in

LoveLove

ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার সন্ধানে: তুক অ দামতুয়া

‘১৭ কিলোমিটার ল্যান্ডমার্ক থেকে ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণা’

অবাক হলেও সত্যি আমাদের কোন ন্যাশনাল আইডি কার্ড, পরিচয়পত্র কোন কিছুই নিবন্ধন করতে হয়নি। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এসেও খা খা একটা ট্রেইল। আজ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেই খা খা ট্রেইল মানুষের পদচারনায় কতটা না মুখরিত। বেড়েছে মোটর সাইকেলের ভাড়া। চান্দের গাড়ীর ভাড়া থেকে শুরু করে গাইড ফি বাড়ার রেসিও দেখে ভাবি এই ট্রেইলেই কি গিয়েছিলাম ২০১৭ সালে। ১৭ কিলোমিটার ল্যান্ডমার্ক থেকে খুব কাছেই আদুপাড়া৷ মুরং একটা ছেলেকে গাইড হিসাবে নিলাম যার বাংলার শব্দ ভাণ্ডার খুব অপ্রতুল।

তার সাথে সিম্বোলিক ল্যাংগুয়েজ ভাব আদান প্রদান করতে লাগলাম। মুরং ভাষার ফাকে ফাকে দু একটা বাংলা বলে। আদুপাড়ার ব্যাগ রেখে শুরু হল আমাদের যাত্রা। পাহাড়ী উঁচু নিচু পথে আপ হিল ডাউন হিল মারতে গিয়ে আমরা কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘামের ফোটা পড়ছে।

হারাবে পথিক আজ ওই আকাশের নীলিমায় এই সবুজের অরণ্যে ঘেরা পাহাড়ের মাঝে। ছবি: লেখক

পাহাড় উঠার ব্যাপারে আমি আমড়া কাঠের ঢেকি হিসাবে আমার বেশ বদনাম আছে। সবার পিছে থেকে কিছু সুদ্ধ বাতাসের সিগ্ধতায় হাঁটতে লাগলাম। ততক্ষণে লক্ষ্য করলাম আমার পিছে আসছে তাবলীগ জামাতের একটা টীম। এ কি আমার হ্যালুসিনেসন নাকি সত্যি। ৬০ বছরের দুজন তাগাড়া পৌড়ের সাথে হাটকা ডাটকা মুশোলদেহী নওজওয়ানের দল ট্রেকিং করে আসছে। সবার পড়নে পাঞ্জাবী এবং তাদের লিডার জাকিয়ুল ভাই।

মুখে একটা হাসি দিয়া সালাম দিলেন জাকিয়ুল ভাই। তার কাছে শুনতে পেলাম আলী কদমে ধর্ম প্রচারের কাজে এসেছিল পুরো টিম। তিনি স্থানীয় আলীকদমের ছেলে। পুরা ১৫ জনের পাঞ্জাবী বাহিনী নিয়ে এসেছেন ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার খোঁজে। এর মধ্যে দুই চাচার স্টেমিনা দেখে আমি অবাক হয়ে নির্বাক ভাবে পাহাড়ী বন্ধুর পথে হাঁটতে লাগলাম। চাচা বললেন বাবা তোমরা আমার থেকে ১ ঘণ্টা আগে যাবা আমি এক ঘণ্টা পরে এই হল পার্থক্য।

ওয়াংপা ঝর্ণা। ছবি: লেখক

প্রায় ৪০ মিনিট ট্রেকিং শেষে পামিয়া মেম্বারপাড়ার ঠিক আগে পেলাম একটা জুম ঘর। পাহাড়ে জুম ঘরগুলো যেন পথিকের জন্য শান্তির পসরা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। জুম ঘরে আমরা সবাই বসে লক্ষ্য করলাম দূর পাহাড়ে দেখা যাচ্ছে একটা ঝর্ণার আপারস্ট্রিম। ২০০-৩০০ ফুট উপর থেকে পানি গড়িয়ে নিচে পড়ছে। এত দূর থেকেও কর্ণকুহরে ঝর্ণার স্রোতধারা সংগীতের মত বাজে। আমাদের গাইড ভাংগা বাংলায় বললো এইটা ওয়াংপা ঝর্ণা। এখানে খুব কম লোক যায়, খাড়া পাহাড় আর মানুষ যাবার পথ না থাকার কারণে। এখানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে চলে এলাম আমাদের কাংখিত পামিয়া মেম্বার পাড়ায়।

সাজানো গুছানো পামিয়া মেম্বার পাড়া যাবার সময় টের পেলাম চাচা আমাদের ধরে ফেলেছেন। মুখে এক চিলতে হাসি। এখানে খানিকটা রেস্ট নিয়ে নিচে নেমেই পেয়ে গেলাম ঝিরিপথে। আহা ঝিরিতে শান্তি, ঝিরিতে স্বর্গীয় অনুভূতি। ঝিরির শীতল পানির ছোয়ায় সারা দিনের ক্লান্তির ছাপ ধুয়ে যায়।

ঝিরিপথ। ছবি: লেখক

এখানে থেকে এক ঘণ্টার মত হেঁটে আর একটা খাড়া পাহাড় টপকিয়ে এসে পড়লাম কাখৈপাড়া। তুক অ দামতুয়া যাবার আগে এইটাই শেষ পাড়া। অদ্ভূত চোখে তাকিয়ে আছে এই পাড়ার পাহাড়ী শিশুগুলো। ঘোত ঘোত শব্দে শূকরের দল জানান দিচ্ছে তাদের উপস্থিতি। এই পাড়ায় জাম্বুরা গাছের পরিমাণ অনেক বেশি। দূর পাহাড়ে দেখা যায় জুমঘর।

স্বপ্নবিলাশী মনে হাহাকার জাগে আহা ওই জুমঘরটা যদি আমার হত, ওই পাহাড়টা যদি আমার হত৷ কাখৈ পাড়ায় জিরিয়ে এবার নিচে নামার পালা। নিচে নেমেই শুরু হল ঝিরিপথ। আর ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর এসে পড়লাম একটা প্রকাণ্ড জলপ্রপাতের সামনে। মূলত এখান থেকেই শুরু ব্যাঙ ঝিরি৷ সিড়ির মত রাস্তা। মূল ঝর্ণার কয়েকশ গজ উপরে এই জলপ্রপাত। কোন শিল্পী যেন নিখুত হাতে পাথরে খোদাই করে তৈরি করেছে মাটির ধাপগুলো।

আমাদের নিনজা চাচা। ৬০ বছরের দেহে অফুরন্ত এর্নাজি৷ ছবি: লেখক

জলপ্রপাত আর খাড়া পাহাড় পাড় করেই আমরা পেয়ে যাব সেই খাড়া পাহাড়ের ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণা। পাহাড় কিছুটা ডিংগিয়ে নিচে নামতে লাগলাম। পাথুরে মাটির পথ থাকায় নামায় বেগ পেতে হচ্ছে না। তবে সাময়িক উত্তেজনায় ব্যালেন্স হারিয়ে কিছুটা পথ ছেছড়িয়ে নিচে নামলাম। আতংকে শিড়দাড় খাড়া হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে সামলিয়ে আবার নিচে নামতে লাগলাম। নিচে নামার পর হারিয়ে গেলাম আমি অন্য ভুবনে৷

ঝর্ণার পানিতে তৈরি হয়েছে মাঝারি জলাশয়ের মত। সেই পানিতে গা ভাসিয়ে দিলাম পালহীন নৌকার মত৷ আহ কি শান্তি৷ হীম শীতল পানির আলতো স্পর্শে আমি যেন পৃথিবীর মাঝে ক্ষণিকের স্বর্গ খুঁজে পেলাম হে বিধাতা তোমার সৃষ্টি যদি এত সুন্দর হয়, না জানি তোমার স্বর্গ আরও কত সুন্দর৷ দুই দিকে থেকে পড়ছে ঝর্ণার পানি।বুনো গর্জনে জানান দিচ্ছে তার উপস্থিতি৷ এই ধরনের ঝর্ণাকে ডাবল ফলস বলে।

খাড়া পাহাড়ের সেই ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণা। তুক অ দামতুয়া এক স্মৃতির রোমন্থন। ছবি: লেখক

মুক্তার দানার মত সফেদ পানির স্রোতধারা। যতই এর বর্ণনা দিতে যাব ভাষা কম পড়ে যাবে। আধাঘণ্টা ঝর্ণার ভুবনে হারিয়ে রইলাম আমরা পথহারা ক’জন নাবিক। কোন শব্দ নয়, কোন ক্লান্তি নয় নিঃশব্দের মাঝে যেন অদ্ভূত কোন বোধ আছে৷ এই প্রথম আমার দল কে নিয়ে গর্ব হল। অন্য সব দল ঝর্ণায় গেলে চিল্লাই, গান গায়, ঝাপাঝাপি কাপাকাপি লাগিয়ে দেয়। আর এরা নিরবে নিভৃতে বুঝার চেস্টা করে ঝর্ণার ভাষা।

অন্য ভুবন থেকে পিছে মানুষের পদচারনায় ফিরে এলাম বাস্তবে। আমাদের পিছের জাকিয়ুল ভাইয়ের দল এসে পড়েছে। আর এসে পড়েছে আমার সেই চাচা মিয়া। বয়স তার জন্য কোন বাধা নয়। যে জায়গায় আমরা হাড়গোড় ভাংগার ভয়ে ২০-৩০ ফুট পিছুল পাথুরে পথ বেয়ে ঝর্ণার উপরে উঠি নাই সেই জায়গায় আমাদের নিনজা চাচা এসেই উপরে উঠে গেলেন। উঠেই ক্ষেমা দিলেন না। ২০-৩০ ফুট উপর থেকে নিচে ঝাপিয়ে পড়লেন। নিনজা চাচার এহন কর্মকাণ্ড দেখে অনেকের মধ্যেই সাহস সঞ্চয় হল উপরে উঠা শুরু করলাম। আর আমি আমার এই নধরকান্তি দেহ আর ডুবিয়ে দিলাম গভীর থেকে গভীরে। জলের রাজ্যে গিয়েও আমার প্রাণপ্রিয় বড় ভাই ঈসমাইলের উত্তেজিত কণ্ঠ শুনলাম। ন্যাচরাল ভিউ। এইটা আবার তার পাঞ্চ লাইন। এবার আমাদের ফেরার পালা।

ঝর্ণার ডাকে সাড়া দেয় কেরে। ছবি: লেখক

ফেরাটা এত সহজ ছিল না। কিন্তু সাথে ছিল যে নরম মনের দানব ওয়াফি আহমেদ। অর্ধেক রাস্তায় রগটান খেয়ে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে ছিলাম। ত্রাণকর্তা হিসাবে হাজির ওয়াফি। এমন ম্যাসেজ দিল ২ মিনিটে পা চাংগা৷ এরপর অদ্ভূত ভাবে আমাকে গোটা দশেক লাফ দেওয়ালো। আমি পুরা ফিট৷ এরপর কোন বাধা বিপত্তি ছাড়া এসে পড়লাম সেই আদুপাড়া। আমাদের ব্যাগ নিয়ে যখন ১৭ কিলোমিটার ল্যান্ডমার্কে পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে। আর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা নেমে আসবে৷ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল মোটর বাইক। উঠে বসলাম সাই সাই বেগে চলতে লাগলো আমাদের দ্বি-চক্রযান আলীকদমের উদ্দ্যেশে। বিদায় খাড়া পাহাড়ের ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণা। তবে এই বিদায় যে শেষ নয়। কিছু গল্প না হয় জমিয়ে রাখলাম আলী কদমের জন্য৷

ফিচার ইমেজ: ঈসমাইল হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার সন্ধানে: ডিম পাহাড়ের হাতছানি

মহেরা জমিদার বাড়িতে একদিন