in ,

LoveLove

মারায়নতং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: চূড়ায় পদার্পণ

বেশ ছোট একটা পাড়া, এখানে মুরংদের বসবাস। ঘরগুলো টং ঘরের মতো। প্রত্যেকটা ঘরের নিচেই ফাকা জায়গা রয়েছে যেখানে শুকনো কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সংরক্ষণ করা হয় এবং গবাদিপশু রাখা হয়। গরু, শুকর, ছাগল দেখলাম আশেপাশে চড়ে বেড়াচ্ছে। পাড়া থেকে উপরের দিকে উঠে যাওয়া শুরু করতেই আকাশের রঙ পরিবর্তন হয়ে গেলো। অল্প সময়ের মধ্যেই মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেলো প্রকাণ্ড সূর্যটা, সূর্যের তাপও কমে গেলো সাথে সাথেই। বৃষ্টির সম্ভাবনা যে অমূলক ছিলোনা সেটা ধারনা করতে পেরেই জোড় কদম হাঁটা শুরু করলাম, কিন্তু পিঠে ওজনের ব্যাগ নিয়ে প্রচণ্ড রকমের খাড়া একটা বাক উঠতে বেশ বেগ পেতেই হলো। বট গাছের নিচ পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই ঝমঝম করে নেমে পড়লো বৃষ্টি। বৃষ্টির একেকটা ফোটা তীক্ষ্ণ, ধারালো তীরের ফলার মতো গায়ে এসে বিধতে লাগলো। দৌড়ে বটগাছের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিলাম।   

বৃষ্টিতে আশ্রয় বটগাছের নিচে। ছবি: লেখক

এখানেই দেখা হলো এক গাইডের সাথে যিনি বস্তায় ভর্তি করে ২৭ জনের এক গ্রুপের তাঁবু নিয়ে উপরে উঠছিলেন। গাইডের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে টুকিটাকি গল্প করতে করতে বৃষ্টির পরিমান আরো বেড়ে গেলো, আমরা কাকভেজা হয়ে গেলাম। অনেকটা সময় বিশ্রাম নিয়ে বৃষ্টি থামার সাথে সাথেই রওনা দিলাম আবার মারায়নতং চূড়ার উদ্দেশ্যে। রাজন ভাই এখনো আগে আগে যাচ্ছে, বৃষ্টি হওয়ার ফলে ইট বিছানো রাস্তা কিছুটা পিচ্ছিল হয়েছে হাটতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে বৃষ্টির পরপরই আশেপাশের পাহাড়ের দৃশ্য চকচকে সবুজ লাগছিলো। 

মেঘ সবুজের পথে। ছবি: লেখক

পাড়াটা মোটামুটি মাঝামাঝি উচ্চতায়, আমাদের এখনো অর্ধেক পথ বাকী। তবে এখন তাপমাত্রা কম, রোদ নেই তাই গরম কম লাগছিলো। একটা সময় আমি এগিয়ে গেলাম এবং কিছুটা সমতল জায়গা পেলাম কয়েক মিনিটের জন্য। সমতল জায়গা পেয়ে হাঁটার গতি বেড়ে গেলো যার ফলে অন্য দুইজন থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হলো। সমতল জায়গাটাতে একটা বাগানের মতো, আম গাছ এবং আরো বেশ কিছু ফল গাছ দেখলাম। পাহাড়ি আম নাকি খুব সুস্বাদু যদিও আমার কখনো খাওয়া হয়নি। 

সর্পিল মাতামুহুরি। ছবি: লেখক

বাগান থেকে বের হয়েই বুঝতে পারলাম চূড়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছি, বাশের চাটাই দিয়ে ছোট্ট একটা গেইট বানানো এবং সেখান থেকে জুমঘরের দেখা মিলছে দেখা যাচ্ছে আকাঙ্ক্ষিত মারায়নতং চূড়া। এখন শুধু ছুয়ে দেয়ার অপেক্ষায়। এখানে এসে ইট বিছানো রাস্তার কিছুটা ভগ্নদশা চোখে পড়লো, অতি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাই একাই উঠে গেলাম উপরের দিকে, পিছনের দুইজনের এখনো দেখা পাওয়া যাচ্ছেনা। বেশ কিছুটা উঠে আসার পরে থামতে হলো, ঘামে চিটচিটে হয়ে গেছে গায়ের টি-শার্টটা। ব্যাকপ্যাকটা রেখে টি-শার্ট চিপে ঘাম ফেললান তারপর একটা স্যালাইন ঢেলে দিলাম পানির পটে। ব্যাগ থেকে বের করলাম খেজুর। এই ধরনের ট্রেকিং যেখানে প্রচণ্ডভাবে ক্লান্ত হয়ে যেতে হয় এবং একইসাথে ব্যাগের ওজন কমানো প্রয়োজন সেখানে খেজুর খুবি উপকারী। এক দুইটা খেজুর খেয়ে পানি পান করলে কিছুটা শক্তি পাওয়া যায় শরীরে তাই ভ্রমণে খেজুর আমার পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে।  

মিরিঞ্জা রেঞ্জের সবুজ দেখি। ছবি: তাহান ভাই

খেজুর খেয়ে আর স্যালাইন পান করে বিশ্রাম নিতে নিতে দূর থেকে দেখা মিললো ভ্রমণসঙ্গীদের। প্রথমেই উঠে এলো তাহান ভাই, তার কিছুক্ষণ পরে পাগলা রাজন ভাই। পিঠে ব্যাগপ্যাক আর হাতে কাঠের জ্বালানী নিয়ে। এসেই দুজনে হাপাতে হাপাতে বসে পরলো। তারাও খেজুর খেয়ে স্যালাইন  পান করে বিশ্রাম নিলো। আমরা চূড়া থেকে অল্প দূরত্বে অবস্থান করছিলাম যার ফলে মিরিঞ্জা রেঞ্জের সৌন্দর্য চোখের সামনে একে একে হাজির হতে শুরু করলো। যেদিকেই চোখ যায় সবুজ, সবুজ আর সবুজ। চোখ ধাধানো সবুজে শীতল হচ্ছে দৃষ্টি। রোদ আর মেঘের লুকোচুরি চলছিলো তখন জোরেসোরে।  আবার যাত্রা শুরু হলো। 

হেটে চলা নিরন্তর। ছবি: লেখক

এবার আর বেশিক্ষণ যাওয়া লাগলো না দশ মিনিটের মধ্যেই আমরা দ্বিতীয় চূড়ায় উঠে গেলাম। দ্বিতীয় চূড়া থেকে প্রথম চূড়ার গাছ এবং জাদি বা বৌদ্ধ মূর্তিগুলো দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় চূড়ার জায়গাটাও খুব সুন্দর কিছুটা সমতল জায়গা আছে এখানে। এখানে থেকে তিন দিকের চমৎকার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কাছে দূরে ছড়ানো ছিটানো জুমঘর। জুম চাষের ফসলে বাতাস দোলা দিচ্ছে আর ঢেউ খেলানো এক সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। তবে এতো প্রাণখোলা সৌন্দর্যের মাঝে পীড়া দিলো এই চূড়ায় পূর্বে যারা ক্যাম্পিং করেছিলো অথবা ঘুরে গেছে তাদের ফেলে যাওয়া আবর্জনাগুলো। ব্যবহৃত প্লাস্টিক, বিস্কুটের প্যাকেট, চিপসের প্যাকেট, বারবিকিউর কয়লাসহ বিভিন্ন আবর্জনা ছড়ানো ছিটানো। 

ঐ দেখা যায় মারায়নতং চূড়া। ছবি: লেখক

এখানে এক পশলা বৃষ্টি দিয়েই আমাদের স্বাগত জানালো জাদি। কিছুক্ষণ সৌন্দর্য উপভোগ করে আবার হাঁটা শুরু করলাম প্রথম চূড়ার দিকে। আসল সৌন্দর্য এখনো বাকী। জানিনা কি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। মাতামুহুরি নদীর পাশে চির ধ্যানরত জাদির কাছে আজকের সৌন্দর্যের আকুতি। দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম মূল চূড়ায়। চূড়ায় উঠতেই রোদটা কোথায় যেনো লুকিয়ে গেলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘের ঝাপটা এসে ছুয়ে দিয়ে গেলো আমাদের। জাদি আমাদের স্বাগত জানালো মেঘমালা দিয়ে। দুইটি জাদি বা বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে চূড়াতে, কয়েকটি গাছ আর একটি মাচাং ঘর যার সংস্কার কাজ চলছিলো।                        

মেঘে ঢাকা জাদি। ছবি: লেখক

এখান থেকে ৩৬০ ডিগ্রী একটা ভিউ পাওয়া যাচ্ছে, এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে আন্তর্জাতিক নদী মাতামুহুরি। চারপাশে মিরিঞ্জা রেঞ্জের উঁচু উঁচু সব চূড়া যার মধ্যে উপচে পরছে সবুজের অবগাহন। বৃষ্টি ফোটা চাকচিক্যময় করে তুলেছে সকল উদ্ভিদগুলোকে। যেদিকেই চোখ যায় সবুজ পাহাড়ের উপচে পড়া ঢেউ খেলানো সৌন্দর্য। আমরা মাচাং ঘরে ব্যাগ রাখতে না রাখতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। গোসল করা হবেনা এরকম মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলাম আমরা কিন্তু আচমকা স্বাগত বৃষ্টিতে না ভিজার মতো বেরসিক কেউ হতে পারলাম না। ঘামে ভেজা ক্লান্ত দেহকে ভাসিয়ে দিলাম বৃষ্টি ফোটার নিচে। সাথে সাথে যেনো শরীরের সব ক্লান্তি, ঘাম উবে গেলো কর্পূরের মতো। নির্ঘুম চোখ পেলো প্রশান্তির ছোয়া। মনে ভেসে উঠলো কবিগুরুর ‘বর্ষা যাপন’ কবিতার পঙক্তি- 

অবারিত সবুজের পঙক্তিমালা। ছবিঃ লেখক

বাড়িছে বৃষ্টির বেগ থেকে থেকে ডাকি মেঘ
ঝিল্লীরব পৃথিবী ব্যাপিয়া
এমন ঘন ঘোর নিশি দিবসে জাগরনে মিশি
না জানি কেমন করে হিয়া

(চলবে…)

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখুন এই লিঙ্কে: https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঐতিহ্য অন্বেষণে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি: হারিয়ে যাই ঐতিহ্যে

মারায়নতং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: চান্নি পসর রাইতে প্রস্থান