in

পাহাড়ী অরণ্যঘেরা নাপিত্তাছড়া

(প্রথম ট্রেকিং এর গল্প)

পাহাড় যার নাম শুনলে মনে সঞ্চয় হত বিশাল এক ভীতির, আর নিষিদ্ধ এক ভালবাসার। জানি না কেন মানুষের নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি টান থাকে বেশি৷ ১০৮ কেজি ওজন নিয়ে আর যাই হক, পাহাড়ে যাবার মত ফিটনেস না। খুবই বিষণ্নতায় ভুগতাম যখন অনেক বড় ভাইদের পিছে ঘুরার পরও আমায় পাহাড়ে নিতে রাজি হত না। তারা বলতো পাহাড়ে প্রতিটা পদক্ষেপে আছে মৃত্যুর হাতছানি৷ তোমার মত নুবিশ আমাদের সাথে পাহাড়ে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না৷ তোমার জন্য লালমাই টিলা পর্যন্ত যাওয়াই অনেক বড় ব্যাপার।

পাহাড়ের জীবন। ছবি: লেখক

ঘটনাগুলো ছিল ২০১৪ সালের৷ আস্তে আস্তে আমি পাহাড়ে যাবার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তখনই বাংলাদেশের ভ্রমণকারীদের জন্য বিরাট বড় একটা প্ল্যাটফর্ম টিওবি’র মাধ্যমে পরিচিত হলাম ঈসমাইল ভাইয়ের সাথে। তার মাধ্যমে পরিচিত হলাম এক ভিন্ন জগতের বাসিন্দাদের সাথে। এরা অ্যালপাইনিস্ট গ্রুপের সদস্য। অ্যালপাইনিস্ট গ্রুপ যাঁরা গাইড, পোর্টার ছাড়া পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। পর্বতারোহণের এই চর্চাকে অ্যালপাইনিজম বলে। দূর্গম পরিবেশে সারভাইভ করার সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে অ্যালপাইনিমের মাধ্যমে যাচাই করা হয়৷ আগের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছিলাম এই সব হোমড়া চোমড়াদের সাথে আমার ভাত জমবে না।

ওই দূর পাহাড়। ছবি: লেখক

আমি ইতিহাসের মানুষ ইতিহাস নিয়েই থাকি৷ তবে অশ্চর্য ব্যাপার যখন ঈসমাইল ভাই তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলো ভাই কি এই মোটা শরীর নিয়ে পাহাড়ে যেতে পারবে। সেই মানুষটি অনেকক্ষণ চিন্তা করার পর বললো, কস্ট হবে তবে অসম্ভব না। ৯২ কেজি ওজনের এই পান্ডার দেহে শিহরন বয়ে গেল। ঠিক শুনছি তো। এরপর তাদের কাছ থেকে পেলাম পাহাড়ে যাবার বিভিন্ন টিপস৷ ছোটবেলা থেকেই কোন কিছুই ইমপ্লিমেন্ট করতে আমার বেশি সময় লাগতো না৷ প্রচণ্ড সাহস আর মনের জোর দুইটাই ছিল প্রচুর৷ শুরু হল পাহাড়ে যাবার এক মহাযাত্রার৷

সেই পাহাড়ি অরণ্য। ছবি: লেখক

আমার আগের গল্পে চান মিয়ার নাম অনেক শুনে থাকবেন নিশ্চয়৷ নতুন করে বলার কিছু নাই। ২০১৭ সালের ২৮শে এপ্রিল বর্ষার আগে চান মিয়া, ঈসমাইল ভাই আর তার সহকর্মী রাজীবসহ বের হলাম মিরসরাইয়ের পথে। প্রথম ডেস্টিনেশন হ্যান্টিং নাপিত্তাছড়া। ২৮শে এপ্রিল রাত ১১:৪০ মিনিটে যখন ফেনীর বাস ছাড়লো তখন পর্যন্ত জানতাম না কি থ্রিলিং রাইড আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। জীবনে প্রথম এনকাউন্টার করলাম ফেনীর বাস স্টার লাইনের সাথে। স্টার লাইনে উঠার পর আমি এনা শ্যামলী হানিফ পরিবহনের ড্রাইভারদের মন থেকে মাফ করে দিলাম।

ঝিরিতেকে ভিজায় পশ্চাটদেশ। ছবি: লেখক

আমি যেন আধ্যাত্মিক জগৎতের কোন শূণ্যতার ভিতর বিচরণ করতে লাগলাম। পৃথিবী মহাকাশের মাঝখানের কোন শূন্যতায় আমার আত্মা যেন চলে গেল। এমন রাফ ড্রাইভ করে গাড়ির সাথে ড্রাইভার নিজেও কাপে। এনা, শ্যামলী, হানিফ সবাইকে ক্রস করে ফেললো স্টার লাইন। নিজের জাত ভাই এসি স্টার লাইনকেও ছাড় দিল না। কে বলে এনা রাফ চালায়। এনা অনেক ভাল। সে দিন জ্যাম না থাকলে স্টার লাইন আমাদের রাত ৩টা বাজে ফেনী নামিয়ে দিত। আমরা ফেনী এসে পৌঁছালাম রাতে ৪টায়।

হুম ঝর্ণা তোমার নাম ভুলে গেছি। ছবি: চান মিয়া

এতক্ষণ বসে থাকার মানে হয় না। আমরা আমাদের এক বড় ভাইকে ফোন দিলাম। উনি মেইল ট্রেনে করে সীতাকুন্ডু আসছেন। আমাদের ইনিসিয়াল প্ল্যান ছিল খৈয়াছড়া ঝর্ণায় আগে যাওয়া। মোহাম্মদ ইউসুফ রানা ভাইয়ের বয়ান শুনে সেইটা ৩৬০ ডিগ্রি এংগেলে ঘুরে গিয়ে নাপিত্তাছড়ায় ঠেকলো। ঢাকা থেকে ৮ এর অধিক ভ্রমণ গ্রুপ খৈয়াছড়ায় যাচ্ছে। এত প্যারা এত ভীড় ভাল লাগে না। আমরা ভোর ৬টায় নদুয়ারের উদ্দেশে রওনা দিলাম। সড়ক দুর্ঘটনা জনিত জ্যামে বেশ লেট হল। নদুয়ার গিয়ে পৌঁছালাম সকাল ৮টায়। ঢাকা থেকে আর একটা ছোট গ্রুপ এসেছিল তারা অপেক্ষা করছিল অন্য একটা গ্রুপের সাথে যোগ হতে। আমরা আসার পর ৭ জনের বেশ বড় একটা গ্রুপ হয়ে গেলাম। গাইড ঠিক করে নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে হাঁটা শুরু করলাম।

হুম আবার ঝর্ণা। ছবি: লেখক

গ্রামীণ এই আঁকাবাকা পথে হেঁটে যাচ্ছি এই দূর পাহাড়ের ডাকে। গ্রাম থেকে দেখা যাচ্ছে সকালের শেষ মেঘগুলো এই পাহাড়ের সবুজ অরণ্যে হারিয়ে যাচ্ছে৷ আস্তে আস্তে হেঁটে চলে আসলাম এই পাহাড়ের পাদদেশে৷ শুরু হল আমাদের প্রথম ঝর্ণা বান্দরখুমের পথে যাত্রা। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝিরি পথে ঝর্ণার পানি নেমে আসছে। প্রথম ঝিরির পানির স্পর্শে এক অপূর্ব সিগ্ধতায় দেহ প্রাণ ভরে গেল৷ ঝিরির পানির বয়ে যাওয়া শব্দ কর্ণ কূহরে কুল কুল করে বাজে। এক অপরূপ মায়াময় নারী যেন আমাকে ডাকছে তার পানে। যতই ধরতে যাই তাকে সরে সরে যায়৷ একটু হাঁটার পর পেলাম পাহাড়ী অরণ্যে ঘেরা এক ঝিরি পথ। এই ঝিরির নাম অনুসারে হয়তো এই ট্রেইলের নাম হয়েছে নাপিত্তাছড়া। পাহাড় ঘেরা এই গভীর অরণ্যের যত ভিতর প্রবেশ করছি ততই মনে হচ্ছে বিভূতি’র কোন পাহাড়ী গল্পে ঢুকে যাচ্ছি৷

কুপিকাটাকুম। ছবি: লেখক

ছায়াঘন নিবিড় গাছ-গাছালির মাঝে পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দে নিজেকে যেন হারিয়ে ফেললাম৷ বর্ষার আগে পথ যে ভয়াবহ পিছুল হতে পারে এ নিয়ে আমার কোন ধারনা থাকার কথা না। পেগাসাসের স্যান্ডেল জোড়া বিদ্রোহ করে বসছে এই নধরকান্তি দেহের কাছে। উচু নিচু ছোট বড় টিলা পার করতে গিয়ে অল রেডি কুকুরের মত হাপাচ্ছি৷ হৃদপিণ্ড ধপাস ধপাস করে বাড়ী খাচ্ছে। ভাগ্য খুব ভাল ট্রেকিংয়ের হাতে খড়ি মানে আমার ওস্তাদ ঈসমাইল ভাই সাথে ছিল।

ঝিরিতে শান্তি। ছবি: লেখক

শরীরে ভর করেছে যেন জন সিনার আত্মা। নেভার গিভ আপ, নেভার গিভ আপ৷ দূর্গম এই বন্ধুর পথ পারি দিয়ে এসে পড়লাম বান্দুরাখুম। এপ্রিল মাসের ঠা ঠা রোদে এক মাত্র কাল বৈশাখী আসলেই ঝর্নায় পানি আসার কথা চিন্তা করা যায়৷ শুষ্ক বান্দুরাখুম থেকে চিকন স্রোতধারার পানি বেয়ে নিচে পড়ছে৷ জীবনে পর্যটক ঝর্ণা বহু দেখলাম কিন্তু এই প্রথম গহীন অরণ্যে ট্রেক করে কোন ঝর্ণা দেখতে আসলাম। সে অনুভূতি তো ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না৷ বান্দুরাখুম আসার পথে ঝিরিপথের আলো ছায়া খেলার মাঝে কোন যে আফিম মিশানো ছিল৷ যার নেশা আজ পর্যন্ত ছাড়তে পারলাম না৷ স্মৃতিচারণে অনেক কিছুই মনে থাকে না৷ এই ২০১৮ সালের আগস্টের ২ তারিখ আমি নাপিত্তাছড়ার ছবি দেখে দেখে মস্তিস্ক থেকে গল্প বের করছি৷ গল্পটি এখানেই শেষ নয় পা বাড়াই মধুছড়ির পথে৷ গাইড সাহেব এই নামই বলেছিল স্মৃতি যদি ধোকা না দেয়৷

ওই দূর পাহাড় ডাকে রে। ছবি: লেখক

ঝর্ণা দেখে পানি পান করে রওনা হলাম এই ট্রেইলের দ্বিতীয় ঝর্ণা মিঠাছড়িতে। যাবার পথে সুন্দর একটা ক্যাসকেড (বাংলায় যাকে ছড়া বলে) পড়লো, এখানে ফটো সেশন করার পর হাটা ধরলাম। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম মিঠাছড়ি। মাথার তালু ততক্ষণে জ্বলতেছিল। একবার পা হড়কাইয়া পড়তে গিয়ে ব্যালেন্স করে ফেলেছিলাম। কিন্তু পায়ের রগে এমন টান পড়লো পুরা ট্রেইল ব্যাথা নিয়ে হাঁটতে হল। তবে সুখের খবর সবাই খইয়াছড়ায় যাওয়ায় এই ট্রেইল ছিল পুরা জন-মানবহীন। আর এই ট্রেইলের ঝর্ণাগুলাও বেশ সুন্দর। তবে সিজন না থাকায় বেশি পানি নাই। বর্ষায় নিশ্চয় দানবীয় রূপ ধারন করে। মিঠাছড়ি নাপিত্তাছড়া ট্রেইলের সব থেকে দৃষ্টিনন্দন ঝর্ণা। আহা তুমি কত সুন্দর মিঠাছড়ি। জগৎ এর সব শুষ্কতা নিয়েও জায়গা করে নিয়েছো পথিকের মনে৷ উপর থেকে চিকন স্রোতধারা নিচের দিকে এসে যেন কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে৷

ঝিরি। ছবি: লেখক।

এটা দেখা শেষ করে এই ট্রেইলের শেষ ঝর্ণা কুপিকাটাকুমের দিকে রওনা হলাম। কুপিকাটাকুম যাবার পথেই আমাদের গাইড রুহুল আমিন ভাই বলতেছিল গত বছরে এই ঝর্ণায় আসার সময় শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মারা যায়। এখানকার ঝিরি পথ বেশ পিচ্ছল। তাই আমাদের টিলা পথে নিয়ে এসেছে বান্দুরাখুম থেকে। কথা বলতে বলতে এসে পড়লাম কুপিকাটাকুম। মা শা আল্লাহ অনেক সুন্দর ঝর্ণা, ঝর্ণাতে পানির পরিমাণও ভালোই। ঝর্ণাটির সামনের পানির অংশটি কিছুটা গভীর। তাই একেবারে ঝর্ণার সামনে যেতে হলে আপনাকে সাঁতার কেটে যেতে হবে। এই রকম ন্যাচরাল সুইমিং পুল পেলে নিজেকে ধরে রাখা দায়। কিছুক্ষণ পানিতে ঝাপাঝাপি করে আবার নদুয়ার বাজারের উদ্দ্যেশে রওনা দিলাম। এখানে একটা হোটেল আছে চা পর্ব শেষ করে মেইন রোডের দিকে হাঁটা ধরলাম। মিশন খৈয়াছড়া।

ছড়া। ছবি: লেখক।

বড়তাকিয়া আসার পর আবার সিএনজি। সিএনজি যেখানে নামিয়ে দিল সেখান থেকে হাঁটার পথ শুরু। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, সোনালী ধান ক্ষেত, দু’পাশের সবুজ অরণ্যের মাঝে গ্রামের হাঁটা পথ ধরে হাটার কিছুদূর পরেই ঝিড়ি পথ আসবে। ঝিড়ি পথ পারি দিয়েই খৈয়াছড়া ঝর্ণা। এত মানুষের সমাগম এই ট্রেইলে পুরা রাস্তা গোসলের পানি দিয়ে পিচ্ছিল করে ফেলছে। ভাগ্য ভাল বাশ নিয়েছিলাম একটা। জ্বী ইহা গণ ট্রেইল। দাদী-নানী, খোকা-খুকি, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই এই ট্রেইলে আসে। বাংলাদেশের একমাত্র ৮ স্টেপের ঝর্ণা। গুটি গুটি করে হেঁটে হেঁটে এক সময় এসে পড়লাম খৈয়াছড়ায়। বেশ সুন্দর ঝর্ণা।

খুশি তো। ছবি: লেখক

পাহাড়ের সবুজের মাঝে কাচের মত সচ্ছ জলধারা নিচে নেমে মানুষকে করে পাগলপারা৷ তবে উপরের স্টেপগুলাতে উঠতে হলে দড়ি বেয়ে উঠতে হয় দেখে আর আগ্রহ দেখলাম না। রগের টানের কারণে পায়ে প্রচণ্ড ব্যাথা। খামাখা জানের রিস্ক নেওয়ার কোন মানে হয় না। আমার সফরসংগীরা সবাই উপরে উঠলো শুধু আমি আর চান মিয়া বাদে। ঈসমাইল ভাইয়ের মুখে শুনলাম উপরের ধাপের সৌন্দর্য্যের কথা। উনি ৫ স্টেপ পর্যন্ত গিয়েছেন৷ ঝর্ণার শেষ ধাপ পর্যন্ত যারা যেতে পারবে তারা উপভোগ করবে এক বুনো সৌন্দর্য্য। খৈয়াছড়া অভিযান শেষে ঝর্ণা হোটেলে দুপুরের খাবার (খেতে খেতে বিকাল হয়ে গেছে) সেরে নিলাম।

এরপর যাত্রা শুরু করলাম মহামায়ার পথে। মহামায়া ইকো পার্কের সামনে নেমে টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম সবাই৷ মায়া ভরা মহামায়া লেক। ট্রেকিংয়ের ক্লান্তিতে আমার দুই নয়ন জুড়িয়েছিল মহামায়া লেক এবং এর আশে পাশের পাহাড় বন জংগল। সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর আমাদের পার্বত্য অঞ্চল। আমাদের দিনের রোজননামা মহামায়ার মায়াতেই হয়তো শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সফরনামা শেষ হবে না৷ কাপ্তাই লেক, রাংগুনিয়া ইকো পার্কের গল্প না হয় আর একদিনের জন্য জমা থাকুক৷

ফিচার ছবি: লেখক

One Comment

Leave a Reply
  1. যেটার নাম ভুলে গেসেন ভাইয়া, সেটা বাঘবিয়ানি 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

টাঙ্গুয়ার হাওড়ের নীল জলরাশি

সীতাকুণ্ড ডায়েরি: কমলদহ ও বোয়ালিয়া ট্রেইল