fbpx

খুমের রাজ্যে গুম: আমিয়াখুম

নাফাখুম থেকে ফিরে সেই রাতে গভীর ঘুম দিয়ে পরদিন খুব ভোরে উঠে পড়লাম। শরীর ব্যথায় মনে হচ্ছিলো ছিঁড়ে যাচ্ছে। পা ভেঙে আসছিল। ঘরের সিঁড়ি বেয়েই নামতে পারছি না। যাইহোক, কোনরকমে ব্রাশ হাতে, চোখ কচলাতে কচলাতে টয়লেটের দিকে যাচ্ছি, এমন সময় ডাক শুনলাম, ‘তামান্না আপু!’ তাকিয়ে দেখি, টিজিবির কিরণ ভাই। বড় এক টিম নিয়ে এসেছেন। পদ্মমুখ ঝিরি দিয়ে ঢুকেছেন ওরা, তাই দেখা হয় নাই। পদ্মমুখ ঝিরি দিয়ে অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হয়। উঁচু নিচু পাহাড়, বাঁশের সাঁকো, ঝিরি এরকম পথ। সেই দিক থেকে রেমাক্রি দিয়ে যাওয়াটা তুলনামূলক আরামের। থুইসাপাড়া থেকে আমিয়াখুম যাওয়ার পথ একই। আজকে সবাই একসাথেই যাবো আমিয়াখুম। যাক, ভালোই হলো! ফ্রেশ হয়ে এবার তেজীকে ডাকার পালা। চিন্তায় পড়ে গেলাম, ওকে কিভাবে নিবো। নিজের শরীরের অবস্থা ভেবে মনে হলো, ওর তো তাহলে আরো খারাপ লাগছে। কিন্তু না, দুই একবার ডাকতেই উঠলো। তৈরি হলো। জিজ্ঞেস করলাম, পা ব্যথা করছে? বললো, না। দেখে বোঝা যাচ্ছিলো ঘুমটা ঠিকমতো হয় নাই। তবুও একবারও বলে না, আমি যাবো না! যাইহোক, সবাই উঠে, নাস্তা করে, তৈরি হতে সময় লাগলো। আমাদের সাথের চারজন রয়ে গেলেন। ওনারা যাবেন না বললেন। অগত্যা তাদের রেখেই সেখানে গ্রুপ ছবি তুলে আমরা রওনা হলাম। 

থুইসাপাড়ায় আমরা। ছবি: মাসুম ভাই

রোদ উঠে গিয়েছে। গরম লাগছিল অনেক। আস্তেধীরেই হাঁটছিলাম সবাই। উঁচু নিচু পাহাড় উঠছিলাম। এভাবে একসময় পৌঁছালাম দেবতা পাহাড়ের মাথায়। ওখানে অনেকেই বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পরে জেনেছিলাম, এই পাহাড়ের নাম হচ্ছে দেবেন্দ্র পাহাড়। এখান থেকেই নামতে হয় সেই ভয়ংকর দেবতা পাহাড়, প্রায় ৬০০ ফুট উঁচু। সামনে কিছু গ্রুপ নামছিল। আমরাও শুরু করলাম। এতো মানুষ ছিল পাহাড়ে যে জ্যাম লেগে গেল। আমি ভাবছিলাম, এই সেই দেবতা পাহাড় যা সবাই এতো ভয় পায়? পাহাড়টা খাড়া অনেক, সেটা নিচে থেকে তাকালে বোঝা যায়, কিন্তু এখন প্রচুর মানুষের যাতায়াতের কারণে নামার পথটায় বেশ একটা সিঁড়ির মতো ধাপ সৃষ্টি হয়েছে। খুব ভয়ানক কিছু না। বৃষ্টি হলে একটু রিস্কি, কারণ পিছল হয়ে যায়। এবং বৃষ্টি শুরুও হলো। প্রথমে হালকা, তারপর বেশ বৃষ্টি। সামনে দুই আপু ছিলেন অন্য গ্রুপের, যেতে পারছেন না। তাই আমরাও নামতে পারছি না। জ্যামে আটকে আছি। বিপদ আরো বাড়ছে। যাইহোক, ওনাদের রেখে পরে বাকিরা এগিয়ে গেলেন। আমরাও নামা শুরু করলাম। অন্য গ্রুপের যারা সামনে ছিলেন, দড়ি বেঁধে দিয়েছিলেন। আমাদেরও কাজে লাগলো। জয়দা মাটি খুঁড়ে একটু ধাপের মতো করে দিচ্ছিলেন। দড়ি ধরে, গাছপালা পেঁচিয়ে, বাঁশে ভর দিয়ে, মাটিতে বসে, যেভাবে সম্ভব নামছিলাম আমি। কিরণ ভাই আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। উনি একজন আমিয়াখুম বিশেষজ্ঞ। এর মাঝে রাসেল ভাই যে শত্রুতা শুরু করলো আমার সাথে! একটু পর পর লাইফ জ্যাকেট হাত থেকে ফেলে দেয় আর সেই শব্দে আমার মনে হয় কেউ উপর থেকে আমার ঘাড়ের উপর পড়ছে! এমনিই আমি ভীতু মানুষ। এর মাঝে মুশতাক এক আছাড় খেয়ে আট দশ ফুট নিচে নেমে গেল। আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া! যদিও দেবতা পাহাড়ে আপনি বড়জোড় আছাড়ই খাবেন, একদম পাহাড় থেকে পড়ে যাবেন এমন এখনো শোনা যায়নি।   

দেবতা পাহাড়ের শুরু। ছবি: রাসেল ভাই
দেবতা পাহাড়ের পথে। ছবি: মাসুম ভাই
পথে বিশ্রাম নেয়াটা আবশ্যক। ছবি: রাসেল ভাই
দাঁড়িয়ে, বসে যেভাবে সুবিধা নামতে হবে দেবতা পাহাড়। ছবি: মাসুম ভাই

এদিকে আমার মেয়ে মোটামুটি পুরোটা হেঁটে গিয়েছে। তার দুইপাশে দুই বডিগার্ড ছিলেন। মাসুম ভাই আর তার বাবা। কিছু জায়গায় তাকে হাত ধরে পার করতে হয়েছে। তবে কোলে নিতে হয় নাই, এটাই রক্ষা। দেবতা পাহাড় থেকে নেমে ডানে দশ মিনিট হেঁটে গেলেই পড়বে ভেলাখুম। নিজেরাই চালিয়ে ভেলায় করে ঘুরে আসতে পারেন। আমি চুপচাপ পানিতে একটা পাথরে বসে ছিলাম। ঠাণ্ডা পানি! তেহজীবকে একটা ভেলায় উঠিয়ে দিল মুশতাক। পরে সে তার বাবা আর চাচ্চুদের সাথে লাইফ জ্যাকেট পড়ে অনেকদূর পর্যন্ত সাঁতার কেটে আসলো। সাহস বেড়ে গেল অনেক। আমাকে বলে, মা ভয় পেয়ো না!

ভেলাখুমে তেহজীব। ছবি: মাসুম ভাই
ভেলাখুমে আমরা কয়েকজন। ছবি: মাসুম ভাই

ভেলাখুম থেকে আবার হাঁটতে লাগলাম। মিনিট বিশেক হাঁটলেই আমিয়াখুম। সেই স্বপ্নের আমিয়াখুম! একদম স্রষ্টার নিজের হাতে গড়া। চারপাশে সুন্দর লেয়ার করা ধাপগুলো। পানি পড়ছিল সেইরকম ক্ষিপ্রতায়। চারপাশ থেকে অনেকে লাফঝাঁপ দেয়া শুরু করলেন। মুশতাকও তোড়জোড় করছিল। মেয়ে এমন কান্না শুরু করলো! আর লাফ দিতে পারলো না। অগত্যা আমরা এক জায়গায় বসে জলকেলি করছিলাম। এদিকে আয়েশা আপু শাড়ি পরে সেই ট্রেন্ডি ছবিটা তুলে ফেললেন। ঝাঁপও দিলেন পানিতে। ওনাকে নরমসরম মনে হলেও আসলে সাহসী মানুষ। আমিয়াখুম থেকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই সাতভাইখুম দেখতে পাবেন। আবার একজন বললেন, ভেলা করেও নাকি ভেলাখুম থেকে সাতভাইখুম চলে যাওয়া যায়। আমার মতে, এই নাফাখুম-আমিয়াখুমে সব ঋতুতে একবার করে যাওয়া উচিত। আমি নিশ্চিত, প্রতিবারই ভিন্ন রূপে মুগ্ধ করার ক্ষমতা নিয়েই সৃষ্ট এই জলপ্রপাতগুলো। 

আমিয়াখুমের কোলে আমরা। ছবি: মাসুম ভাই
আমিয়াখুমে তেহজীব। ছবি: মাসুম ভাই

ছেড়ে যেতে মন চায় না। তবুও যেতে হবে। পাহাড়ে উঠতে বেশি সময় লাগলো না। আমার মেয়ে দেখি দশ পর্যন্ত গুনে আর কয়েক ধাপ করে উঠে। মাসুম ভাই আর রাসেল ভাই এইভাবে ওর সাথে খেলছিলেন আর সে উঠছিল। একটা হচ্ছে, আমি পারছি না, আমাকে সাহায্য করছে কেউ। আরেকটা হচ্ছে, আমি পারছি না, আমাকে মোটিভেট করছে যে আপনি পারবেন। ওরা ঠিক সেই কাজটাই করছিল তেহজীবের বেলায়। সন্ধ্যা হলো আমাদের থুইসাপাড়া পৌঁছাতে। রাতে খেলাম ভাত, জুমের পুঁইশাক, মুরগী, ডাল এবং যথারীতি আচার। তেহজীবও মজা করে খেলো। থুইসা দাদার মেয়ে জামাইয়ের সাথে কথা হলো। খুবই ভালো মানুষ। এর মাঝে থুইসা দাদা এসে তেহজীবকে বললেন, ‘তুমি আমিয়াখুম গেসিলা? কতোজনের চুল দাড়ি পেকে গেসে, তারাও যেতে পারে নাই, জানো?’ 

থুইসা দাদার স্ত্রী ও নাতনীর সাথে। ছবি: ফারাবী ভাই

সেইরাতেও আমরা পাড়ায় থাকলাম। রাতে ঘরের খোলা বারান্দায় বেশ একটা আড্ডা হলো। যারা রয়ে গিয়েছিলেন, তারা বললেন, পাড়ায় পানি নিয়ে নাকি ব্যাপক ঝগড়া হয়েছিল। আমরা পাহাড়ে যাই যারা, আসলে অনেক বুঝে শুনে পানি খরচ করা উচিত। ওদের ঝিরি থেকে পানি আনতে হয়। আমরা শখে একদিন পাহাড় চড়ি, ওরা প্রয়োজনে প্রতিদিন এই কষ্টকর কাজটা করে। 

পরদিন সকালে উঠে সবার থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটা ধরলাম রেমাক্রির উদ্দেশে। পথে প্রায় পুরোটাই ঝিরি। প্রতিটা ঝিরিতে তেহজীব ঝাঁপাঝাঁপি করছিল। মাথার উপর ঠাডা রোদ ছিল। আমরা কোথাও গেলে এমনই হয়। একদিন ঝুম বৃষ্টি, একদিন এমন রোদ যে পুড়ে কয়লা হয়ে ঢাকায় ফিরি! রেমাক্রি ফেরার পথে নাফাখুমে আবার যাত্রাবিরতি হলো। এর মধ্যে রাসেল ভাই কতোদূর যেয়ে আবার ফিরলেন। বললেন, ‘তেহজীবের দরকার হয় নাকি, তাই আবার আসলাম।’ শাহীন ভাইও অনেক সাহায্য করছিলেন আমাদের। ফেরার পথে এক টং দোকানে বসে আমরা ডিম খেলাম। তেহজীব গোগ্রাসে খেলো মিষ্টি মুড়ি।

তপ্ত গরমে রেমাক্রির পথে। ছবি: মাসুম ভাই
ঝিরির মজা। ছবি: নি আপু

এভাবে একসময় রেমাক্রি পৌঁছে গেলাম। রেমাক্রি ফলসে বসে মজা নিচ্ছিলাম। পরে নৌকা চলে আসলো। খেয়ে উঠে পড়লাম নৌকায়। এদিকে বৃষ্টি শুরু হলো আবার। আর তারপর সাঙ্গুর যে রূপ দেখলাম! সেই বড় বড় ঢেউ! যখন তখন নিচে পাথরগুলোতে বাড়ি খাচ্ছে নৌকা। চারপাশ থেকে ঢলের পানি আসছে বোঝা যাচ্ছে। পুরাই পাগলা সাঙ্গু! মাঝিগুলো বয়সে কম হলে হবে কি, অভিজ্ঞতায় ভরপুর। নাহলে যেকোন কিছুই হতে পারে। ভরা বর্ষায় কতো রিস্কি এই নদী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে দুইপাশের সবুজ পাহাড়, বৃষ্টি, উথালপাতাল ঢেউ… সব মিলেমিশে একাকার। তাই এতো বিপদজনক পরিস্থিতিতেও আমার মনে পড়ছিল রবি ঠাকুরের সেই গানটা…

তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি,
ডুবতে রাজি আছি, আমি ডুবতে রাজি আছি॥

হ্যা, মনে হচ্ছিলো এই যাত্রা ডুবে গেলেও কোন আফসোস নাই! আরেকটা ভাবনা আসছিল মনে। পাহাড়ে এসে এতো সুন্দর বৃষ্টি দেখলাম, আবার ফাঁকে ফাঁকে রোদও উঠছিল, যদি রংধনুটাও দেখা যেতো…

বৃষ্টিতে সাঙ্গু। ছবি: রাসেল ভাই

থানচি পৌঁছে জামাকাপড় পাল্টে, খাওয়াদাওয়া করে চান্দের গাড়িতে উঠলাম বান্দরবান শহরের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে যেতে যেতে হঠাৎ একজন বললো, ঐ দেখো, রংধনু! মন থেকে চাইলে আসলে সবই পাওয়া যায়। পাহাড়ের রংধনুও দেখা হয়ে গেল! 

অপার্থিব প্রকৃতির বুকে দুদণ্ড বসে যাওয়া। ছবিঃ মাসুম ভাই

খুবই কষ্টকর এই ট্র‍্যাকিং ট্যুর শেষ হওয়ার আগেই আবার যাওয়ার প্ল্যানিং হয়ে গেল। শীতে ক্যাম্পিং করবো জলসুন্দরীর কোলে। আসলে প্রকৃতি এমনই। কাউকে পুরোপুরি ফিরতে দেয় না। ভালোলাগার কিছুটা অংশ সেখানে রেখে আসতে হয়। সেই টানেই আবার যেতে হয়!

আমরা যে গ্রুপের সাথে গিয়েছিলাম, তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

https://www.facebook.com/groups/HitTheTrailBd/

মাসুম ভাই: ০১৬৭২৯৭০৭১৪

রিফাত ভাই: ০১৯৩১৮০০১৩৯

রাসেল ভাই: ০১৮৭৩৩৪০১২২

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে আমরা জায়গা নোংরা করি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top