in

ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার সন্ধানে: ডিম পাহাড়ের হাতছানি

দ্বিতীয় দিন
(থানচি – ১৭ কিলোমিটার – আদুপাড়া – পামিয়া মেম্বারপাড়া – কাখৈপাড়া – তুক অ দামতুয়া – আলী কদম)

থানচির সেই কাক ডাকা ভোরে কোন মায়া লুকিয়ে ছিল। সকালটা শুরু হল ঝিরি ঝিরি মাতাল হাওয়ার বেগে। সবাই মোটামুটি সাড়ে ছয়টার মাঝে উঠে রেডি হয়ে নিল। বাজারে এসে মটর সাইকেল সংকটের কারণে হাতে খানিকটা সময় পাওয়া গেল। পাহাড়ে ঘেরা থানচি উপজেলা। আর এই পাহাড়ের মাঝেই গড়ে তুলেছে বিজিবি সীমান্ত অবকাশ রিসোর্ট।সুউচ্চ পাহাড়ের উচ্চতায় অবস্থিত অবকাশ রিসোর্ট সাজিয়েছে যেন মনোরম ভাবে। পর্যটক আর্কষণের সব এলিমেন্ট এখানে আছে।

থানচি আসার আর একটা কারণ পাওয়া গেল। এই অবকাশ রিসোর্ট। নীলগিরি নীলাচলের মত এখানেও সকাল সকাল মেঘের ভেলা দেখা যায়। দূর পাহাড়ের বুনো সবুজের মাঝে সারি সারি মেঘ যেন সৃষ্টিকর্তা আপন মন ভুলানো ক্যানভাসে একেছে সুনিপুন ছবি৷ অবকাশ রিসোর্ট ঘুরে আবার ফিরে এলাম মামুন ভাইয়ের দোকানে মটর বাইক আসতে আসতে সকাল ৮টা বেজে গেল৷ শুরু হল আমাদের ডিম পাহাড়ের উদ্দ্যেশে এক রোলার কোস্টার রাইড৷

চল পথিক ওই ডিম পাহাড়ের পথে। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

মটর বাইক চলছে ডিম পাহাড়ের সেই আকা বাকা উচু নিচু সর্পিল রাস্তা দিয়ে৷ অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষদের কাছে বর্তমান সময়ে বেশ জনপ্রিয় দেশের সর্বোচ্চ উচু সড়ক (প্রায় ২,৫০০ ফুট) বান্দরবানের থানচি-আলীকদমের ডিম পাহাড়ের সড়ক। ডিম পাহাড়ের অবস্থান আলীকদম এবং থানচি থানার ঠিক মাঝখানে। এই পাহাড় দিয়েই দুই থানার সীমানা নির্ধারিত হয়েছে।ডিম পাহাড় দেখতে ডিম্বাকৃতির মত তাই স্থানীয় মানুষ নাম দিয়েছে ডিম পাহাড়৷ সকাল সকাল ডিম পাহাড়ে শুভ্র সাদা ফেনার মত মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।

সেপ্টেম্বরের এই গরমে কনকনে শীত অনুভব করতে লাগলাম। আর পেটে যেন প্রজাপতি উড়েছে৷ পুরা শরীরে কাটা দিয়ে গেল। রোমাঞ্চ ভরপুর এই ডিম পাহাড়ের রাস্তায় আমাদের মটর বাইক চলছে মেঘের ফেনা ভেদ করে৷ মেঘে ঢাকা ডিম পাহাড়ের যে দিকে তাকাই শুধু সবুজ আর সবুজ। সবুজের মাঝে এক মরনের হাতছানি দিয়ে ডাকছে ডিম পাহাড়। ডিম পাহাড় নিয়ে আছে নানা উপকথা ও মিথ। বহুল প্রচলিত টিপরা সম্প্রদায়ের মিথটি না জানালেই নয়৷

ডিম পাহাড়ের রাস্তা। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

‘টিপরা সম্প্রদায়ের উশে প্রু খুব মা ভক্ত ছেলে। মা’র প্রতি তার ভালবাসা ছিল পাহাড়ের সমান। বাবা মারা যাবার পর মা কে নিয়ে উশে প্রু’র ছোট সংসার। উশের মা একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। গ্রামের ওঝা উশের মা কে দেখে বললো এই রোগ সারবার নয়। ধুকে ধুকে কস্টে পেয়ে মরবে উশের মা। তবে বাঁচানোর একটা উপায় আছে। সে উপায় যে বড্ড ভয়ংকর৷ ভেংগে পড়লো উশে ওঝার কাছে জানলো আকুতি। মা কে বাচাতে যে কোন ঝুকি নিতে রাজি। জানতে চাইলো তার কি করতে হবে।

ওঝা বললো, এখান থেকে তিন দিনের হাঁটার পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে ভয়ংকর এক পাহাড়ে। ডিমের মত তার আকৃতি। তাই নাম হয়েছে ডিম পাহাড়। প্রতি পূর্ণিমা রাতে সেই পাহাড় চূড়ার শীর্ষে অদ্ভূত এক ফুল ফুটে। সেই ফুলের রস পান করালে সেরে উঠবে উশের মা। তবে ভোরের সূর্যের প্রথম কিরণের স্পর্শে সেই ফুল ঝরে পড়ে যায়। এই ফুল কে পাহারা দেয় এক বিশাল আকৃতির দানব। এই ডিম পাহাড়ে আজ পর্যন্ত কেউ যেতে পারে নাই। যারাও বা গিয়েছে প্রাণটি হাতে নিয়ে ফিরতে পারে নেই। মরতে হয়েছে সেই দানবের কাছে।

সেনাবাহিনীর গাড়ি। ছবি: লেখক

সব কিছু শুনেও উশে রাজি ডিম পাহাড়ে যেতে। মা কে যে খুব ভালবাসে উশে প্রু। একা যেতে সাহস সঞ্চয় করতে পারছিল না উশে। এর মধ্যে উশের বিপদে ত্রার্ণকর্তা হিসাবে হাজির হল বন্ধু থুই প্রু। বিপদেই বন্ধুর পরিচয়। দুই বন্ধু মিলে পাহাড়ের এই ভয়ংকর পথ পাড়ি দিয়ে তিনদিন পর পৌঁছালো ডিম পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি৷

থুই প্রু কে রেখে উশে একাই পাহাড়ের চূড়ার দিকে চলল। বন্ধুর প্রাণ যে তার কাছে প্রিয়, তাই নিজের ঝুকি নিজে নিবে সাহসী উশে প্রু। থুই প্রু দেখল তার বন্ধু ধীরে ধীরে পাহাড়ের চূড়ার দিকে উঠে যাচ্ছে। মাঝরাতে আধারের আমানিশা ভেদ করে পূর্ণিমার চাদের আলো গায়ে মেখে এগিয়ে যাচ্ছে উশে। বন্ধু উশে কে পাহাড় চূড়ার শীর্ষে পৌঁছাতে দেখলো থুই প্রু। থুই লক্ষ্য করলো উশে কিছু একটা তার উদ্দ্যেশে ছুড়ে মারছে। গড়িয়ে গড়িয়ে সেই জিনিষ থুই প্রুর পায়ের কাছে এসে থামলো।

এখান থেকেই তো নতুন গল্পের শুরু। ছবি: লেখক

থুই দেখলো একটা ছোট থলে। থলে খুলে দেখলো ভিতরে পাথর আর তাদের অতি আকাঙ্খিত পাহাড়ি ফুল। উশেকে ইশারায় থুই জানালো ফুল পেয়েছে। উশেও জানালো সে নিচে নামছে। উশের সাথে সেই থুইয়ের সেই শেষ দেখা। আর কোনদিন তার দেখা পাওয়া যায় নেই। পুরো এক রাত একদিন অতিবাহিত করার পর থুই গ্রামে ফিরে আসে। ফুলের রস পান করে ভাল হয়ে উঠে উশের মা। কিন্তু উশেকে চিরদিনের জন্য হারালো। মায়ের জন্য আত্মত্যাগের কারণে টিপরাদের মধ্যে অমর হয়ে আছে। এখনও সেই দানব হুংকার শুনা যায় গভীর রাতে। পাহাড়ের দানব আজও বসে আছে মানুষের রক্ত মাংসের স্বাদ পাওয়ার জন্য।’

মিথের জগৎ থেকে ফিরে আসি বাস্তবে। মটর সাইকেল ততক্ষনে এসে পড়েছে ১৭ কি.মি. ল্যান্ড মার্কে। এখান থেকেই গাইড নিয়ে আমাদের ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার সন্ধ্যানে যেতে হবে৷

ফিচার ইমেজ: ঈসমাইল হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিলাইছড়ির পথে: ন-কাটা ঝর্ণা

ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার সন্ধানে: তুক অ দামতুয়া