in ,

মায়ুং কপাল: গুমতী তৈসায় বনভোজন

হাজারীখীল ক্যাম্পিংয়ের সময়েই সাব্বির ভাই প্ল্যান করছিলেন হালের ক্রেজ স্বর্গের সিঁড়ি দেখার। উনি গিয়েছেন আগেও গ্রুপ নিয়ে। এইবার যেহেতু আমাদের নিয়ে যাবেন, তাই প্ল্যান একটু অন্যভাবে করতে চাচ্ছেন। সাব্বির ভাইয়ের প্ল্যান ছিল আমরা স্বর্গের সিঁড়ি দেখে উপরে যে পাড়া আছে, মায়ুং কপাল পাড়া, সেখানে নিজেরা রান্নাবান্না করে খাবো। মুশতাক আর আমি তো এক বাক্যে রাজি। সেই অনুযায়ী সপ্তাহ দুয়েক পর মায়ুং কপালের ইভেন্ট দিলেন সাব্বির ভাই।

সময়মতো শান্তি পরিবহনের কাউন্টারে হাজির হলাম আমরা। আহা! শান্তি পরিবহন! গ্রুপ ট্যুরে সাজেক যেবার গেলাম, এই শান্তি পরিবহনে কান্নাকাটি পড়ে গিয়েছিল। খাগড়াছড়ির আঁকাবাঁকা রাস্তা অনেকের কাছেই নতুন ছিল কিনা। এই নিয়ে তৃতীয়বার যাচ্ছি খাগড়াছড়ি। তবুও এই শিহরণ জাগানো রাস্তাটা আমাকে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণ করে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম সর্পিল পথের দিকে। 

ভোরের আলো ফোটেনি, যখন আমরা খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বরে পা রাখি। আরো অনেক গ্রুপও ছিল। আমরা সকাল হওয়ার অপেক্ষায় বসে রইলাম। ঢাকায় গরম হলেও, ওদিকে কিন্তু হিম হিম একটা ভাব চলে এসেছে। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে পাতলা চাদরটা নিয়েছিলাম। ভালোমতো গায়ে জড়িয়ে নিলাম। ঢুলঢুলে চোখেই দেখতে পেলাম আস্তে আস্তে হোটেলগুলো খুলছে। আড়মোড়া ভাঙছে খাগড়াছড়ি শহর। এখান থেকেই কেউ যাবেন আমাদের মতো স্বর্গের সিঁড়িতে, কেউ বা যাবেন মেঘের দেশ সাজেকে। আমরা ঝটপট মনটানা হোটেলে ঢুকে পড়লাম। হাতমুখ ধুয়ে বের হয়ে আশপাশটা একটু ঘুরে দেখলাম। এর মাঝে নাস্তা করার ডাক পড়লো। 

খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বর। ছবি: লেখক

নাস্তা সেরে বের হয়ে সাব্বির ভাই আর নাসির ভাই গেলেন বাজারে। দুপুরে নিজেরা রান্না করবো, তার সরঞ্জাম কিনে আনলেন। তারপর আমরা দুই অটো নিয়ে রওনা হলাম জামতলী। পানছড়ি যাওয়ার পথে জামতলী যাত্রী ছাউনিতে নেমে যেতে হবে। পনের মিনিটের মতো লাগে অটোতে। ছাউনির বাম দিকের রাস্তা ধরে নেমে গেলাম। সামনেই খুব সুন্দর রক্তজবা ফুলের ঝাড়। এই রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে গেলেই চেঙ্গী নদী। পথে বাড়িগুলো বেশ সুন্দর। অর্ধেক টিন, অর্ধেক বেড়া দেয়া বাড়ি। প্রতিটা ঘরের আশেপাশেই প্রায় ফুল গাছ লাগানো। সৌখিন, ভাবছিলাম আমি মনে মনে।

চেঙ্গী নদীর উপর একটা ভাসমান কাঠের ব্রিজ। সেটা পার হয়ে ডান দিকে গেলে পল্টন জয় পাড়া। পাড়ায় যেয়ে পেলাম সুন্দর একটা দোকান। দোকানে দেখি এক লোকের কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা। মুশতাক হাত বাড়াতেই ওর কোলে উঠে পড়লো। পাহাড়ি বাচ্চাগুলো কি সুন্দর হয়! তেহজীব ওর গালে হাত দিতেই পিচ্চি ‘হুম’ করে বকা দিয়ে দিল! দোকানে রঙ চা খেতে খেতে আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। এর মাঝে চলে আসলো শাকিল, প্রশান্ত আর লিওন। এলাকার কলেজ পড়ুয়া ছেলেগুলো সাব্বির ভাইয়ের খুব ঘনিষ্ঠ। ওরাও আমাদের সাথে যাবে। সাথে আমাদের মুরগিটাও ছিল, যেটা আমরা রেঁধে খাবো। 

কুয়াশাজড়ানো চেঙ্গী নদী। ছবি: লেখক

সামনে একটা আমলকি গাছ দেখে শাকিল গাছে উঠে ডাল ভেঙে আনলো। ডাল ভরা কতো যে আমলকি! আমি এই জিনিসটা পছন্দ করি না। বাকিরা খাচ্ছে আর হাঁটছে। সামনে যেয়ে দুইটা বাঁশের সাঁকো পার হতে হলো। ট্রেইলটা ভালো লাগছিল। উঁচু নিচু পথ, চারপাশে সবুজ, আমরা হাঁটছিলাম, দেখছিলাম। চলতে চলতে কথা, গান, ছবি তোলা সবই চলছিল। তারপর একটি বড় টিলা পড়লো সামনে। কিছুটা খাড়া দেখে শাকিল গেল তেহজীবকে ধরতে। আর সে কি বিরক্ত! শাকিল ওকে ছেড়ে এরপর ওর সাথে গল্প শুরু করলো। টিলা পার হয়ে সামনে এগিয়ে কিছু ঘরবাড়ি দেখলাম। জানলাম, এই লোকালয়ের নাম কাপতলা। এলাকার এক বাড়ি থেকে রান্নাবান্নার জন্য হাঁড়ি জোগাড় করে আনলো শাকিল। এলাকার কিছু পাহাড়ি বাচ্চা আমাদের দেখছে অবাক হয়ে। এর মধ্যে একটা বোনের কোলে তার ভাইকে দেখে আমি তাকিয়েই রইলাম। কি মিষ্টি দেখতে ভাইবোন দুইজন! 

এরকম বাঁশের সাঁকো পার হতে হয়। ছবি: সাব্বির ভাই
মনজুড়ানো এমন অনেক দৃশ্যই চোখে পড়বে। ছবি: সাব্বির ভাই

কাপতলা থেকে ডানের নিচু পথে নেমে সামনে হেঁটে গেলে দুইটা রাস্তা পাওয়া যাবে। একটা বামে, একটা ডানে। ডান দিকে গেলেই পাওয়া যাবে হাতিমুড়া। কিন্তু আমরা হাঁটা দিলাম বামদিকে। সাব্বির ভাই বললেন, মায়ুং কপালের উপরে পাড়ায় না, আমরা পিকনিক করবো একটা নদীর পাড়ে। এটা আমাদের জন্যে সারপ্রাইজ। নদীর নাম গুমতী তৈসা। এদিকে মানুষের পদচারণা নেই বললেই চলে। যাওয়ার পথে দশ মিনিটের মতো একেবারে জংলা পথ। তেহজীব হাঁটে আর বলে, এতো জঙ্গল কেন? দুই একটা জায়গায় বড় বড় গাছ ভেঙে পড়ে আছে। ঝকঝকে রোদে নীল আকাশের নিচে সবুজের ভিড়ে এই ভেঙে পড়া গাছগুলো দেখে মনে হচ্ছিলো প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া ভাস্কর্য। এরপর শুরু হলো ঝিরি পথ। পুরো পথটাই প্রায় পাথুরে। লোক চলাচল কম বলে পাথরগুলো পিচ্ছিল। আমি যথারীতি কয়েকটা আছাড় খেলাম। তারপর পা টিপে টিপে পৌঁছে গেলাম নদীর কাছে। নদীটা দেখে মনে হলো, ভরা বর্ষায় এই নদীর রূপ হয়তো সাঙ্গু নদীর মতো হয়। পাথরগুলো ডুবে যায়। নদীটা জুড়ে আছে ছোট বড় পাথর।   

পাথুরে নদী গুমতী তৈসা। ছবি: সাব্বির ভাই
প্রাকৃতিক ভাস্কর্য। ছবি: সাব্বির ভাই

এদিকে সাব্বির ভাই, শাকিল, প্রশান্ত, লিওন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো রান্নার আয়োজনে। ছেলেগুলো খুবই করিৎকর্মা। কিভাবে যেন ঝটপট পাথর, গাছের ডালপালা জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়ে ফেললো লিওন আর প্রশান্ত। সাব্বির ভাই দেখি দারুণ একটা ছুরি নিয়ে উঠে পড়ে লাগলেন মুরগি কাটতে। চমৎকৃত হয়ে দেখছিলাম কিভাবে চোখের পলকে মুরগি টুকরো করা হয়ে গেল। ঝিরির পানিতে চাল-ডাল ধুয়ে দ্রুত হাতে এই মসলা, সেই মসলা মিলিয়ে খিচুড়ি চড়িয়ে দিলেন চুলায়। এদিকে আর সবাই যে যার মতো নদীতে গোসলের জন্যে চলে গেলেন। মুশতাক, আমি আর তেজুও গেলাম একটু ঘুরে আসতে। গোসলও সেরে নিলাম এই ফাঁকে। শীতের এই সময়টায় নদীতে পানি নেই তেমন। তবে পানি ভীষণ ঠাণ্ডা।

চুলায় আগুন জ্বালানো। ছবি: লেখক
খিচুড়ি রান্না হচ্ছে। ছবি: লেখক

গোসল সেরে ফিরে দেখি খিচুড়ি হয়ে গিয়েছে। মুরগি রান্না হচ্ছে। চুলায় তরকারি নাড়ার জন্যে ব্যবহৃত হচ্ছে গাছের ডাল। লাকড়ির চুলায় রান্না শেষ হতে সময় লাগলো না। সবাই এর মাঝে গোসল সেরে চলে আসলো জায়গামতো। প্রশান্ত শসা, লেবু ধুয়ে দিল। কাটাকুটি হয়ে গেলে এবার পরিবেশনের পালা। চামচ তো আনা হয়নি। এখন উপায়? কিন্তু সাব্বির ভাই যেখানে, চিন্তা নাই সেখানে। উনি একটা পানির বোতল কেটে মুখ লাগানো অংশটা দিয়ে চামচ বানিয়ে নিলেন। হাতে হাতে পৌঁছে গেল খিচুড়ি-মাংস। সাথে ছিল কিনে আনা তেঁতুলের চাটনি। খুব ভালো ঘ্রাণ আসছিল খাবারের। কথায় বলে না, ঘ্রাণেই অর্ধভোজন। স্বাদের কথা কি বলবো! অনেকদিন মুখে লেগে থাকবে। খাওয়া হলে পরে সুন্দর করে বালু দিয়ে হাঁড়িগুলো ধুয়ে দিল প্রশান্ত আর শাকিল। লিওন আর সাব্বির ভাই সব গুছিয়ে ফেললেন। পুরো আয়োজনটা একেবারে মনের মতো হয়েছে এই মানুষগুলোর অকৃত্রিম আন্তরিকতায়। তারপর সবাই মিলে গুমতী তৈসায় একটা গ্রুপ ছবি তোলা হলো। উঠে পড়লাম। যার উদ্দেশ্যে এসেছি, সেই স্বর্গের সিঁড়িতে যেতে হবে। 

গুমতী তৈসায় গ্রুপ ছবি: শাকিল

অদ্ভুত একটা ভালোলাগায় মনটা ভরে ছিল। বিলাইছড়ির গাছকাটা ট্রেইলে দেখেছিলাম, স্থানীয় পাহাড়িরা এরকম জঙ্গলে, ঝিরির পাশে পিকনিক করছে। কেউ রান্না করছে, কেউ গান বাজাচ্ছে। আবার যার মন চাচ্ছে, পানিতে গা ভিজিয়ে নিচ্ছে। ভাবছিলাম, ইস! আমিও যদি পারতাম। আমার সেই ইচ্ছাটাও পূরণ হয়ে গেল। 

এই ভিডিও লিংকে ক্লিক করে আমাদের সাথে ঘুরে আসতে পারেন মায়ুং কপাল: https://youtu.be/rHYTu_qiSMQ

আমরা গিয়েছিলাম এক্সট্রিম ট্রেকার অফ বাংলাদেশ (ইটিবি) এর সাথে। তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো:
https://www.facebook.com/groups/extremeTbangladesh/?refid=12

সেতু দাস: ০১৮৮৩৬৯৭৭২৮
মিরাজুল ইসলাম সাব্বির: ০১৭১০২৮৯৯৮৪/ ০১৮৬১৯৮০০৩৮

আমার ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন নিচের লিংকে: https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ আমরা কিন্তু কোন উচ্ছিষ্ট বা আবর্জনা ফেলে আসিনি। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: মোস্তাক হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মসজিদের শহর খলিফাতাবাদ: খান জাহান আলীর মাজার

মসজিদের শহর নগর খলিফাতাবাদ: জিন্দাপীরের খোঁজে