in ,

ময়নামতির দেশে ম্যাজিক প্যারাডাইজে!

অনেকেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকি ঢাকা থেকে পালানোর। বড় ছুটি না হলে দূরদূরান্তের কোথাও পরিবার পরিজন নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয়না। তাই বলে কি থেমে থাকবে ঘুরে বেড়ানো! শুধুমাত্র একটি ছুটির দিনকে উপলক্ষ করে পরিবার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে খুব সহজে ঢাকার বাইরে ঘুরে আসার জন্য কুমিল্লা শহর হতে পারে অন্যতম স্থান।   

নব হিল্লোল্ব স্বাগত মোদের বাড়িতে। ছবি: লেখক

যাতায়াতের জন্য খুবই অল্প সময়ের প্রয়োজন হয়, যার ফলে দিনের বেশিরভাগ সময়ই ঘুরাঘুরির পিছনে ব্যায় করতে পারেন।কুমিল্লায় ঘুরাঘুরি আর শিক্ষা সফর অনেক আগে থেকেই প্রচলিত। ঐতিহাসিক স্থাপনা আর বিভিন্ন পর্যটন স্পট থাকার ফলে বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বনভোজন আর শিক্ষা সফরের জন্য কুমিল্লা থাকে পছন্দের শীর্ষে। কুমিল্লায় বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা রয়েছে যার সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব যুগ যুগ ধরে সমাদৃত। তবে আজকের বিষয় থাকবে শালবহন বিহারের পাশ ঘেষে চলে যাওয়া সর্পিল রাস্তায় আরো কয়েক কিলোমিটার ভিতরে সদ্য নির্মিত থিম পার্ক ম্যাজিক প্যারাডাইজ নিয়ে। 

Follow me to this paradise. ছবি: লেখক

সাধারণ পার্কের সঙ্গে থিম পার্কের পার্থক্য হচ্ছে এটি একটি থিম বা বিষয়বস্তুর ওপর তৈরি করা হয়। সেই থিমকে কেন্দ্র করে এর স্থাপনা এবং রাইডগুলো সাজানো হয়।থিম পার্ক বিস্তৃত জায়গাজুড়ে সাজানো হয়। নানা বয়সী দর্শকের কথা মাথায় রেখে এর বিনোদনগুলো সাজানো হয়ে থাকে।

বিশ্বের প্রথম থিম পার্কটি হচ্ছে ‘সান্তা ক্লজ ল্যান্ড’। যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে। এর ৯ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চালু হয় ‘ডিজনিল্যান্ড’। অভিনেতা ওয়াল্ট ডিজনির তত্ত্বাবধানে এই পার্কের কাজ হয়েছিল। চালুর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এই পার্কে যোগ হয়েছে নানা রকম থিম। এ পর্যন্ত এই পার্কে সারা বিশ্ব থেকে ৬৫ কোটি দর্শক এসেছে।‘ডিজনিল্যান্ড’ ছাড়াও বিশ্বের বিখ্যাত থিম পার্কের মধ্যে রয়েছে ‘সিওয়ার্ল্ড অরল্যান্ডো’, ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিও হলিউড’।

ওয়াটার রাইড। ছবি: ম্যাজিক প্যারাডাইজ ফেসবুক পেজ

এই থিম পার্কগুলো এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসবের শাখাও রয়েছে, যেমন—‘হংকং ডিজনিল্যান্ড’, ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিও সিঙ্গাপুর’ ইত্যাদি।

খেলার সাথী ডাইনোসর। ছবি: লেখক

শুধু শিশুদের (১১ বছরের নিচে) কথা চিন্তা করে ১৯৬৮ সালে ডেনমার্কে বানানো হয়েছে ‘লেগোল্যান্ড’। এটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এর শাখা ইউরোপ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যেও দেখা যায়।

বাংলাদেশে থিম পার্কের প্রচলন শুরু হয় ২০০২ সালে ফ্যান্টাসি কিংডম থিম পার্কের মাধ্যমে। কনকর্ড গ্রুপের মালিকানাধীন এই পার্ক কমপ্লেক্সে ফ্যান্টাসি কিংডম ড্রাই পার্ক, ওয়াটার কিংডম এবং হেরিটেজ পার্ক রয়েছে। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নন্দন পার্ক, ফয়েজ লেক, ওয়ান্ডার ল্যান্ড, ড্রিম ল্যান্ড, ড্রিম হলিডে পার্ক, ভিন্ন জগৎ, ব্লু ওয়াটার পার্ক ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। 

আকাশ ছুয়ে দিবো আজ নাগর দোলায় চড়ে। ছবি: লেখক

কুমিল্লার কোটবাড়ি পেরিয়ে সালমানপুর নামক স্থানে সদ্য চালু হওয়া প্রাকৃতিক আর কৃত্রিমতার মিশেলে তৈরি হওয়া এই সাম্রাজ্যের অবস্থান। কোটবাড়ি বিশ্বরোড থেকে কোটবাড়ি হয়ে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, শালবন বিহার, ময়নামতি জাদুঘর পেরিয়ে এক কিলোমিটার পরে দেখা মিলবে এই সাম্রাজ্যের। ফটকের সামনে দাঁড়ালেই মনে হবে হঠাৎ করেই যেনো চেনা পরিচিত ছবি ছাপিয়ে বিদেশ বিভুইয়ের কল্প লোকের কোনো সাম্রাজ্যে এসে উপস্থিত হয়েছি। মূল ফটকটি তৈরি করা হয়েছে মূলত বিশ্বের সকলের পরিচিত থিম পার্ক ‘ডিজনইল্যান্ডের’ আদলে। সবুজ সতেজ প্রাকৃতিক পরিবেশ সাথে বিদেশ বিভুইয়ের অনুভূতি আপনার প্রথম দর্শনটা মুগ্ধতার ছোয়ায় কাটিয়ে দিবে। 

রঙিন ওয়েব পুল। ছবি: ম্যাজিক প্যারাডাইজ ফেসবুক পেজ

টিকেট নিয়ে প্রবেশ করার পরে প্রথমেই দেখতে পাবেন আকাশ ছোয়া Pherish Wheel আধুনিক এই নাগরদোলায় চড়ে দেখতে পারবেন পার্কের পুরো চিত্র এবং আশেপাশের সবুজ প্রকৃতি। এছাড়া পার্কটি সাজানো হয়েছে রোলার কোস্টার, রেলগারি, বাম্পার কার এর মতো বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চারাস রাইডের মাধ্যমে। ছোট-বড় সকলের জন্য রয়েছে বিভিন্ন আনন্দায়ক বিনোদন। 

কৃত্রিম ডাইনোসর। ছবি: লেখক

রাইড পেরিয়ে সামনে এগোলেই হাতের ডানে পাওয়া যাবে সবুজে ঘেরা টিলা কেটে বানানো থরে থরে সাজানো সিড়ি, ঘন বন আর গাছ গাছালির মিশেলে গোছানো কৃত্রিম এক ডাইনোসর পার্ক। ‘ডাইনোসর লস্ট ওয়ার্ল্ড’ নামে এই ডাইনো পার্কে প্রবেশ করতেই দুই পাশ থেকে লেজ নাড়িয়ে, ঘাড় বাকিয়ে মুখ থেকে হালুম হালুম শব্দ করে স্বাগত জানাবে আপনাকে। বিষয়টি খুব ই উপভোগ্য, ছোট ছোট বাচ্চারা বিষয়টিতে খুব মজা পাচ্ছে। মূলত ডাইনোসরের লেজ, মাথা এবং ঘাড়ের দিকে মুভেবল সেন্সর লাগানো হয়েছে এবং নিচে থাকা সাউন্ড বক্স থেকে শব্দটা বের হচ্ছে। এই পথে সামনে এগুলে আরো কয়েকটি বিলুপ্ত প্রাণীর প্রতিকৃতির দেখা মিলবে। সামনে গিয়ে এই সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে সেখানে ডাইনোসরের আতুর ঘর বানানো হয়েছে। সদ্য ডিম ফুটে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে বাচ্চা ডাইনোসর, আবার কোনো ডিমের ফাঁকা খোসায় ঢুকে আপনি ছবিও তুলতে পারছেন। এই জায়গাটার চারপাশে গ্যালারির মতো বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। ছোট ছোট ডাইনোসরের পিঠে চরে ঘুরে বেড়ানোর ব্যাবস্থা আছে বাচ্চাদের জন্য। 

সদ্য ভূমিষ্ট ডাইনোসর। ছবি: লেখক

এছাড় এই পার্কের অন্যতম আকর্ষণ ওয়াটার ল্যান্ড। ওনাদের দাবীমতে দেশের সবচেয়ে বড় ওয়েব পুল ম্যাজিক প্যারাডাইজে। এখানে মূলত তিনটা পুল আছে। একটা ডিজে এবং ওয়েব পুল, একটা স্লাইডিং পুল একটা ফ্যামিলি পুল। তবে পানির পরিমান হাঁটু পর্যন্ত যা অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে।পাহাড়ের উপর থেকে তিনটি রাইডের ব্যাবস্থা আছে। উচ্চ শব্দের ডিজে গানের তালে পানির মধ্যে আনন্দ উল্লাসে হারিয়ে যাওয়া উপভোগ্য হতে পারে যে কারো জন্য। 

বিলুপ্ত প্রাণী। ছবি: লেখক

এন্ট্রি ফি ও টিকেট: এই পার্কে শুধুমাত্র প্রবেশের জন্য আপনাকে গুনতে হবে জনপ্রতি ২০০ টাকা, এতে পার্কে প্রবেশ এবং ডাইনোসর পার্কে প্রবেশ করতে পারবেন। 

ড্রাইপার্ক, ডাইনোসর তিনটি রাইড ও ওয়াটার ল্যান্ডে প্রবেশের জন্য নিতে হবে ৫০০ টাকার টিকেট। 

এছাড়া ড্রাইপার্ক, ডাইনোসর পার্ক ও ওয়াটার ল্যান্ডে প্রব্বশ টিকেট ৪০০ টাকা। 

ওয়াটার ল্যান্ডে প্রবেশ করে মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার জন্য লকার ভারা নিতে হবে ১০০ টাকায়, সাথে ১০০ টাকা জামানত দিতে হবে, চাবি ফেরৎ দিলে ১০০ টাকা ফেরৎ পাওয়া যাবে। 

ওয়েব পুলে স্নানরত দর্শনার্থী। ছবি: লেখক

যাতায়াত: ঢাকা থেকে কুমিল্লা যাতায়াতের জন্য সড়ক পথে খুব সময়েই যাওয়া যায়। এসি নন এসি মিলিয়ে বেশ কয়েকটি অপারেটর এর বাস চলাচল করে রাত দিন। 

এশিয়া লাইন এয়ারকন, প্রিন্স এয়ারকন, রয়েল কোচ এয়ারকন সার্ভিস রয়েছে ঢাকার কমলাপুর ও আরামবাগ থেকে। এইসব বাসে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলাচল করে। ভাড়া ইকোনমি ক্লাস ২৫০ টাকা, বিজনেস ক্লাস ৩৫০ টাকা।     

Grand Palam রেস্টুরেন্ট ও 3D অডিটোরিয়াম। ছবি: লেখক

নন এসি বাস পাওয়া যাবে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে। এশিয়া লাইন, তিশা প্লাস, তিশা এক্সক্লুসিভ ছাড়াও বেশ কয়েকটি বাস সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া গুনতে হবে ১২০-২০০ টাকা। 

এছাড়াও যে কেউ চাইলে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী বা ফেনী গামী ট্রেনে উঠে কুমিল্লা নামতে পারবেন। এক্ষেত্রে আসন সংরক্ষণের জন্য অবশ্যই অগ্রীম টিকেট সংগ্রহ করে নিতে হবে। অনলাইনে অগ্রীম টিকেটের জন্য ভিজিট করুন এই লিঙ্কে: https://www.esheba.cnsbd.com/

ওয়াটার প্যারাডাইজে মাতুন জলে আনন্দে। ছবি: লেখক

ঢাকা থেকে বাসে গেলে পদুয়ার বাজারের বাসে উঠবেন এবং নেমে যাবেন কোটবাড়ি বিশ্বরোড। সেখান থেকে অটো বা সি এন জি আছে প্রতিজন ৩০-৪০ টাকা নিবে সরাসরি ম্যাজিক প্যারাডাইজ। এছাড়া কেউ চাইলে শালবন বিহার, ময়নামতি জাদুঘর ঘুরেও ম্যাজিক পার্কে যেতে পারেন। এর সাথে একদিনের ভ্রমণে যুক্ত করতে পারেন বার্ড, ময়নামতি ওয়্যার সিমেট্রি।

বাম্পার কার রাইড। ছবি: লেখক

খাবার-দাবার: ম্যাজিক প্যারাডাইজ কমপ্লেক্সের ভিতরেই রয়েছে গ্র‍্যান্ড প্যালাম নামে চমৎকার একটি রেস্টুরেন্ট। এখানে ২০০ টাকায় মোরগ পোলাও সাথে পানীয় এবং ২৫০ টাকায় চাইনিজ সেট মেন্যু পাওয়া যায়। এছাড়া কুমিল্লা বিশ্বরোডে এসে ছন্দু হোটেলের আলু ভর্তা আর গরুর গোশত দিয়ে খাবারটা সেরে নিতে পারেন। 

পার্কের ভিতরেই ঠাণ্ডা পানীয় ও আইসক্রিম পাওয়া যায়। ম্যাজিক প্যারাডাইজ ফেসবুক পেজ: https://www.facebook.com/magicparadisebd/

ভ্রমণকালে আপনার দ্বারা পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে এরকম কার্যক্রম থেকে বিরত থাকুন। স্থানীয়দের সম্মান করুন। অপচনশীল দ্রব্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

ম্যাজিকে মুগ্ধ দর্শক। ছবি: লেখক

কুমিল্লায় ভ্রমণে গিয়ে রসমালাই না খেলে অনেকের ভ্রমণটা অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। তাই ভ্রমণ শেষ করার পূর্বে কুমিল্লা শহরে গিয়ে রসমালাই খেয়ে আসতে ভুলবেন না। তবে সারা বিশ্বরোড জুড়েই মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই চোখে পরবে। প্রকৃত মাতৃভাণ্ডারের খোঁজে আপনাকে যেতে হবে শহরের ভিতরে। শহরের ভিতরে মনোহরপুর নামক স্থানে পাওয়া যাবে আসল মাতৃভাণ্ডার।আসল মাতৃভাণ্ডারের সন্ধানে। 

ভ্রমণগুরু তে ছাপা হওয়া আমার সব লেখা পড়তে ক্লিক করুন: https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুন্দরবনে কয়েকদিন (প্রথম কিস্তি)

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: প্রথম পর্ব