মায়ুং কপাল: স্বর্গের খোঁজে স্বর্গের সিঁড়িতে

গুমতী তৈসায় বনভোজন শেষ করে আমরা আবার রওনা হলাম। কাপতলা থেকে ডানে যে নিচু পথটা নেমে গিয়েছে, সেটা ধরে কিছুটা সামনে এগুলে একটা দুমুখো পথ। ডান দিকে গেলে মায়ুংকপাল। আমরা বামে হেঁটে নদীতে পৌঁছেছিলাম। এবার ফিরে স্বর্গের সিঁড়ির পথ ধরার পালা। গরম গরম খিচুড়ি খেয়ে ভর দুপুরের কড়া রোদে হাঁটতে যা লাগছিল! তার উপর সেই জংলা পথ ধরে হাঁটা লাগছে৷ শরীর চুলকাচ্ছে ঘামে, জঙ্গুলে ডাল পাতার খোঁচায়। একটু বিশ্রাম নিয়ে, একটু হেঁটে চলে এলাম জায়গা মতো। সিঁড়িতে যাওয়ার আগে এক বাড়িতে ডাবের অর্ডার দিয়ে গেলাম। ফেরার সময় খাওয়া হবে কচি ডাবের পানি। বাড়িটাতে তেঁতুল গাছ দেখলাম। তেঁতুলের কথা বলতেই শাকিল, লিওন ওরা যেয়ে অনেকগুলো তেঁতুল এনে দিল। সাথে আমাদের লবণের প্যাকেট ছিল। মজা করে তেঁতুল খেতে খেতে যাচ্ছিলাম। পাহাড়ি তেঁতুল কিন্তু একটু বেশিই টক হয়! 

স্বর্গের সিঁড়ির পথে। ছবি: মোস্তাক হোসেন
পাহাড়ি কচি ডাব। ছবি: লেখক

একসময় পৌঁছে গেলাম মায়ুংকপালের কাছাকাছি। ত্রিপুরা ভাষায়, মায়ুং অর্থ হাতি, কপাল মানে মাথা। মায়ুং কপাল মানে হাতিমাথা পাহাড়। পাহাড়ের চূড়া দেখতে অনেকটা হাতির মাথার আকৃতি হওয়ায় এমন নাম দেয়া হয়েছে। জানা যায়, খাড়া পাহাড় বেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে একটি নারিকেল গাছের সিঁড়ি দিয়ে এলাকার নারী-শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা যাতায়াত করতেন। এমনকি অসুস্থ রোগীকেও এই পথেই আসা-যাওয়া করতে হতো। গণমাধ্যমে সেই চিত্র দেখে সাবেক সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরার নির্দেশে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে ২০১৫ সালে সিঁড়িটি স্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি গ্রামে সহজে যাতায়াত করা যায়। আস্তে আস্তে গত দুই তিন বছর যাবৎ এটি পর্যটকদের নজরে আসে এবং সৌখিন মানুষ এর নামকরণ করেন ‘স্বর্গের সিঁড়ি’। 

স্বর্গের সিঁড়ি। ছবি: সাব্বির ভাই

সিঁড়িটা দূর থেকেই জ্বলজ্বল করে। সিঁড়ির ধাপগুলো নীল আর দুইপাশের রেলিং হলুদ। দুইশর বেশি ধাপ আছে সিঁড়িতে। স্বাভাবিকভাবেই উপরের ধাপগুলো এতো নিচ থেকে দেখা যায় না। উপরের দিকে দেখতে থাকলে সিঁড়িটা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। মনে হবে বুঝি সত্যিই স্বর্গের পথে যাচ্ছে। দেখলাম অনেকে তখন ফিরছেন সিঁড়ি দেখা শেষ করে। কেউ ধাপগুলোতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এর মাঝে দেখা হয়ে গেল শঙ্খচিল ট্রাভেলার্সের রনি ভাইয়ের সাথে। তেহজীবকে দেখে রনি ভাই এগিয়ে এলেন। সবাই ছবি তুললাম আমরা। বিদায় নিয়ে ওনারা চলে গেলেন। সিঁড়িতে তখন আমরা আমরাই। আয়েশ করে, হেলে দুলে উঠছিলাম।       

সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে চারপাশের ভিউ। ছবি: লেখক

এক জায়গায় দেখলাম রেলিং ভেঙে গিয়েছে। পাহাড়টা বেশ খাড়া। তাই পাহাড়ের গা বেয়ে করা সিঁড়িটাও খাড়া। যেকোন এক ধাপে দাঁড়িয়ে চারপাশে নজর বোলানো আবশ্যক। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সৌন্দর্যের যে ঝলক দেখা যায়, সত্যি অতুলনীয়! সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে একটু সমতল জায়গামতো আছে। আমরা সেখানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। এখান থেকে উপরে আরো কিছুদূর উঠলে মায়ুংকপাল পাড়া। প্রথমে এখানেই আমাদের বনভোজনের প্ল্যান ছিল। 

স্বর্গে পৌঁছে আনন্দে লাফ দেয়াই যায়! ছবি: সাব্বির ভাই

সাব্বির ভাই তাড়া দিচ্ছিলেন। আমরা শহরে একটা বৌদ্ধবিহার দেখতে যাবো। স্বর্গের সিঁড়ি থেকে মর্ত্যে নেমে আসলাম। আরো প্রায় এক ঘণ্টা ট্র‍্যাকিং করে পৌঁছাতে হবে পল্টন জয় পাড়া। ফেরার পথে আমাদের জন্যে রাখা ডাবের পানি খেয়ে নিলাম। নাসির ভাই আমাদের দেখালেন একটা পরিষ্কার পানির কূপ। এতো স্বচ্ছ পানি! আর খুবই ঠাণ্ডা। পাহাড়িরা এই পানি খায়। ওরা যত্ন করে জায়গাটা পরিষ্কার করে রেখেছে। আমরাও কোন ময়লা ফেলিনি। পাড়ায় পৌঁছে গেলাম। শাকিল, লিওন, প্রশান্ত সবাইকে বিদায় জানালাম। ছেলেগুলো খুবই ভালো। খুব করে বললো আবার যেতে। সাব্বির ভাইকে বললাম, শুধু এই পাড়ায় ক্যাম্পিং করবো একবার। চেঙ্গি নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করবো আর পাড়াটা ঘুরে দেখবো। এমন কতো জায়গা যে আছে বারবার যেতে মন চায়। একবার দেখারই সময় হয়না ঠিকমতো। জীবনটা অনেক ছোট মনে হয় তখন! 

মর্ত্যে নামার সময়। ছবি: সাব্বির ভাই

অটো নিয়ে চলে গেলাম অপরাজিতা বৌদ্ধবিহার। সেখানে বিশাল এক বুদ্ধ মূর্তি তৈরি করেছেন কর্তৃপক্ষ। নিঁখুত তার নকশা আর সৌন্দর্য। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের রাতের বাস। হাতে সময় আছে, তাই সাব্বির ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন খাগড়াছড়ি হর্টিকালচার পার্কে। হর্টিকালচার পার্কের মূল আকর্ষণ হচ্ছে ঝুলন্ত ব্রিজ। মানুষজন করে কি, ব্রিজে উঠে জোরে জোরে এলোমেলো হাঁটে। তাতে ব্রিজটা ভয়ানকভাবে নড়তে থাকে। মানে ব্রিজটা আসলেই ঝুলন্ত, এটা প্রমাণ না করলেই নয়! 

কারুকার্যময় বুদ্ধ। ছবি: সাব্বির ভাই
হর্টিকালচার পার্কের ঝুলন্ত ব্রিজ। ছবি: সাব্বির ভাই

এই পার্ক সন্ধ্যায় অন্যরকম সুন্দর, আলোকিত থাকে। পার্কের দর্শনার্থীরা তখন চলে যাচ্ছেন। ফাঁকা পার্কে বসে আছি আমরা কয়েকজন। দই খাচ্ছি, আইসক্রিম খাচ্ছি। আড্ডায় মশগুল সবাই। সাব্বির ভাই তেহজীবকে গান গাইতে বলে লাইভে গেলেন। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে আমাদের মায়ুং কপাল ট্যুর শেষ হয়ে গেল।  

হঠাৎ চোখ পড়লো, দূরে এক জায়গায় ফানুস ওড়ানো হচ্ছে। অন্ধকার আকাশের বুকে ফানুসগুলো এক অন্যরকম অনুভূতি জাগায়। নতুন কোন আশার আলো দেখায়। 

এই ভিডিও লিংকে ক্লিক করে আমাদের সাথে ঘুরে আসতে পারেন মায়ুং কপাল: https://youtu.be/rHYTu_qiSMQ

আমরা গিয়েছিলাম এক্সট্রিম ট্রেকার অফ বাংলাদেশ (ইটিবি) এর সাথে। তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো:
https://www.facebook.com/groups/extremeTbangladesh/?refid=12

সেতু দাস: ০১৮৮৩৬৯৭৭২৮
মিরাজুল ইসলাম সাব্বির: ০১৭১০২৮৯৯৮৪/ ০১৮৬১৯৮০০৩৮

আমার ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন নিচের লিংকে: https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ ময়লা-আবর্জনা যথাস্থানে ফেলুন। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: মিরাজুল ইসলাম সাব্বির

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top