in

বিলাইছড়ির পথে: ন-কাটা ঝর্ণা

সবাই গেছে বন পাহাড়ে, শোকে বিড়ি সিগারেট ধরে আহারে। সিগারেটের একটা কটু গন্ধ নাক জ্বালিয়ে দিল। আমার মত খোড়ের ও সিগারেটের গন্ধে আজকাল নাক জ্বলে, কারণ আমি সিগারেট টানা ছেড়েছি এক মাস পূর্তি হল। এখনও এর গন্ধ শরীরে নেশা ধরিয়ে দেয়। মন বলে কন্ট্রোল, দিল বলে মাঙ্গে মোর। তাই একটু সরে আসলাম খোড়দের সমাজ থেকে। তার দুঃখের গীতে সিগারেটের সাথে পীড়িত দেখাক। আমাদের চার জনের গ্রুপ এবার শ্রীজন চাকমাকে নিয়ে সামনে আগাতে লাগলাম।

এবার শুধু নিচের দিকে নামা। বিরাট মানুষের হাট আমাদের খেয়াল করিনি। আমরাও তাদেরকে আর দলে টানেনি। নামতে নামতে সেই পথে আবার এসে পড়লাম যেখানে আমাদের ইকবাল ন-কাটা যাবার পথ দেখিয়েছিল। ন-কাটা ঝর্ণা যাবার পথটা বেশ জঙ্গলা। বৃষ্টির কারণে পিচ্ছিল হয়ে আছেও বটে। শ্রীজনকে জিজ্ঞেস করলাম ওহে জ্ঞান তাপস এই রাস্তা ছাড়া অন্য রাস্তা কি আসে যাবার। সে জ্ঞানীর মত বলে উঠলো না দাদা এখান দিয়েই যেতে হবে। রাস্তা হয়তো এত ভয়ংকর নয় তবে এতটা জঙ্গলা রাস্তা। কাটার গুতা খেতে খেতে নিচে নামছি আর খানিকক্ষণ পর পর পা বাজছে গাছের আগাছা, শিকড়ে। আর মাইরে সেই রকম পিচ্ছিল। অসাবধান বশত এই প্রথম একটা আছাড় খেলাম। তবে নিচে নামার পর ঝর্ণার ফ্লো দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল।

ভ্রমণসঙ্গী ফারুক, ফারুক দুবাই না গেলেও ঝর্ণা দেখতে আসে। ছবি: মুন

এখন হয়তো বর্ষার মত ফ্লো নেই তবুও যা পানি আছে মুপ্পোছড়ার দঃখ ভুলিয়ে দিল। আমাদের দেশে জলপ্রপাত, ছোটখাট ক্যাসকেডকেও ঝর্ণা বলে সে হিসাবে এইটা যে কি সংজ্ঞা দেওয়া মুশকিল তাই ঝর্ণা ভেবে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতে ক্ষতি কি। এবার যে ক্লান্তিকে ছুটি দেওয়া যায়। আর আগে আসার কারণে আমরা চার জন ছাড়া আশেপাশে কেউ নেই। একে একে সবাই ঝর্ণার সাথে ছবি তুললাম। ঝর্ণার শীতল পানি এক নিমিষেই কাটিয়ে দিল সব ক্লান্তি সব অবসাদ। ফিরিয়ে দিল প্রাণশক্তি। আহা কে হায় হৃদয় খুঁড়ে শুনায় পাহাড়ি কান্না। মনে যে আসে পাহাড়ি পদ্য। আমি যে এক ভোকাটা ঘুড়ি। এথায় সেথায় ঘুরি। দেখা পেয়েছিলাম ন-কাটা ঝিরি। ঝিরির পাশে ঝর্ণা। আহারে কি খুশির বন্যা।

ঝর্ণার পানিতে গাঁ ভিজিয়ে এবার ফেরার পালা। কিছুটা আধার সামনে। সূর্যের রশ্মি অরণ্য ভেদ করে আলো আধারির এক অদ্ভূত মিতালি সৃষ্টি করছে। এ মায়া তো অনুভব করতে হয়। ফেরার সময় কোন গ্লানি রাখলাম না। ফিরে আসবো বিলাইছড়ি। না হলে তো আমার কাব্য শেষ হবে না। ধুপপানি আসবো আবার কোন ভরা বর্ষায়। এখন যে পেটে ক্ষুধা চাগাড় দিয়ে উঠেছে। সাথে আনা শুকনা খাবার খেয়ে রওনা দিব এমন সময় দেখলাম নিচের রাস্তা দিয়ে আমাদের সেই ১২ জনের গ্রুপ আসছে। আবার উপরের রাস্তা দিয়েও মানুষ নিচে নামছে। আমরা জ্ঞান তাপস শ্রীজনের দিকে তাকলাম এমন এক ভুবন ভুলানো হাসি দিল আর কিছু বলতে পারলাম। আমি কি জানি টাইপের ভাব।

বিখ্যাত সেই ক্যাপ্টেন মুন। ছবি: লেখক

শ্রীজনকে নিয়ে ঘরে ফেরার আকুতি যে ঢাকার জন্য নয়। তবুও এই অস্থায়ী ঘরের প্রতি এক মায়া জন্ম হয়ে গেছে। ফেরার পথে কোন ঝামেলা হল না। অবাক হলাম আমরা সবার পড়ে বের হয়েছি আর ঢুকলাম বিলাইছড়ি কত তাড়াতাড়ি। এক গ্রুপের ৩ জনকে শুধু দেখলাম। পুরা বিলাইছড়ি পর্যটক শুনশান। আমাদের ঝর্ণা দেখা শেষ হয়ে গেলেও বিলাইছড়ির রাত তো শেষ হয়নি, রাত যে সব সময় যৌবন হয়। সে যৌবনাবতী রাতের ডাক যে ফেলে আসা যায় না।

নিজ ঘরে ঢুকে সবাই গোসল পর্ব সেরে নেতাইয়া পড়লাম। খানিকটা ঘুম তন্দ্রার মধ্যে কাটিয়ে আবার বের হলাম আমাদের রুম থেকে। পেটে ক্ষুধা আর আকাশে দেখা যায় বাকা চাঁদ। যেন কবি সুকান্ত তারা হয়ে প্রলোভন দেখাচ্ছেন। চাঁদের মুগ্ধতা গ্রাস করে সত্তা। ক্ষুধার রাজ্যে তো চাঁদ দিয়ে ক্ষুধা মিটে না তো বিলাইছড়ি বাজারে এসে এক হোটেল ঢুকে কম তেল ভাজা পরোটা দিয়ে রুটির স্বাদ মিটালাম সাথে ছিল ডাল ভাজি ডিম। এতটা ক্ষুধা লেগেছিল যা মুখে দেই তাই অমৃত। রাত তো এখনও যৌবন। আকাশে তাকিয়ে চোখ যে ভারী হয়ে আসে। এর মাঝেও যে ঘোর লাগা কাব্য জমে মনে।

আবার সেলফি

নিঃসঙ্গতার ঘোরে জমাট বাঁধা আঁধারে-পোড়া বুকের ক্যানভাসে এঁকেছি তোমায় পাহাড়, তুমি যে আমায় দিয়েছিলে মৃত্যু নেশার সুধাতোমায় দেখে আজ পথিক এসেছে, সেজেছে আজ বসুধা৷ তোমার বুকে বেয়ে উঠা বাকা চাঁদের মাঝেসৃষ্টির সব প্রাণী জোনাকির আলোয় সাজে, সহস্র তারার দল থোকায় থোকায় জ্বলছে -আজ আকাশ ছোঁয়া উপত্যকার চূড়ায় দাঁড়িয়েচেনা রাতকে অচেনার মাঝে হারিয়ে৷
আজ এই মায়া ভরা রাতে চাঁদের আলোয় স্নান করে মুগ্ধ নয়নেহারিয়ে গেছি মেঘ গ্রাস করা-চাঁদের ওই রূপালী আলোর ছটায়।

গভীর অরণ্যে নিজেকে ঢেকে রেখেনিঃশব্দের মত জেগে থাকে পাহাড়ের প্রকৃতি, পাহাড়ের এই রাতে অদূর থেকে ভেসে আসে- সেই অচেনা পাখির ডাক, আমি শুনে হই নির্বাক রাতের সেই প্রহর শেষে পাহাড়ের বুক চিড়েদিগন্ত বিস্তৃত ওই ঢালে, অবাক করা ভোর নামে।

এরপর সেই দুধ সাদা মেঘের ঢেউ আসে মেঘের কোল ঘেষে ভোরের সূর্যটা যে হাসে, পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে আবার যে জেগে উঠে প্রকৃতিএক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সীমানা পেড়িয়ে – পথিকের সবুজ দেখার আকুতি।

আজ জেগে থাকতে বড্ড ইচ্ছা হয়। তবে যে পাহাড়ি দেবীর অন্য রকম ইচ্ছা। তার শীতল স্পর্শে ক্লান্তি জাকে দেহে ঘুমিয়ে পড়ে সত্তা। ঢুলু ঢুলু চোখে ফিরে এলাম ঘরে। কাল ফিরে যেতে হবে। বিলাইছড়ির অসম্পূর্ণ গল্প হয়তো অন্য কোন দিন শুনাবো। রুমে ফিরে এলাম। আলোচনা হন আমরা পরের দিন কাপ্তাই চলে যাব। কাপ্তাইয়ে ডায়েরি খুলে নতুন গল্পের সন্ধানে ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই। সপ্নে যেন সেই দূরের পাহাড়ি দেবীকে দেখতে পেলাম। হাত নেড়ে যেন বিদায় জানাচ্ছে আমাদের। আবার দেখা হবে বিলাইছড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিলাইছড়ির পথে: মুপ্পোছড়া

ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার সন্ধানে: ডিম পাহাড়ের হাতছানি