fbpx

বিলাইছড়ির পথে: বিড়ালের ছড়া

বিলাইছড়ির একজনের কথা না বললেই নয়। সে আমাদের নিজাম ভাই। নিজাম ভাত ঘর এবং বোর্ডিং এর মালিক। তার সাথে আমরা বাসের টিকেট কাটার পরই যোগাযোগ করেছিলাম। তখন থেকেই উনি আমাদের ঝর্ণার পানির ব্যাপারে নিশ্চিত কোন খবর দেননি। ট্রলার দিয়ে আসার সময় স্থানীয়রা ও বলেছিল এ সময় কেন এসেছি, এখন তো ঝর্ণায় পানি থাকে না। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি ঝর্ণায় পানির ব্যাপারে আশা জাগিয়েছিল। এদের কথা শুনে আশার গুড়ে বালি। তবুও মানুষ তো আশা নিয়ে বাঁচে। আমার অবশ্য ঝর্ণা থেকে ঝিরিপথের যাত্রাটা আনন্দদাইয়ক লাগে। দেখা যাক কি হয়।

কাপ্তাই লেক ঘেষে পাহাড়ের বুকে জেগে উঠেছে বিলাই ছড়ি। গহীনে গেলে খুঁজে পাওয়া যায় পাহাড়ি অরণ্য। অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও শহরের জীবন থেকে বিলাইছড়িকে আলাদা করে রেখেছে। না হয় শহরের স্বার্থপর লোকগুলো দলে দলে হানা দিত। এখানে হয়তো এখনও বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার মাঝে ঘুঘু ডাকা দুপুরের আমুদি আলস্য উপভোগ করা যায়। সহজ সরল আদিবাসী ও বাঙালির মেলবন্ধন এখানে না আসলে হয়তো গাড়ভাবে চোখে পড়তো না। কাপ্তাই জেটিঘাটে থাকতেই ফোন দিয়ে রেখেছিলাম নিজাম ভাইকে। বিলাইছড়ি নামার পর আবার ফোন দিলাম। উনি বললেন একেবারে সিড়ি দিয়ে উঠার পথেই পড়বে নিজাম ভাত ঘর।

কাপ্তাইয়ের ভিউ। ছবি: লেখক

আমরা ভুল করে আরও উপরে উঠে গেলাম। উঠে গিয়ে অবশ্য ক্ষতি হয়নি। এ সুযোগে বিলাইছড়ি বাজারটা ক্ষনিকের জন্য দেখতে পেলাম। বাজারে আদিবাসিরা নিয়ে বসেছে নানা রকম পাহাড়ি বনজ ও অপ্রচলিত শাক সবজির পসরা নিয়ে। এর মধ্যে মারফা আর ঢেকিশাক চিনতে পারলাম। এক দাদাকে জিজ্ঞেস করায় দেখিয়ে দিল আদা ফুল, হলুদ ফুল, বাঁশের খোড়ল। এর মধ্যে নিজাম ভাই আবার ফোন দিয়ে জানতে পারলো আমরা ভুল পথে আছি। নতুন করে দিক নির্দেশনা দেবার পর আবার নিচের দিকে নামা শুরু করলাম। উপর থেকে নিচের দিকে হাফ প্যান্ট পড়া এক লোককে দেখতে পেলাম। হাতে মোবাইল। হঠাৎ বেজে উঠলো আমার ফোন। সামনের ব্যক্তিই নিজাম ভাই। হেসে দুজনের ফোন পকেট ঢুকালাম।

সেই পাহাড়ি পথ। ছবি: লেখক

নিজাম ভাই আমাদের নিয়ে গেল তার বোর্ডিংয়ে। ঘড়িতে ১১:২০। আমরা আমাদের ব্যাগ নিজের রুমে রেখে একটু দম ছেড়ে বসলাম। অবাক করা ব্যাপার রিজার্ভ ট্রলার করে যারা এসেছে তাদের অনেকেই এখনও বের হয়নি। অথচ তাদের ট্রলারে নিবে না বলে কত ভাব নিয়েছিল। নিজাম ভাই আমরা চারজন যাবে শুনে আর একটা গ্রুপের সাথে এড করে দিল। তাদের সদস্য সংখ্যা ১২। আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম কারণ ট্রেইলে ঢুকলে কতক্ষণ লাগবে বলা তো যায় না। আবার সুজন ভাইকে বিদায় দিতে হবে। পাচজন এক সাথেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম চিড়চিড়ে রোদে ভরপুর মধ্য দুপুরে। ঠিক বারটা বাজে আমাদের যাত্রা শুরু হবে। ঘড়িতে আর দশটা মিনিট সময় আছে। তো ঘুরে আসা যাক বিলাইছড়ির ইতিহাস থেকে।

প্রিয় নিজাম ভাইয়ের সাথে। ছবি: লেখক

বিলাইছড়ি শব্দটার উৎপত্তি চাকমা ভাষা থেকে। বাংলাদেশ, মায়ানমার ও ভারত এ তিন রাষ্ট্রের বর্ডার বিলাইছড়িতে আসলে দেখতে পাবেন। চাকমা ভাষাতে বিলাই মানে বিড়াল আর ছড়ির মানে পাহাড় হতে প্রবাহিত ঝর্ণা ধারা বা ছড়া। এ নামের কোন সঠিক তথ্য না পাওয়া গেলেও কিংবদন্তি বলে বহু বছর পূর্বে এই বিলাইছড়ি এলাকা ছিল পাহাড়ি অরণ্যের ঘেরা। একদিনে এই পাহাড়ি অরণ্যে কাঠ কাটতে আসে পাহাড়িদের দল। এক মনে গাছ কেটে যাচ্ছিলো। পিছে যে এক বিরাট বন বিড়াল শ্বাস ফেলছে তা হয়তো টের পায়নি পাহাড়িদের দল।

পিছে ঘুরে মুখোমুখি হল বিরাট বন বিড়ালের। এত বড় বন বিড়াল আগে কখনও দেখেনি সেই পাহাড়িদের দল। অবাক বিস্ময় ভাব কেটে গেল বন বিড়ালের হিংস্র ভাবমূর্তি দেখে। তাড়াবার চেস্টা করলো বিড়ালটিকে পাহাড়িদের দল। তাড়াবার চেষ্টা করলে বিড়ালটিও তাদেরকে আক্রমণ করে এবং উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে পাহাড়িদের হাতে বন বিড়ালের মৃত্যু হয়। পরে মৃত দেহ পাড়ায় নিয়ে আসা হলে পাড়া প্রতিবেশিরা এত বড় বন বিড়াল দেখে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রয়। এই ঘটনা উদযাপন করার জন্য বিরাট বড় উৎসব পালন করা হয়। এই ঘটনার পর থেকে অত্র এলাকা বিলাইছড়ি নামে আখ্যায়িত হয়।

ছড়া ছড়া। ছবি: লেখক

এই বিলাইছড়ির অখ্যাত কুখ্যাত একটি থানা হল ফারুয়া। কোন এক সময় শান্তিবাহিনীকে দমন করার জন্য গঠিত হয় এই ফারুয়া থানা। শান্তি চুক্তির পর এই থানা মিশে যায় বিলাইছড়ি উপজেলার সাথে। এখানে আগে প্রায়ই উপজাতিদের বিদ্রোহ দেখা যেত। বর্তমানের বিলাইছড়ি দেখলে কি বলবে এর রক্তের ইতিহাসের কথা। ইতিহাস থেকে এবার ফেরা যাক বর্তমানে।

সুজন ভাইকে বিদায় দেবার পালা এসে গেল। তিনি গেলেন বিলাইছড়ি ট্রলার ঘাটে আর আমরা অপেক্ষায় বসে আছি আমাদের গ্রুপের। এমন সময় ১২ জনের গ্রুপের বাপ্পি ভাই এসে বললো তারা প্রস্তুত। আমরাও তাদের সাথে বের হয়ে গেলাম। রক্তে আবার ছলাত করে উঠলো পুরানো নেশা। পাহাড় ঝিরি ঝর্ণা এ যে আদি কাল থেকেই মানবের আদি বুনো নেশা। চলছে আমাদের দল সামনের দিকে এগিয়ে। নিজাম ভাই বললেন পানির সল্পতার কারণে বাঙালকাঁটা পর্যন্ত যায় না এখন ট্রলার, শুনে হেচকি উঠে আসলো না জানি কি অপেক্ষা করছে। আমাদের সাথে যাওয়া দুজন গাইডকে দেখে আবার অবাক হবার পালা। ১২-১৪ বছরের দুইটা বাচ্চা। একজনের নাম ইকবাল, সে কুরআনের হাফেজ আর একজন শ্রীজন চাকমা। দুজনই এক স্কুলে পড়া বন্ধু। শহরে ছেড়ে এই বিলাইছড়ির পথে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চিত্র মনটা প্রফুল্ল করে তুললো। এবার যেতে হবে বহু দূর।

ফিচার ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top