্গে বাচ্চা-কাচ্চা থাকলে তো আর কথাই নেই, তারাও করার কিছু খুঁজে পায়না। এজন্য কক্সবাজারে ঘুরতে এসে মানুষ বান্দরবনও বেড়াতে যায়। তবে এখন কক্সবাজার শহরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া যায় এরকম একটি জায়গা হয়েছে যার নাম রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড।

আমরা অনেকেই কক্সবাজার গেলে পউষী বা ঝাউবনে খেতে যাই। এ দুটো রেস্তোরা থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট হেটেই চলে যেতে পারবেন রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ডে। আমার পরামর্শ থাকবে এমন সময়ে বের হবেন যাতে ২/৩ ঘণ্টা ফিস ওয়ার্ল্ডে কাটিয়ে একেবারে পউষীতে খেয়ে তারপর হোটেলে ফিরতে পারেন।

রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ডের প্রবেশপথ

আমরা ছিলাম সুগন্ধা সৈকতের কাছে কক্সবাজার সার্ফ ক্লাবে। সেখান থেকে ১০০ টাকা দিয়ে অটো ভাড়া করে সকাল বেলা রওনা দিলাম ঝাউতলায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই কক্সবাজার প্রধান সড়কের সাথেই ৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ সুবিশাল স্থাপণায় পৌছে গেলাম। আমার সাথে ছিলো আমার স্ত্রী আর আড়াই বছরের ছেলে।

রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড সকাল ৯ টা থেকে খোলা থাকে। বন্ধ হয় রাত ১০ টায়। টিকেটের মূল্য ৩০০ টাকা, আর চার ফিটের কম লম্বা বাচ্চাদের টিকেট লাগেনা। এখন কক্সবাজারের প্রায় সব হোটেলের পর্যটন ডেস্কে টিকেট পাওয়া যায়। হোটেল থেকে টিকেট নিলে ফ্রি বাস সার্ভিসও পাবেন।

একুরিয়ামে রাখা বড় বড় মাছ

আমরা অবশ্য সরাসরি গিয়ে টিকেট নিয়েছি। ভেতরে ঢোকার সময় আমাদের একটা ছবি তুলে রাখলো, অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝলাম যাওয়ার সময় এ ছবি আমরা বড় করে প্রিন্ট করে কিনে নিতে পারবো। ভেতরে একটু অন্ধকার, সাগরতলের সাথে তাল মেলাতে একুরিয়ামগুলোর বাইরে আলো কম।

বড় বড় একুরিয়ামের রাখা বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, সাপ, কাঁকড়া, চিংড়ি এসব দেখতে দেখতে এগুতে থাকলাম। প্রতিটি প্রাণীর নামসহ একটি ছোট বর্ণনা দেয়া আছে। প্রথমে ঢুকতেই দেখা মিললো কিছু রঙ্গিন মাছের, যেহেতু আমরা এসব মাছ দেখতে না বরং সমুদ্রে মাছ দেখতে এসেছি তাই এগুলো বাদ দিয়ে এগিয়ে গেলাম।

লবস্টারদের আস্তানা

ভয়ংকর দর্শন বেশ বড় সাইজের পিরানহার দেখা পেলাম। গল্প উপন্যাসে ক্ষুদ্রাকৃতির পিরানহার কথা জানতাম যেটা মানুষ পানিতে পড়লে তাকে কামড়ে কামড়ে খেয়ে ফেলে। এত বড় পিরানহা হলেও তার ভয়াবহ দাঁতের দেখা যাচ্ছিলোনা। আরেকটু এগিয়ে দেখতে পেলাম বিভিন্ন প্রকারের চিংড়ি। এর মধ্যে নোনা পানির বাগদা চিংড়ি, স্বাদু পানির গলদা চিংড়ি, সাদা চিংড়ি (ভানামি) ও লবস্টারের দেখা পেলাম।

লবস্টারগুলো বেশ বড় সাইজের। শান্তভাবেই ঘুরে বেড়াচ্ছে একুরিয়ামে, আমি ভালো করেই জানি সমুদ্রে এরা তীব্রগতিতে ছুটে পালিয়ে যেতে পারে। চিংড়ি ছাড়াও কয়েক প্রকারের কাঁকড়া দেখলাম। যার মধ্যে আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন দুটি কাঁকড়ার দেখাও পেলাম। লাল কাঁকড়াগুলো অবশ্য সৈকতে দেখতেই বেশি সুন্দর লাগে, এখানে কেমন যেন অবহেলায় পড়ে আছে।

মাথার উপরে অদ্ভূত দর্শন শাপলা মাছ

এর মধ্যে একটা জায়গায় মাথার উপরে এবং পথের দুপাশে কাঁচের দেয়াল দেখলাম। এ জায়গাটায় সবচেয়ে বেশি সুন্দর, মাথার উপরে রীতিমতো ভিড় জমে গেছে। অনেকগুলো স্টিং রে প্রজাতির মাছ দেখলাম, স্থানীয় ভাষায় এদেরকে শাপলা মাছ বলা হয়। কাঁচের উপর এদের ঠোট এমনভাবে লেগে থাকে মনে হয় কোন দুষ্ট প্রেতাত্মা আমাদের দিকে তাকিয়ে উপহাস করছে।

আশেপাশে কিছু হোয়াইট স্ন্যাপারদের ঝাক দেখলাম বেশ কয়েকটা। উপরে উঠে একটা জায়গায় থ্রিডি শো দেখানো হচ্ছে দেখলাম, কিন্তু বাচ্চা বেশি ছোট হওয়ায় থ্রিডি শো না দেখেই এগিয়ে গেলাম। সাপ দেখে আমার স্ত্রী হাটার গতি বাড়িয়ে দিলো আর আমার গতি কমে গেলো। ভালোমতো খুঁটিয়ে দেখলাম সাপগুলোকে।

তীব্র বিষধর সি স্নেক

নোনাবোরা আমি আগেও দেখেছি। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশে অহরহ ঘেরে দেখা যায়। মূলত মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে এই সাপ, সামান্য বিষধর তবে সেটা মানুষ মারার জন্য যথেষ্ঠ নয়। অন্য যে সাপটা ছিলো সেটাকে অনেক্ষণ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। ফ্ল্যাট টেইল সি-স্নেক, সমুদ্রের অন্যতম বিষধর সাপ।

সমুদ্র তলদেশের অনেক গভীরে থাকে বলে এবং শান্ত প্রকৃতির বলে এ সাপের কারণে প্রাণহানীর কথা শোনা যায়না, তবে ছোট্ট এই সাপ স্থলভাগের সাপের চেয়ে এর বিষ অনেক বেশি। এত কাছ থেকে এই ভয়ংকর সাপটা দেখে একটু ভয় ভয়ই করছিলো। সাপ দেখা শেষ করে দেখা পেলাম জেলি ফিসের।

স্ন্যাপার

আপাত দৃষ্টিতে অদ্ভূত সুন্দর এ প্রাণীটা স্কুবা ডাইভার ও জেলেদের কাছে আতংকের নাম। সাদা গোলাটে এ প্রাণীটি কি সুন্দর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে একুরিয়াম জুড়ে। সেন্টমার্টিনে একবার মৃত জেলি ফিস দেখেছিলাম, এই প্রথম জীবিত দেখলাম। গায়ে লাগলে কি অবস্থা হবে সেটা ভেবেই গা শিউরে উঠছিলো।

এতক্ষণে কিন্তু শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। একটু হতাশই হয়েছি, বিশাল কোন সামুদ্রিক মাছের দেখা পাইনি। আর প্রাণীগুলোকে কেমন যেন অযত্নে রাখা হয়েছে। সত্যিকারের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে হয়তো আরেকটু সুন্দর করে সাজানো যেত।

Radiant Fish World Cox’s Bazar

গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি:

রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড খোলা থাকে সপ্তাহে সব দিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। তাদের ফেইসবুক পেইজ:
https://www.facebook.com/Radiantfishworld/

এন্ট্রি ফি রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা। সমুদ্রের বিভিন্ন প্রাণী এখানে বাচ্চাদের খেলার জায়গা, স্যুভনির শপ ও রেঁস্তোরা রয়েছে। ঠিকানা; ২৭ ঝাউতলা, প্রধান সড়ক, কক্সবাজার।

ফিচার ছবি সহ সব ছবি লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top