fbpx

বিলাইছড়ির পথে: অপূর্ব জলযাত্রা

গ্রীষ্মের তাপদাহে অস্থির জনজীবন। এর ছিটেফোটা কাপ্তাইয়ের আশেপাশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই গরমে কোন ঠাকুর কবিতা শুনাতে আসে না। তবে ট্রলারের একঘেয়ে শব্দ সৃষ্টি করে নতুন কোন সুরতাল। এতে যে ছন্দ আছে ভাই। ট্রলারে ছাদে বসে আমরা পঞ্চ পাণ্ডব উপভোগ করছি এক অপূর্ব জলযাত্রা। সকালের স্নিগ্ধতার রেশ কেটে যায়নি প্রকৃতি থেকে। কাপ্তাই লেকের সবুজাভ জলরাশি কেটে আগাচ্ছে আমাদের ট্রলার। এই জলের খেলা বড় মায়াময়। যেথায় আকাশটা নীলাভ পরিষ্কার সেখানে নীলাভ জলরাশি খেলা করে। আবার যেখানে প্রকৃতি মা তার সবুজের মায়া দিয়ে আগলিয়ে রেখেছে সেথায় পানি সবুজাভ। জলের এই কাব্য দেখতে দেখতে মুগ্ধ এই মন। ধীরে ধীরে লোকালয় ছেড়ে পাহাড় আর জলের রাজ্যের প্রবেশ করছে আমাদের ট্রলার। যত দূর দেখা যায় পাহাড়ের কোলে সবুজের মেলা, জলের মাঝে মাঝে জেগে উঠেছে ছোট ছোট টিলা।

জলে বাসা বাধে জলেশ্বরী। ছবি: লেখক

এসব টিলায় যে মানুষের বাস। দেখে বড্ড হিংসে হয়। আহা আমার যদি একটা পাহাড় থাকতো। কাপ্তাই লেকের মনমুগ্ধকর জলরাশি কেটে কেটে আগাচ্ছে আমাদের স্বপ্ন সারথি। ফারুক ভাই সেলফি নিতে ব্যস্ত, চান মিয়া ফোনে আর আমরা ডুবে আছি প্রকৃতির আপন খেয়ালে। রোদটা বেশ চিড়চিড়িয়ে উঠেছে। তবুও মনজুড়ানি শীতল হাওয়ায় দেহ আমার হাওয়ায় ভাসছে। এই প্রকৃতি ছেড়ে কয়দিন পর আবার যান্ত্রিক জীবনে ফিরে যেতে হবে ভেবে মনটা বিষন্ন হয়ে উঠলো।

চোখ আটকিয়ে গেল জলরাশির মাঝে জেগে উঠা ছোট ছোট টিলা আর সেই টিলার মাঝে জেঁকে থাকা মানুষের জীবনের মাঝে। লেকের নীল সবুজাভ পানি কেটে ঘরে ফিরছে মন পবনের নাও। লেকের নীল ঢেউ কেটে কেটে ঘরে ফেরা মানুষ নিয়ে যাচ্ছে নৌকাগুলো। আহা এক একটা নৌকা যেন পাহাড়ী জীবনের হারিয়ে যাওয়া গল্প। যে গল্পটি শুনতে রাজি নয় শহরবাসী। তবে প্রকৃতির কিছু অবাধ্য সন্তান মাঝে মাঝে সেই গল্পটি দেখতে চলে আসে। জীবন সুন্দর। ট্রলারে ছাদে গাঁ এলিয়ে দিয়ে উপরে দেখছি দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ। কত দিন চিন্তাহীন একটা আকাশ দেখি না। আকাশটা যে ছুয়েছে ওই পাহাড় কে। রাশি রাশি জলের মাঝে পড়ে তার ছায়া। প্রকৃতি তুমি আটকিয়ে রেখেছো আমায় কত মোহ মায়ায়।

লেক ভিউ আইল্যান্ড। ছবি: লেখক

দেখতে দেখতে আমাদের ট্রলার হাজাছড়া ক্যাম্পে এসে পড়লো। সাথে করে আনা জাতীয় পরিচয়পত্র কাজে লাগলো না। আমাদের বোটম্যান সবাইকে লোকাল বলে ভাসিয়ে দিল তার নাও। হাজাছড়া ক্যাম্প ছাড়িয়ে আমাদের ট্রলার থামিয়ে দিল এক ঘাটে। এখান থেকে যাবে ছোট ট্রলার। বর্ষায় অপেক্ষায় যেন বসে আছে কাপ্তাই লেক। পানির সল্পতার কারণে এখান থেকে ছোট ট্রলারই ভরসা।

ছোট ট্রলারে উঠার পর সূর্যের তেজটা যেন প্রখর ভাবে টের পাচ্ছি। বেশি ভাল সাজতে গিয়ে একেবারে পিছে স্যালো ইঞ্জিনের সাথে গিয়ে বসলাম আমরা তিন জন। ফারুক আর সুজন ভাই সামনে রইলো। পুরো যাত্রায় গগণ বিদারি আওয়াজে কানে তালার ঝনঝনানি শুনিয়েছিল। কি একটা অবস্থা। ট্রলার থেকে নামার পরও অনেকক্ষণ কান ঝা ঝা ভাব যায়নি।

আকাশ, ভুমি, জল খুজে কার তল। ছবি: লেখক

যাক ফিরা যাক আমাদের জলযাত্রার শেষ অংশে। আস্তে আস্তে সকালের তেজ বাড়ছে। তবুও সূর্যের আলোটা মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করছে। পাহাড় ভেদ করে আরেক পাহাড় যেন হাজির হয়। জল আকাশ পাহাড় দেখতে দেখতে চলছে আমাদের যাত্রা।

এতটা মধুর যাত্রার মাঝেও যেন মিশে আছে বিষাদ। এই বিষাদ যে শুনায় এক করুণ ইতিহাস। কাপ্তাইয়ের জলে ডুবেছে কত আদিবাসীর ঘর দুয়ার। এই জলেই তো ডুবে আছে মানুষের হাহাকার। সেই পুরানের মৎসকন্যার মত যেন আমার পা ধরে ডুব দিয়ে নিয়ে যেতে চায় জলের গভীরে। সেই গভীর জলের যেন বাসা বেধেছে পাহাড়ি পূর্বপুরুষ। তাদের চোখে নোনা জলের হাসি, বিষ্ময় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে তারা। যেন বলতে চাইছে এই তো সেই কাপ্তাই যা বাস্তুহারা করেছে আমাদের ওহে উত্তর পুরুষ। নোনা জলে ভেসে গেছে আমাদের বেদনার হাসি। এরপরও তোমাদের মন জুড়াবো, নিজেদের পুড়াবো।

ব্রাদার, ভ্রাতা ট্যুরের ত্রাতা। ছবি: লেখক

হাজার মানুষের সপ্নকে বির্সজিত করে আমরা কাপ্তাইয়ের রূপ সুধা পান করতে আসি কতজনই বা এর ইতিহাস জানি। পানির তলায় হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, পাহাড়িদের কান্নার কথা। মাটি হারানোর ইতিহাস বেদনার জলের মত ভাসে কাপ্তাই লেকে। মানুষ গুলোর সপ্ন, জমিজমা, সাজানো শহর ডুবে গেছে কাপ্তাইয়ের জলে। শহর যখন ডুবে যায় রাজার প্রাসাদ ও কি রক্ষা পায়। চাকমা রাজার পুরান রাজবাড়ি কাপ্তাইয়ের জলের নিচে ডুবে গিয়ে যেন নতুন এক রাজ্য তৈরি করেছে। বাস্থহারা মানুষের রাজ্য।

ওই পাহাড়ের বুকে বাসা বাধা কে। ছবি: লেখক

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে আমেরিকার অর্থায়ানে কাপ্তাই বাঁধ নির্মানের কাজ শুরু করে যা শেষ হয় ১৯৬২ সালে। ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট ৬৭০ মিটার উচ্চতার এ বাঁধটি নির্মাণ করে। আজ এই প্রকল্প দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের কি দিয়েছে তার থেকে অনেক বেশি নিয়েছে। ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি ডুবে গিয়েছে এই লেকের জলে। যা এই এলাকার মোট কৃষি যোগ্য জমির ৪০ শতাংশ। সরকারি সংরক্ষিত ২৯ বর্গমাইল বনকে গ্রাস করেছে কাপ্তাইয়ের জল। ১৮ হাজার পরিবারের এক লাখ বাস্তুচ্যূত মানুষ এখনও হয়তো সপ্ন বুনে, দেখে রঙিন ফানুশ।

সভ্যতার কি নির্মম কষাঘাত। শান্ত জলের নিচে লুকিয়ে থাকা দুঃখগাথার ইতিহাসে এতটাই ডুবে ছিলাম কখন যে বিলাইছড়ি এসে পড়লাম টেরই পেলাম না। ঘড়ির কাটাতে বাজে ১১টা। এখনও দিন পড়ে আছে বহু। ট্রলার ঘাট থেকে দেখা যাচ্ছে আধুনিক আর আদিমতার মোড়কে এক নতুন বিলাইছড়ি। আড়ামোড়া ভেঙ্গে ট্রলার ঘাট থেকে হাঁটা দিলাম সেই নতুন বিলাইছড়ির উদ্দ্যেশে।

ফিচার ছবি: লেখক

Back to top