fbpx

আমার প্রথম সমুদ্র দেখা (১৯৭৬)

আমার প্রথম সমুদ্র দেখার স্মৃতি ১৯৭৬ সনে। লেখাটাতে আমার সমুদ্র দেখার স্মৃতির সাথে তখনকার কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পরিবেশ আর অবস্থা নিয়েও কিছু তথ্য থাকবে… ১৯৭৬ সন, তখন থাকি কুমিল্লাতে। আব্বার বদলীর চাকরির সুবাদে ঘুরার উপরে থাকতাম। কুমিল্লাতে মোটামুটি আড়াই তিন বছর থাকার পর আব্বা একদিন আইসা বলে… আমি কক্সবাজারে ট্রান্সফার হইছি, এই মাসেই জয়েন করতে হবে ।

মন খারাপ করমু না খুশি হমু বুঝতেছিলাম না! কক্সবাজার সম্বন্ধে তেমন কিছুই জানি না! শুধু ভুগোল বইয়ে, কোথায় কি জন্য বিখ্যাত চ্যাপ্টারে পড়ছি… কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত এবং ইহা একটি স্বাস্থ্যকর স্থান! আর ইয়া বাঁশের এন্টেনা লাগানো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভিতে ঝিরঝিরা ছবিতে দেখছি বড়ো বড়ো ব্যাটা ব্যাটিরা, ছোট ছোট কাপড় পইরা পানির পাশে শুইয়া থাকে! ঐ সিকি বয়সে ঐটা তেমন ছাপই ফেলতে পারে নাই।

কুমিল্লাতে এতদিন থাকার কারণে বন্ধু-বান্ধব ছাইড়া যাইতে হবে বইলা মন খারাপ। আবার আমার হালকা পাতলা স্বাস্থ্যের কারনে সবাই ‘হেলথ মিনিস্টার’ বইলা খেপাইতো দেইখা মনেরে বুঝ দিলাম… স্বাস্থ্যকর জায়গা যখন, নিশ্চয়ই আমার স্বাস্থ্য ভালো হবে তখন কেউ খেপাইতে পারবে না! যদিও পরে এইটা ভুল প্রমাণিত হইছিলো।

একদিন কক্সবাজার থেইকা অফিসের ট্রাক, পিক-আপ, জীপ চইলা আসলো। হৈহৈ রৈরৈ কইরা মাল পত্র সব বাঁধা-ছাঁদা করা হইলো। আমি ট্রাকে যামু বলছি আর আম্মা হাড্ডি ভাইংগা দিবে বইলা হুমকি দিলো। ট্রাকের আশা জলাঞ্জলি দিয়া পিক আপের চেষ্টার দিকে মন দিলাম। বড়ো মামা পিক আপে যাবে, উনারে ধরলাম। উনি আম্মারে বুঝাই শুনাই রাজী করাই ফেললো।

একদিন শুভক্ষণে রাত তিনটা বাজে গাড়ির ক্যারাভ্যান কক্সবাজারের দিকে রওনা হইলো। আমি পিক আপে। ব্রিটিশ আমলের হলুদ রঙের DOGE পিক আপ! আওয়াজ করে যতো, ততো স্পিডে চলে না! আওয়াজ শুইনা মনে হয় ধানের কল চালাইতেছে। কি ভুল করছি বুঝতে পারলাম কিন্তু করার কিছু নাই… নিজের পায়ে নিজেই কুঁডাল মারছি।

যাই হোক, এইভাবে কিছুক্ষণ চলার পর দেখি গাড়িতে মুরগীর গুয়ের গন্ধ! নিজের জুতার তলা দেখলাম! পরিষ্কার। মামারে জুতার তলা চেক করতে বললাম… সেইটাও পরিষ্কার! ড্রাইভার ভাইরে জিগাইলাম গন্ধ কিসের? উনি খ্যাঁক খ্যাঁক কইরা হাইসা বলে… এইটা সুপারীর গন্ধ, মদাইন্ন্যা সুপারী! সুপারী দিয়া আমি পান খাইতেছি।

ইয়া নফসি ইয়া নফসি পড়তে পড়তে সকাল নয়টার দিকে চিটাগাংয়ে নানার বাসায় আসলাম। পিক-আপের শখ খতম, জীপেই যামু এইবার। কক্সবাজার ছয় সাত ঘণ্টার জার্নি, হালকা খাইয়া সকাল দশটার মধ্যে চিটাগং থেইকা রওনা হইয়া গেলাম। আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়া পটিয়া পর্যন্ত আইসা পড়লাম। এরপর শুরু হইলো আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে টাইপ চিকনা রাস্তা ।

একটা গাড়ি চলতে পারবে রাস্তার সাইজ এমন। দুই পাশে দেড় ফুট কইরা ইটের সোলিংয়ের শোল্ডার। দুইটা গাড়ি ওভারটেক বা ক্রস করলে দুইটারেই রাস্তা থেইকা নাইমা যাইতে হয়। তবে পুরা রাস্তা ফাঁকা! বিশ ত্রিশ মিনিট পর পর হয়তো একটা কাঠ বডির মুড়ির টিন বাস দেখা যায়। এই বাসই ঐ রুটের একমাত্র বাহন ছিলো। চিটাগং টু কক্সবাজার ভাড়া ছিলো ১৭ টাকা।

রাস্তার এই অবস্থাতে খেলা শুরু হইলো কিছুক্ষণ পর। পেট মোচড় দিয়া যা আছে উপর দিকে উইঠা আসে। কিছুক্ষণ চাইপা রাইখা আর পারি নাই… জানলা দিয়া মাথা বাইর কইরা ফুসফুস বাইর করার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি থামছি আর শুরু করলো আমার ছোট বোন। নিয়মিত বিরতিতে দুইজনে এই কাম চালাইয়া গেলাম। একবার সে, একবার আমি। একবার আমি, একবার সে! তেঁতুল, লেবু, জিহ্বার নিচে তামার পাঁচ পয়সা… যাবতীয় টোটকা ফেইল।

এখনকার আমিরাবাদ, লোহাগাড়া তখন দু চারটা টিনের বা ছনের দোকান ওয়ালা বাজার। ধীরে ধীরে চকরিযা পার হইয়া পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি আসলো। প্রথম পাহাড় দেখা। ছোট ছোট টিলাগুলাই আমাদের কাছে বিশাল পাহাড়! এরমধ্যে নতুন টেকনিক মাথায় আসলো, বমি করবো… খারাপ লাগতেছে বললেই গাড়ি থামাই হাঁটাহাঁটি করতে বলে।

পাহাড়ে পছন্দের জায়গা দেখলেই দুই ভাই বোন একসাথে খারাপ লাগতেসে, বমি করবো বলা শুরু করলাম। গাড়ি থামাইলেই, নাইমা পাহাড়ের আট দশ ফিট উইঠা নিজেরে হিলারি তেনজিং ভাবা শুরু করলাম। এইভাবে রামু চইলা আসলাম। রামুর বাইপাস রোড তখন ছিলো না, এইটা অনেক পরে হইছে। রামুর ছয় সাত মাইল আগের থেকে রাস্তার দুই কিনারে টানা রাবার বাগান। পরেও একইরকম। এখন যারা কক্সবাজার যায়, বাইপাস রোডের কারণে এই ভিউটা মিস করে।

রামুর পর একদম টানা সোজা রাস্তা। ঝিলন্জা পার হইয়া টেকপাডা হইয়া হলিডে মোড়ে। কক্সবাজার তখন ছোট্ট সুন্দর গোছানো পরিচ্ছন্ন একটা মফস্বল শহর। কলাতলীর দিকে বাইপাস রোড যেইটা, ঐটা তখন গভীর জঙ্গল। শহর শুরু টেক পাড়া থেকে।

হলিডে মোড় থেইকা গাড়ি বামে মোড় নিলো। সোজা চকচকা রাস্তা। হলিডে মোড়ে শুধু একটা হোটেল ছিলো, সাগর গাঁও যথাসম্ভব। আর ঝিনুক মার্কেট। বিকাল চারটার দিকে গাড়ি আইসা একটা বাসার কম্পাউন্ডে ঢুকলো। বিরাট দোতলা বাসা! সামনে বাগান, পিছনে সব্জি ক্ষেত। গরু, মুরগি, হাঁসের আলাদা আলাদা বাসা। গাড়ি থেইকা নাইমা প্রথমে শিউর হইলাম, এইটা আমাদের বাসা কিনা। শিউর হইয়া এক দৌড়ে দোতলাতে! ছয় বেডরুমের বাসাতে উপরে শুধু দুইটা বেডরুম! এরপর পুরাটাই সমুদ্রমুখী বিশাল এক খোলা বারান্দা!

এক দৌড়ে বারান্দাতে যাইয়া সমুদ্র খুঁজতে লাগলাম। আওয়াজে বুঝা যাইতেছে সে কাছে কিনারে আছে কিন্তু ব্যাটা কই!!?? পশ্চিমের রেলিংয়ের কাছে গিয়া সামনে তাকাইলাম। বাসার সামনে রাস্তা, এরপর সাগরিকা রেস্টুরেন্টের দিঘী, তারপর ঝাউ বাগান! ঝাউ বাগানের পর সাদা সাদা কি যেনো দেখা যায়! সবাই বললো ঐটাই সমুদ্র কিন্তু ঝাউ গাছের জন্য তেমন কিছু বুঝতেছি না। সমুদ্রে যাওয়ার কথা বললাম আর আব্বা বলললো আজকে না। সবাই জার্নি করে হয়রান, আমরা কালকে যাবো… সমুদ্র তো আর পালাই যাবে না। তথাস্তু…

সন্ধ্যা পাঁচটার দিকে এই খোলা বারান্দাতে দুপুরের খাবার দিলো। আমার এখনো পরিষ্কার আইটেমগুলা আর সেই স্বাদের কথা এখনো মনে আছে। আতপ চালের ভাত, রূপচাঁদা ফ্রাই, বাটা মাছ ফ্রাই, মুরগি, পেঁপে ভাজি আর ঘন ডাল। মুরগীর রান পছন্দ করি দেখে আমারে রান দিছিলো একটা। আমি মনে করছি খাসীর রান! লোকাল একটা মুরগীর জাত ছিলো… বর্মাইয়া কুরা বলতো, একেকটা তিন চার কেজি ওজন হইতো।

খাওয়া দাওয়া শেষে খাট পালং সেট করতে করতে রাত নয়টা । চারদিকে শুনশান… হঠাৎ শুনি গুম্ গুম্ কইরা ট্রেন যাইতেছে! এইখানে ট্রেন থাকতে আমরা এতো কষ্ট কইরা গাড়িতে আসলাম ক্যান জিগাইলাম। বাবুর্চি লালু ভাই বললো… এইটা ট্রেনের আওয়াজ না, সাগরের আওয়াজ! তখনি মনের মধ্যে কৌতুহল জাইগা উঠলো… এইটা কি এমন জিনিষ যে, এতো আওয়াজ করে। খাওয়া দাওয়া শেষে শুইতে শুইতে রাত বারোটা। তখন আওয়াজ অন্যরকম! একটু পর পর গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ হইতেছে! জানলাম এইটা ঢেউ ভাংগার আওয়াজ!

মনে মনে ঠিক কইরা ফেললাম, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘটনা সরেজমিনে চেক কইরা দেখতে হবে। দুলু মামারে (সেঝো মামা) চেক করতে গেলাম, মামা বলে… চুপ করে থাক , সকালে আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠার আগেই ঘুরে চলে আসবো। এরপর ছোট বোনরে জানাইলাম, সেও রাজী… তারে না নিলে সে অবশ্যই আম্মারে বইলা দিবে। বইলা দিলে অবশ্যই পিঠে ঝাড়ুর শলা ভাঙ্গবে। অবশ্য না বইলা সমুদ্র দেখতে যাওয়ার জন্যও এই রিস্ক আছে। এতো চিন্তা কইরা লাভ নাই, জীবনে মাঝে মাঝে রিস্ক নিতেই হয়… আর বাসা বদল হইছে, ঝাড়ু খুঁইজা পাওয়ার চান্স কম। হাত দিয়া মারলে আম্মা ব্যাথা পায়, ঝাড়ু না পাইলে রিস্ক নাই! এরপর দিলাম ঘুম…

ভোর পাঁচটাতে ঘুম থেইকা উইঠা গেলাম, আসলে উত্তেজনার চোটে সারারাত ঘুমাই নাই! বোনরে ডাক দিয়া দুইজন পা টিইপা টিইপা একতলাতে নাইমা, দুলু মামারে ডাক দিলাম। সবাই তখন গত কয়েকদিনের পরিশ্রম আর জার্নির কারণে ঘুমাইতেছে। তিনজন মিলা আস্তে কইরা ঘর থেইকা বাইর হইয়া রাস্তায় চইলা আসলাম ।

রাস্তা শুনশান ফাঁকা। কোথাও কাউরে দেখা যাইতেছে না! সমুদ্রের পাড়ে কেমনে যামু বুঝতেছি না। সমুদ্র তো বাসা বরাবর আড়াইশ তিনশ গজ দুরে! কিন্তু মাঝখানে একটা খাল দেখতেছি, এরপর দিঘী, তারপর আবার একটু জলামতো জায়গা। কোন রাস্তা তো ঐদিকে নাই! মেইন রোড ধইরা ডানে না বামে যামু ঐটাও বুঝতেছিলাম না। এমন সময়ে এক রিক্সা আসলো… দুলু মামা রিক্সা থামাইলো…


– যাবেন?
– হন্ডে যাইবোন?
– সি বিচ
– সি বিচ হন্ডে?
– সি বিচ ভাই!!
– ইয়ান আবার কন জাগা!!??
– সমুদ্রের পাড়ে!
– আঁই ন চিনি বদ্দা…
দুলু মামা কোনভাবেই বুঝাইতে পাইরা এইবার বললো… দইজ্জার কুলত যাইবেন??
– অ.. শি শোর!! শি শোর!! ইয়ান ই না কইবেন.. উডন।
আমরাও সমস্বরে, হ হ… শি শোর ! শি শোর বইলা রিক্সাতে উঠলাম। রিক্সা আমাদের হোটেল লাবনীর সামনে নামাই দিলো।

এখানে কিছু তথ্য দেই… লাবনীর পর আর কোন রাস্তা ছিলো না। ফিসারী অফিসের পর কলাতলীর দিকে শ খানেক গজ ইটের সোলিং একটা রাস্তা ছিলো। এরপর চার পাঁচশ গজ মাটির রাস্তা। এরপর পুরাটাই গভীর জঙ্গল। এখনকার হোটেল মোটেল জোন পাহাড় আর জংগল কেটে বানানো। হলিডে মোড় থেকে লাবনী পর্যন্ত বিচ রোডে ওয়াপদা কলোনি, তিনটা সরকারী রেস্ট হাউস, আর পর্যটন করপোরেশনের প্রবাল, উপল, লাবনী মোটেল ছিলো আর সাগরিকা রেস্টুরেন্ট।

সাধারণ পর্যটক সাধারণত নিরিবিলি (কাঠের তৈরি ছিলো), প্যানোযা এমন কয়েকটা হোটেলে উঠতো। একটু পয়সাওয়ালারা হোটেল সাইমনে। আর সবাই খেতো সাইমনের পাশে ঘুপচি ডায়মন্ড হোটেলে আর নিরিবিলি হোটেলে। এখনকার ক্রেজ পৌষী তখনকার ডায়মন্ডের কাছে পাত্তাও পাবে না। বিচ ছিলো একমাত্র লাবনী। একটা ছনের দোকান ছিলো মাত্র। বিকালে সিংগাড়া পিঁয়াজু বিক্রি করতো। আর বস্তা বিছাইযা ঝিনুক বিক্রি করতো কিছু লোক। অরিজিনাল ঝিনুক মার্কেট ছিলো হলিডের মোড়ে।

লাবনীর সামনে নামাই দিয়া রিক্সা ওয়ালা দুই টাকা ভাড়া নিলো ( কক্সবাজারে প্রথম ধরা, অরিজিনাল ভাড়া এক টাকা। ঐ যুগেও কক্সবাজারে মানুষ ধরা খাইতো)। আওয়াজে বুঝতেছি সমুদ্র কোনদিকে… বালির একটা রাস্তা সোজা গেছে, ঐটার পরেই হবে। কিন্তু উঁচু উঁচু বালিয়াড়ির জন্য দেখা যাইতেছে না! বালিয়াড়িগুলা গংগালতাতে ভরা আর অসংখ্য বেগুনী ফুল!! এই বালিয়াড়িগুলা ছিলো কক্সবাজারের আরেক সৌন্দর্য, পুরা কোস্টলাইন জুড়েই ছিলো। সমুদ্রের শুরু ছিলো লাবনী পয়েন্টের গোল ছাদের মার্কেট থেকে।

তিন জন দুরু দুরু বুকে আস্তে আস্তে হাঁইটা বালিয়াড়ির উপর উঠলাম! উইঠাই তিনজন স্তব্ধ হয়ে গেলাম! আগে পদ্মা যমুনা নদী দেখছি… ধারনা ছিলো সমুদ্র আরো বড় কিছু হবে, ঢেউ কিছু বেশি হবে! এমনটাতো আশা করি নাই! তখন ভাটা শেষ হয়ে জোয়ার আসতেছে। দিগন্ত বিস্তৃত নীল পানি আর আকাশ! কে কার সাথে কোথায় মিশছে বুঝাই যাইতেছে না! তিন জনে চুপ কইরা সামনের দৃশ্য গিলতেছি। মনের ভিতরে ভয়, আনন্দ, বিষন্নতার একটা অনুভূতি! সমুদ্রের বিশালতার ভয়, সমুদ্র দেখার আনন্দ আর প্রকৃতির কাছে নিজের ক্ষুদ্রতার হিসাব করে বিষণ্ন!

ঠাণ্ডা নোনা গন্ধঅলা ভেজা ভেজা একটা বাতাস বুক ভইরা দিতেছে। এখনো আমি প্রথম দেখার ঐ গন্ধটা পাই। সামনে চার পাঁচ শ গজ ভেজা বালি। তিনজনই কি করবো বুঝতেছি না, তাকাই তাকাই গিলতেছি শুধু। দুলু মামা (উনি তখন কলেজের ছাত্র) বলে, চল নিচে নামি। আস্তে আস্তে তিনজন ভেজা বালিতে হাইটা হাইটা সমুদ্রের কাছে গেলাম ।

মামা মানা কইরা দিলো, খবরদার পানিতে নামা চলবে না! পনিতে না নাইমা, কাছে গেলাম। সমুদ্রের কাছে গিয়া পানিতে না নামা!!??? সমুদ্র তো এইটা হইতে দিবে না! সমুদ্রই আমাদের কাছে আসলো, হঠাৎ বড় ঢেউ আইসা হাঁটু পর্যন্ত ভিজাইয়া দিয়া গেলো! অন্য রকম একটা অনুভূতি… প্রথমে ভয়, তারপর আনন্দ! পায়ের নিচ থেকে সর সর করে বালি সরে যাওয়ার কেমন একটা অনুভূতি!

প্রথম দেখার ঘোর কাটতেই এরপর চারদিকে দেখা শুরু করলাম।ডানে বামে যতদুর চোখ যায় ঘন ঝাউবন। ঝাউবনের সামনে ছোটবড় বালিয়াড়ি। ছোট বোনের হঠাৎ চিৎকার… ভাইয়া দেখ দেখ, কতো ঝিনুক! এতক্ষণে খেয়াল হইছে… পুরা বিচ নানা রংয়ের ঝিনুকে ভর্তি। তিন জন ঝিনুক খুঁজতে শুরু করলাম। ভাংগা চুরা যা আছে নিয়ে নিয়ে পকেট ভর্তি। একটু পর পর যা নিছি তার থেকেও সুন্দর একটা দেখি… পকেট থেকে আগের নেওয়াগুলো ফেইলা আবার নতুন ঢুকাই।

হঠাৎই দেখি বালিতে সাদা থলথলা কি একটা পইড়া আছে! কাছে গিয়া দেখি নড়েচড়ে না! সাহস কইরা তিনজন আরো কাছে গেলাম, ছোট একটা ঝিনুক এইটার গায়ে ছুঁইড়া দিয়া এক লাফে পিছনে! নাহ্, এইটা তো নড়েচড়ে না! তিনজনে এইবার খুব কাছে গিয়া উপুড় হইয়া বোঝার চেষ্টা করতছি… জিনিসটা কি? এই সময়ে এক স্থানীয় লোক পাহাড়ে লাকড়ি কাটার জন্য কলাতলীর যাইতেছিলো, তারে জিগাইলাম। সে বললো এইটা জেলী ফিস। যাক এতোদিনে একটা নতুন জিনিস শিখলাম, এতোদিন জেলী শুধু খাইছিই… এখন জানলাম জেলী কোথা থেইকা আসে।

আবার বোনের চিৎকার! ভাইয়া দেখ দেখ… বালুতে কি সুন্দর স্টার ডিজাইন! কাছে গিয়া দেখি ঘটনা সত্য, ভিজা বালিতে স্টারের মতো ডিজাইন! বুড়া আংগুল বালির ভিতরে ঢুকাইয়া এইটারে নাড়া দিছি আর ইয়া আল্লাহ! কিলবিল কইরা কি একটা বাইর হইয়া জায়গাতে পা পাঁচটা নাড়াইতে লাগলো! তিন জনে অক্টোপাস অক্টোপাস বইলা তিনদিকে ছিটকাই পড়লাম।

ভয় কমছে আর আবার গুটি গুটি কাছে আসলাম, তিনজন একমত হইলাম… এইটা স্টার ফিস, নিশ্চয়ই খুব বিষাক্ত! গায়ে কাঁটা কাঁটা দেখা যাইতেছে কামড় দেওয়ার চান্স আছে… এরে না ঘাটানোই ভালো। অন্য দিকে নতুন কিছু আছে নাকি খোঁজ করতে লাগলাম। হঠাৎ দক্ষিণ দিকে দেখি বিচ লাল হইয়া আছে (এখনকার সুগন্ধা পয়েন্ট)! বাসা থেইকা বাইর হইছি ঘণ্টা তিনেক হইছে, আর দেরি করলে রুটি বেলার বেলনীর এস্তেমাল হইতে পারে , তাই ঐদিকে আর গেলাম না! তিনজন একমত হইলাম… এইগুলা কোন একরকম ফুল। যদিও বিকালে এই ভুল ভাংছিলো।

তাড়াতাড়ি বাসায় রওনা হইলাম। এখন রাস্তা চিনি, বাসা থেইকা দশ মিনিটের হাঁটা পথ। লাবনীর সামনে আইসা দেখি ছোট ছোট বাঁশের ঝুড়িতে ঝিনুকের তৈরি বক, হরিণ, হাঁস বেচতেছে… প্যাকেজ! দাম বিশ টাকা ঝুড়ি। অনেক দরাদরি কইরা সতেরো টাকাতে কিনলাম (সতেরো টাকা ঐ যুগে বিরাট ব্যাপার! পাঁচ টাকাতে একটা বড় মুরগী পাওয়া যাইতো)। অনেক জিতছি ভাবছিলাম, কিন্তু বাসায় আইসা লালু ভাই (বাবুর্চি) থেইকা জানতে পারলাম, কক্সবাজারে এইটা দুই নাম্বার ধরা।

বাসায় আসার পর আম্মার বকা খাওয়ার আগেই… দেখো কি পাইছি বইলা নানা রংয়ের ঝিনুক বাইর কইরা দিলাম। ব্যাস, সাত খুন মাপ! যখন বললাম, আরো অনেক আছে… আম্মা বললো জলদি নাস্তা খা… নাস্তা খেয়ে আমরা সবাই মিলে যাবো, সমুদ্রে গোসল করবো। এরপর দুপুরে সমুদ্র স্নান আর বিকালে হিমছড়ি।

প্রথম সমুদ্র দেখা থেকে আমার মন উদার হয়নি। ভালোবাসা জন্মায় নি! সেদিন সমুদ্র আমাকে ছোট্ট একটা জিনিষ দিয়েছে!!! প্রকৃতিকে উপভোগ করা, গভীর দৃষ্টিতে দেখা। ছোটবেলা থেকেই ঘুরাঘুরি করি কিন্তু প্রকৃতি উপভোগ করার ক্ষমতা আমাকে আল্লাহ তালা সেইদিনই সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে দিয়েছেন।

জানি লেখাটা অনেক বড়ো হয়ে গেলো। কিন্তু সেই ছোটবেলার স্মৃতি লিখতে গিয়ে মনে হয়, কিছুই লিখা হলো না। পাঁচ বছর কক্সবাজার ছিলাম। এরপর অনেকবার গিয়েছি। এখনো কাজে বছরে দুয়েকবার যাওয়া হয়। কিন্তু প্রথম দেখার কক্সবাজারকে আর পাই না। গেলেই শুধু সেই ছোট্ট বেলার কক্সবাজারের সাথে তুলনা চলে আসে। প্রতি বছর কক্সবাজার গেলেও গত দশ বছরে আমি সমুদ্রের পাড়ে একবারও যাই নি।

ময়লা, আবর্জনা, অসংখ্য হোটেল… যাওয়ার ইচ্ছাটাই হয় না! সবকিছু হয়তো আমরা বদলাতে পারবো না, কিন্তু অপচনশীল আবর্জনা যদি আমরা যেখানে সেখানে না ফেলে বা অন্যে পরিষ্কার করবে এই আশাতে না থেকে নিজেরাই নির্দিষ্ট জায়গাতে ফেলি, তাহলেও কিন্তু একটা বড় উপকার হবে আমাদের এই সমুদ্রের জন্য। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মই এটার সুফল ভোগ করবে।

লেখা ও সকল ছবি:
মইনুল ইসলাম, ভ্রমণ বিষয়ক জনপ্রিয় একটি গ্রুপের অ্যাডমিন

One thought on “আমার প্রথম সমুদ্র দেখা (১৯৭৬)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top