fbpx

পাহাড়ে সবকিছুই অতিরিক্ত: বগালেক

এইবারের গল্পটা একেবারেই অন্যরকম। একটা মেয়ের নিজেকে নতুন করে চেনার গল্প… একটা ছেলের অনুভূতির গল্প… ছোট্ট একটা বাচ্চার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠার গল্প… অচেনা কয়েকজন পথযাত্রীর খুব বন্ধু হওয়ার গল্প…

ফেসবুকে ট্রাভেল গ্রুপগুলোতে সক্রিয় থাকার সুবাদে টিজিবির সাথে পরিচয়। সবার পোষ্ট দেখতাম আর টিজিবির ভূয়সী প্রশংসা পড়ে ভাবতাম ওদের সাথে একটা ট্যুর দেয়া দরকার। ভাবতে ভাবতেই ওদের কেওক্রাডং সামিটের ইভেন্ট চোখে পড়ে মুশতাকের। একে তো নাচুনে বুড়ি, তার উপর ঢোলের বাড়ি পড়লো আর কি! কিন্তু আমি, যার নাকি উচ্চতা ভীতি মারাত্মক… তার পাহাড়ে যাওয়া? তার উপর ৪ বছরের মেয়ে নিয়ে! অসম্ভবের কাছাকাছি। মুশতাককে বললাম, ‘মেয়ে তো পুরো পথ কোলেই থাকবে, তুমি পারবা?’ মুশতাক জবাবে বললো, ‘তোমাদের দুইজনকেই সামলাতে পারবো।’ কি আছে আর জীবনে! রাজি হয়ে গেলাম।

তেহজীব চান্দের গাড়ি পছন্দ করে। ছবি: লেখক

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ রাতে ফকিরাপুল থেকে ডলফিন পরিবহনে রওনা হবো। হাজির হলাম সময়মতো কাউন্টারে। ওখানে হোষ্ট ইমরান ভাই আগে থেকেই ছিলেন। পরিচয় হয়ে গেল। আরেকজন আপু বসে ছিলেন। কথায় কথায় জানা গেল, উনি ফিজিওথেরাপিস্ট শান্তি বর্মণ। আমাদের সাথে ছিল বন্ধু সৈকত। আস্তে আস্তে আমাদের গ্রুপের ১২ জন সদস্য চলে আসলো। তখন শুধু মুখ দেখাদেখি হলো। কারণ বাস এসে গিয়েছে। 

সৈকত বন্ধু ছিল আমাদের সঙ্গী। ছবি: লেখক

বাস ছাড়ার পরই যথারীতি আমরা ঘুমে তলিয়ে গেলাম। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দেখি বাস থেমে আছে আর আমাদের ড্রাইভার সাহেব চরম মার খাচ্ছেন। একটা মাইক্রোর গায়ে ধাক্কা লাগার ফলস্বরূপ মারধর। ওখানেই অনেকটা সময় চলে গেল। মনে মনে ভাবছিলাম কুফাটা মনে হয় লেগেই গেল। ঠিকই… রাত তিনটার দিকে কুমিল্লার কাছে দেখি গ্রীন লাইনের একটা বাস মারাত্মকভাবে পড়ে আছে রাস্তার পাশে। আমরা যাত্রাবিরতির পর বাসে উঠে বসতেই কোত্থেকে একটা লরি এসে ধাক্কা দিয়ে গেল। অল্পের উপর দিয়ে গিয়েছে, নাহলে পত্রিকার শিরোনাম হয়ে যাওয়া লাগতো। এরপর সারা রাত আর ঘুমাতে পারিনি!

যাত্রাবিরতিতে মজা করা। ছবি: লেখক

ভোরের সূর্য যখন উঁকি দিচ্ছে, তখন আমরা ফেনীতে। রাতের ভয়াল স্মৃতি মুছে গেল মন থেকে। আমার মন-প্রাণ তখন ফেনীতে, আমার বাড়িতে! ফেনী পার হয়ে চিটাগাংয়ের পটিয়ায় আটকে গেলাম। প্রায় ঘণ্টা তিনেক একই জায়গায়। বেলা যখন প্রায় বারোটা বাজে, আমরা অবশেষে বান্দরবান পৌঁছালাম। ভোরে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়াতে আমাদের পরিকল্পনাও তাই বেশ কিছুটা ওলট-পালট হয়ে গেল। বান্দরবান পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে, খেয়ে রওনা হলাম রুমা বাজারের উদ্দেশে। চান্দের গাড়িতে সবার সাথে পরিচয় হয়ে গেল। আমাদের সাথে আরো ছিলেন তরিকুল ভাই-আয়শা আপু, তুহিন আপু-ভাইয়া, রাসেল ভাই আর ইমন ভাই।

চান্দের গাড়িতে আমরা। ছবি: ইমরান ভাই

বগালেক যেতে সবচেয়ে বাজে লেগেছে বারবার আর্মি চেকপোষ্টে এন্ট্রি দেয়া। প্রথমে রুমা বাজার নেমে আর্মি চেক ছিল। রীতিমতো একটা অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়েছে। লেকের পানিতে গোসল করা যাবে না, আর করলে যদি মৃত্যু হয় তাহলে কেউ দায়ী থাকবে না!

অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর। ছবি: লেখক

এরপর আরো একবার এন্ট্রি দিতে নামতে হলো। এইবার পুলিশ চেক। সে কিছুতেই আমাদের বগালেক যেতে দিবে না। দুপুর ৩টার মধ্যে পৌঁছাতে না পারলে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। হঠাৎ কোত্থেকে এক লোকের আগমন। দায়িত্বরত পুলিশকে ইচ্ছামতো বকাঝকা করলেন। জানা গেল, ওনার নাম লালা বম। কেওক্রাডংয়ের হেডম্যান। ওনার হাত থেকে বাঁচতেই কিনা কে জানে, পুলিশ আমাদের ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিল। বগালেক যখন পৌঁছাই, প্রায় সন্ধ্যা। সেখানে শেষ আর্মি চেকপোষ্টে নাম-ধাম লিখে আমরা কটেজে উঠলাম। বিশাল একটা কাঠের ঘর। একটা ঘরেই অনেকগুলো খাট। সবাই একসাথে একই ঘরে। মনে হচ্ছিলো বিগ বসের নতুন সিজন শুরু হয়েছে! 

বগালেকের সাইনবোর্ড। ছবি: লেখক

বগা লেক নিয়ে এখানে কিছু বলা উচিত। অনেক গল্প আছে এই লেকের জন্ম নিয়ে। বিতর্ক আছে এর নামকরণ এবং উচ্চতা নিয়েও। তবে বগা লেকের সৌন্দর্য নিয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। দূর থেকেই চোখে পড়ে এই অদ্ভুত সুন্দর সবুজ লেক। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৭০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে ১৫ একর জায়গা জুড়ে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট এই বগা লেক। ভূ-তত্ত্ববিদগণের মতে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে এই লেকের সৃষ্টি। মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। আকাশের নীল আর চারপাশের পাহাড়ের সবুজ রঙ লেকের স্বচ্ছ পানিতে মিলে যায় যখন, লেকটা তখন ঠিক যেন একটি নীলাম্বরী চাদর।

বগাকাইন লেক। ছবি: ইমরান ভাই

বগা লেক নিয়ে দারুণ একটা কল্পকাহিনীও আছে। বগালেককে অনেকে ড্রাগনলেকও বলে থাকে। অনেক অনেক দিন আগে নাকি একটি চোঙা আকৃতির পাহাড় ছিল। দুর্গম পাহাড় ঘন অরণ্যে ঢাকা। পাহাড়ের কোলে বাস করত নানা নৃগোষ্ঠীর মানুষ। সেই পাহাড়ের নিকটবর্তী গ্রামগুলো থেকে প্রায়ই গবাদিপশু আর ছোট শিশুরা ওই চোঙ্গা আকৃতির পাহাড়টিতে যেতো আর ফিরতো না! গ্রামগুলো থেকে অতীব সাহসী যুবকদের একটি দল এর কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে দেখতে পায়, সেই পাহাড়ের চূড়ার গর্তে এক ভয়ঙ্কর দর্শন বগা বাস করে। বম ভাষায় বগা মানে ড্রাগন। তারা কয়েকজন মিলে ড্রাগনটিকে আক্রমণ করে হত্যা করে ফেলে। ড্রাগনটির মৃত্যুর সাথে সাথে ড্রাগনের গুহা থেকে ভয়ঙ্কর গর্জনের সঙ্গে আগুন বেরিয়ে এসে পুড়ে দেয় আশপাশ। নিমিষেই সেই পাহাড়ের চূড়ায় মনোরম একটি পাহাড়ি লেকের জন্ম হয়, যার নাম দেয়া হয় বগাকাইন লেক বা বগা লেক। 

বগালেকে ভালোবাসা। ছবি: শান্তি বর্মণ

বগালেকে যেহেতু নামা নিষেধ, সেখানে ‘মগ পদ্ধতি’ চালু আছে। সেটা এক জিনিস বটে! লম্বা একটা হাতল ওয়ালা মগ। সবাই সেই মগ পদ্ধতিতে লেকের বরফ শীতল পানিতে শরীরের সব ক্লান্তি দূর করে নিল। এরপর আমরা হাঁটতে বের হলাম। রাতের অন্ধকারে অনেকটা দূর চলে গেলাম যেখানে আকাশভরা শুধু জ্বলজ্বল করছে তারা। এতো তারা একসাথে দেখে আমি হা হয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ।

ভোরের বগালেক। ছবি: শান্তি বর্মণ

সারাজীবন ইট-কাঠের শহরে মানুষ হয়েছি। আকাশের দিকে তাকালে জমাট বাঁধা শুধু কার্বন-ডাই-অক্সাইড দেখেছি। পরিষ্কার স্বচ্ছ আকাশ ভরা তারা, এতো বেশি সংখ্যায় যে মনে হচ্ছিলো এতো বড় আকাশটাতেও জায়গার জন্যে যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাদের, এমন দৃশ্য আমার জন্যে অক্সিজেনের কাজ করছিল। জীবনে প্রথম সেখানে আমি খসে পড়া তারা দেখলাম। চট করে চোখ বুজে কি কিছু চেয়েছিলাম?! 

পাহাড়ি পাকা পেঁপে। ছবি: ইমন ভাই

ওখানে ফরমালিন মুক্ত পাকা পেঁপের স্বাদ নিলাম সবাই। খুব মিষ্টি! তারপর রাতের খাবারে আলু ভর্তা, মুরগী আর ডাল গোগ্রাসে গেলা হলো। খাবার অনেক ভালো ছিল। খেয়ে সবাই ঘুম। পরদিন সকালে রওনা হতে হবে পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। শক্তি সঞ্চয় না করলে হবে কেন!

আমরা গিয়েছিলাম ট্যুর গ্রুপ বিডির সাথে, তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো:
https://www.facebook.com/groups/TourgroupBd
ফোন নম্বর: ০১৮৪০-২৩৮৯৪৬

আমার পুরানো ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন এই লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে জায়গা নোংরা করবেন না। ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: ইমন ভাই

Back to top