fbpx

বিলাইছড়ির পথে: উল্টাপাল্টা যাত্রা

দেখতে দেখতে চলে এল ঈদের সময়। কে কোথায় যাবে সেইটা নিয়ে একটা চাপা অস্থিরতা বিরাজ করছে যেন। তিন ঈদ পর এই প্রথম ঈসমাইল ভাই ছাড়া কোন ট্যুর হবে। এবারের প্ল্যানগুলো কেমন যেন ভজভটে হয়ে গেল। ঈসমাইল ভাই দৌঁড় দিলেন সিকিমে আর নাদিম গং পার্টি দৌঁড় দিল মেঘালয়। আমাদের এতিম করে দিয়ে চলে গেল যেন সবাই। আমরা ভেবে ভেবে মরি কোথায় যাওয়া যায়। মাথায় ঠকঠক করে নাড়া দিল ধুপপানি ঝর্ণা। কিছুটা সংশয় নিয়ে চান মিয়া কে ট্যুর প্ল্যানের ব্যাপারে বললাম কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। এই রাজি হওয়া যে কাল হয়ে দাঁড়াবে কে জানতো। সে কথা না হয় গল্পের গতিবেগ বাড়লে না হয় জানা যাবে।

মাথায় রাজ্যের চিন্তা ভর করলো জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে কি ঝর্ণায় পানি পাওয়া যাবে। আমাদের সাথে আকরাম যাবে বিধায় ১০ দিন আগেই কাপ্তাইয়ের বাসের তিনটা টিকেট কেটে ফেললাম। অনেকটা নাক সিটকিয়ে সৌদিয়ার টিকেট নিয়েছিলাম তখনও ভাবতে পারেনি সৌদিয়া কি সপ্ত আশ্চর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে। চাঁদ দেখা কমেডি শেষে এসে গেল খুশির ইদ। ৭ তারিখ রাতে আমরা রওনা হব বিলাইছড়ির পথে। ভেবেছিলাম বিজোড় সংখ্যা নিয়েই হয়ত যেতে হবে রায়হান ফারুক ভাই শেষ মুহূর্তে যুক্ত হয়ে জোড় সংখ্যা হয়ে গেল। তিনি টিকেট পেলেন হানিফ বাসের।

জেটিঘাটের পাশেই বাজার, আর বাজারে তরকারি। ছবি: লেখক

যথারীতি ৭ তারিখ রাত ১১টায় রওনা হল আমাদের বাস। তবে ফকিরাপুল থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত যেতে ঘড়িতে দম দিতে দিতে ১২টা বেজে গেল। আমরা সবাই কম বেশি বিরক্ত। আমার পাশে বসেছে চান মিয়া আর অন্য পাশে আকরাম ভাই। সায়েদাবাদ থেকে ২৪ জনের একটা গ্রুপ উঠার পর ওস্তাদ দিল সেই টান, সব বাস কে পিছে ফেলে রের্কড সংখ্যক সময়ে কুমিল্লায় যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাটায় ১টা বেজে ৯ মিনিটের জানান দিচ্ছে। শেষ কবে ১ ঘণ্টা ৯ মিনিটে কুমিল্লায় এসেছি সে কথা ভাবতে ভাবতে অতীতের অতল গহীনে হারিয়ে গিয়েও খুঁজে পেলাম নাদীর্ঘ প্রতীক্ষিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্বিতীয় মেঘনা সেতু ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু যাত্রী ভোগান্তি এতটা কমাবে তা ছিল কল্পনার বাহিরে।

কুমিল্লায় নেমে ফারুক ভাইকে ফোন দিয়ে জানতে পারলাম তিনি চট্টগ্রামের কাছাকাছি পৌঁচ্ছে গেছেন। তিনি রওনা দিয়েছেন দশটা বাজে তাই আমাদের থেকে এগিয়ে আছেন। কুমিল্লায় আমাদের বেশ দীর্ঘ সময় নস্ট হল। প্রায় ৫০ মিনিট। জাতি হিসাবে আমরা খুব সভ্য কি না তাই ২৪ খানা টিকেট কেটেই বাসখানা নিজের বাপের বাস না ভাবলে তো পাপ হবে। ঠিক দুইটা বাজে কুমিল্লা থেকে রওনা হলাম। সৌদিয়ার দ্বিতীয় ইংনিস তো দেখা বাকি ছিল। এবার সড়ক পথে যেন বিমানের ছোয়া দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সৌদিয়া। কি এনা কি হানিফ শ্যামলী কেউ ছাড়া পাচ্ছে না সৌদিয়ার গতির কাছে। মোবাইলে স্পীড মিটারে ১০০-১১০ এর আশেপাশে দেখা যাচ্ছে গতি। রাত সাড়ে তিনটায় চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করলাম।

আহা কাপ্তাই লেক। ছবি: লেখক

এবার একটু না ঘুমালে যে নয়। ঘুমের রাজ্যে ডুবে যেন গতির সপ্নে বিভোর আমার সত্তা। দুই ঘন্টা ঘুম তন্দ্রা আর সপ্নে পারি দিয়ে কাপ্তাইয়ের রাস্তায় প্রবেশ করার পর ঘুমটা কেটে গেল। ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায় শরীর-মন সতেজ হয়ে উঠলো। বাস চলছে সর্পিল রাস্তায়। আকাবাকা পথে ভোরের সূর্যটা উঁকি দিচ্ছে পাহাড়ের বুকচিরে। মেঘ সরে যেতেই দেখা মিললো সবুজের আচ্ছাদনে ঘেরা পাহাড়। সূর্যের সেই লাল আভা পাহাড়ের গায়ে ছিটকিয়ে পড়ছে, অদ্ভূত এক আলো ছায়ার খেলায় যেন মেতে উঠেছে পাহাড়ের প্রকৃতি। আহা প্রিয় পাহাড় কতদিন পর ফিরে এলাম তোমার মায়া ভরা ভুবনে।

বাস আমাদের কাপ্তাই সেনানিবাসের সামনে নামিয়ে দিল। নেমে আমরা ফারুক ভাইকে ফোন দিলাম। তিনি সাড়ে তিনটা বাজে কাপ্তাই এসে পৌঁছিয়েছেন বিধায় সেন্ট মার্টিন ট্যুরে গিয়ে পরিচিত হওয়া সুজন ভাইয়ের আস্তানা চলে গিয়েছিল। সুজন ভাইয়ের বাবা আবার কাপ্তাই সেনানিবাসে চাকুরি করে, সে সুবাদে ফারুক ভাইকে নিয়ে সেনানিবাস রাউন্ড দেওয়ায় ব্যস্ত ছিল। আমাদের ফোন পেয়ে কাপ্তাই জেটিঘাট যেতে বললো। তারা আসছে আধা ঘণ্টার মধ্যে।

আমাদের ছোট্ট মাঝি বন্ধু। ছবি: লেখক

আমাদের তেমন বিশেষ কোন তাড়া নেই। কারণ লোকাল ট্রলার সেই সকাল সাড়ে আটটায় ছাড়বে আর এখন ছয়টাও বাজেনি। তাই হেলেদুলে জেটিঘাটের দিকে হাঁটা ধরলাম। জেটিঘাট আসার পর এই সাত সকাল এক বিশাল গরু ছাগলের হাটের মত বিশাল ট্র্যাভেলারদের হাট দেখতে পেলাম। আহারে শান্তি। শান্তির মা বোধহয় পরিচিত ট্রেইলে থাকে না। বুঝা হয়ে গেল আজ মুপ্পোছড়া, নকাটার দিকে বেশ ভালই মানুষের ভীড় হবে।

সকাল সাড়ে ছয়টার মধ্যে ফারুক ও সুজন ভাই এসে পড়লো। সুজন ভাই আবার আজকের রাতের বাসেই ঢাকা চলে যাবেন। তবুও ট্র্যাভেলার মনকে তো আর বাঁধা দিয়ে রাখা যায় না। উনিও আমাদের সাথে যাবেন বিলাইছড়ি। এরই মধ্যে ঢাকার গ্রুপ গুলো হেসেখেলে আগে থেকে ঠিক করে রাখা রিজার্ভ ট্রলার করে চলে যাচ্ছে বিলাইছড়ি, আর আমরা আসহায়ের মত তাকিয়ে আছি। এছাড়া আর কি বা করার আছ। দুই একজনের সাথে কথা বলে দেখলাম তাদের ট্রলারে এই পাঁচ অধ্মের জায়গা হবে নাকি। সবাই হতাশার বানি শুনালো। ৫০ জনের ট্রলারে যাচ্ছে ১০-১২ জন এরপরও ৫ জন বেশি নিতে তাদের বড় কষ্ট।

যাত্রা শুরুর পথে। ছবি: লেখক

কষ্টের কাব্য শুনাতে যেন তারা ঢাকা থেকে এসেছে। কি আর করার। লোকাল ট্রলারই ভরসা। তাই ফিরে এলাম আবার কাপ্তাই সেনানিবাসের দিকে। এখানকার এক বাজারে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। ভাত, ডিম, আলু ভর্তা পেটে নিউক্লিয়ার রিএক্টর সেট করে দিল। পুরা ট্যুরেই পারমাণবিক বোম মারা হবে। আগেই অশনি সংকেত যেন দিয়ে দিচ্ছে। আমরা লোকাল ট্রলার ছাড়ার ঠিক ১৫ মিনিট আগে চলে এলাম। পানি কম থাকায় বড় ট্রলার যাবে হাজাছড়া ক্যাম্প পর্যন্ত। সেখান থেকে ছোট ট্রলার বিলাইছড়ি যাবে।

ঘড়িতে ঠিক ৮.৩০ বাজে। আমরা সবাই ট্রলারের ছাদে উঠে বসেছি। বোট রওনা হল এবার বিলাইছড়ির পথে।

ফিচার ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top