in ,

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: দ্বিতীয় পর্ব

রাত ১২টা পর্যন্ত চলে আমাদের গান, গল্পের আসর৷ এবার ঘরে ফেরার পালা। সি-বিচের পার ধরে হেঁটে যাচ্ছি। মৃদু হাওয়া, বুনো গর্জনে রাতের জোয়ারের কথা জানান দিচ্ছে বে অব বেঙ্গল। কিছু দূর হেঁটে গিয়ে দেখতে পারলাম দূরে দেখা যায় আমাদের মারমেইড রিসোর্ট আর তার দ্বারে সাগরের নোনা জল এসে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কাছাকাছি যখন এসে পড়লাম তখন দেখতে পারলাম এ পথ পারি দিতে পা ভিজাতে হবে।

আগের বছর পানির লেভেল কম ছিল এবার একেবারে ম্যারমেইডের দরজায় এসে বে অব বেঙ্গল কড়া নাড়ছে। পূর্ণিমার আলোয় সাগরের জোয়ারের খেলায় তীরে এসে সফেদ ফেনা সৃষ্টি করছে। এ যেন পথিকের কল্পনার বাহিরের এক চিত্র। নিজ নীড়ে ফিরে প্রথমেই স্লিপিং ব্যাগ, বালিশ, ফ্যান তল্পিতল্পা নিয়ে তাঁবুর ভিতর প্রবেশ করলাম। সারাদিনের ধকলে ঘুম ধরেছে বেশ। এর মধ্যে তাঁবুর ল্যাম্প জ্বালিয়ে মিহির সেন গুপ্তের ‘মধ্যদিনের গান’ বইটার দুয়েক পাতা পড়ার চেস্টা করলাম। আস্তে আস্তে গাঢ় হতে থাকলো চোখের পাতা। তলিয়ে গেলাম স্বপ্নে নীল পরীর দেশে।

নীল পরীর দেশ, লাগছে বড় বেশ। ছবি: লেখক

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারলাম নাসির ভাই আমার তাঁবুতে বসে ফটোসেশন করছে৷ বেঁচারার কোমড়ের জোর কমে গেছে বিধায় তিনি তাঁবু থেকে রুমবাসী হয়েছেন। না হয় থাকার কথা আমার তাঁবুতে। রুম থেকে দাঁতন নিয়ে বের হল আমি ঘুম ভাঙ্গানিয়া পাখি৷ ছেঁড়া দ্বীপ যাব সাত সকালে হেঁটে হেঁটে মনে সবার আনন্দ। তবে ২৩ জনের গ্রুপ নানা ঋষির নানা মত।

আমাদের রিসোর্টের প্রবেশদ্বারে শোভা পাচ্ছে নারিকেল গাছ৷ দুপাশে নারিকেল গাছ আর সামনে নোঙর দিয়ে বেঁধে আছে মাছ ধরার নৌকা। যেন প্রকৃতি নিজ হাতে সৃষ্টি করেছে ফটোফ্রেম৷ কি অপূর্ব তার চাহনী। এর মধ্যে পুরা দলের ভিতর একটা ছন্নছাড়া ভাব। সকাল সাড়ে সাতটা বাজে প্রকৃতি সেজেছে আপন সাজে৷ এর মাঝেও তাঁবু থেকে ক্ষণে ক্ষণে শোনা যাচ্ছে নসিকা গর্জনের ধ্বনি।

দ্বীপের ভিতর জিপসি তাঁবু। ছবি: লেখক

সিনিয়র সিটিজেন নাসির, টিপু ভাই কোন রংগিলা ফটোগ্রাফারকে ধরেছেন ফটো সেশনের জন্য। আমি, আসিফ, শুভ, মাহমুদুল, রনি ভাই তাদের সাথে জয়েন করলাম। পেটে ছুঁছো দৌড়াচ্ছে বিধায় আমরা এই ছোট দল নিয়েই বাহারের পথে পা বাড়ালাম। বাকিরা পড়ে আসবে৷ হোটেল বাহারের সকালের আয়োজন ও সামান্য৷ খিচুড়ি, ডিম ভুনা। তবে খেলাম পেট পুরে।

টিপু ভাই আজকে চলে যাচ্ছেন বাসায় জরুরি তলব পড়েছে। আমাদের খাওয়ার পর্ব শেষে প্যাটল সুমন গংদের প্রবেশ ঘটে। ফিরে এলাম মারমেইডে। আধা ঘণ্টা পর তারাও ফিরে এল। এবং ঘোষণা দিল যাওয়া হচ্ছে না এখন ছেঁড়া দ্বীপ। দুপুরে খেয়ে যাবে। নানা ঋষির নানা মত আগেই বলেছি৷ এখন আমরা কাঁচা রোদে সমুদ্র স্নান করবো৷

সমুদ্রের টানে। ছবি: লেখক

লাইফ জ্যাকেটটা পড়ে আছে কাজে লাগানোর এই মোক্ষম সময়৷ পরে নিলাম জল তরংগে আজ ভাসাবো দেহ৷ সবাই নেমে গেছে সমুদ্রে স্নানে। লাইফ জ্যাকেটের এক বিরাট সুফল আবিষ্কার করলাম। কোন হাত পা না ছুড়েই ভেসে আছে এই নধরকান্তি দেহ। মনে হয় আমি নীলাভ জলরাশির বুকে শুয়ে আছি। ঢেউ আসছে ভাসাচ্ছে। আমার কোন কূল নাই কিনার নাই। অন্ততকাল ধরে ভাসছি৷

এর মধ্যে কোথা থেকে ফুটবল মাথায় এসে আঘাত করলো বাস্তব জগতে ফিরে এলাম। খেলা শুরু হয়েছে জলের মাঝে আজব ভলিবল আর বোমবাস্টিং মিসেল এক অদ্ভূত খেলা৷ জল কুমাররা জলকেলী খেলায় ব্যস্ত৷ কেউ ফাটছে কেউ জলে ডুবছে কেউবা সাঁতার কাটছে। আনন্দের নহর বইছে চারদিকে। প্রায় এক-দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে সমুদ্র স্নান করার পর উঠে এলাম সমুদ্রের বুক থেকে৷

মাছ ধরার নৌকা বাধা ছিল পাড়ে। ছবি: লেখক

আজ দুপুরের আয়োজন মারমেইডে। তাদেরও তো হক আছে৷ উদ্ধোধন হল তাদের চুলা৷ মাছ ধরা নিষেধ বিধায় ডিম, সবজি, ডাল, ভাত দিয়ে সারা হল খাবার। রাতের আয়োজনের জন্য মুরগীর বারবি কিউ আর পোলাওয়ের অর্ডার হল৷ বিশ্রামের ফাঁকে শুনতে পারলাম নাসির ভাই, দিদার ভাই চলে যাচ্ছেন ব্যক্তিগত কারণে। তাদের বিদায় দিয়ে এবার আমাদের বের হবার পালা। বের হতে হতে তিনটা বেজে গেল।

অনিশ্চিত আজ ছেঁড়া দ্বীপ যেতে পারবো কি না৷ গ্রুপটাও ছন্নছাড়া হয়ে গেল। আমি আর রনি ভাই বাকি সবার হাঁটার স্পীড দেখে বিরক্ত হয়ে আরবী ঘোড়া চালালাম। হাঁটছি ছেড়া দ্বীপের পথে৷ এই সাইডে হেঁটে আসলে অনেক কিছুই দেখা যায়। সাগরের গাঢ় নীলাভ জলরাশি পাড়ে এসে ধাক্কা দিচ্ছে আর তারই মাঝে কেয়া বন সবুজের মাঝে যেন নীল স্বপন। নারিকেল গাছ গুলো যেন মাথা উঁচু করে দূর থেকে জানান দিচ্ছে নারিকেল জিঞ্জিরার অস্তিত্ব। দুধের মত সাদা ফেনা উপরে সোনা রোদ আর তার বুক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আত্মভোলা দুই পথিক৷

নীল দরিয়া পার হয়ে আসে সফেদ ফেনার ঢেউ। ছবি: লেখক

গলাচিপা পার হয়ে খানিকটা দূর গিয়ে এক স্থানীয়কে জিজ্ঞেস করলাম ছেঁড়াদ্বীপ আর কতদূর। সে বললো আরও দুই ঘণ্টা লাগবে। মাথায় যেন আকাশ ভেংগে পড়লো, বলে কি গত এক ঘণ্টা ধরে তো হাঁটছি। চারদিকে থই থই পানি অথচ তৃষ্ণা নিবারনের জন্য খুঁজতে হচ্ছে পানি। এই প্রথম পানি না নিয়ে বের হবার জন্য আফসোস হল। আর কিছুদূর এগিয়ে প্রবাল দ্বীপের সেই বিখ্যাত প্রবালের সাথে দেখা হল। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রবাল তার মাঝে যাবার জন্য এক চিলতে রাস্তা।

হেঁটে যায় রনি ভাই। ছবি: লেখক

প্রবালের রাস্তা পার হয়ে আমি আর রনি ভাই দেখতে পারলাম দুইটা বাচ্চা খেলা করছে। তাদের হাতে কেয়া ফল। অনেকটা দেখতে আনারসের মত। জিজ্ঞেস করলাম বাবু এইগুলা কি খাওয়া যায় তারা এত আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিল কিছুটা তব্দা খেয়ে গেলাম। এরা না কি কেয়া ফল প্রায়ই খায়৷ প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেও হিমালয়ের উঁচু স্থানে কেয়া ছিল। আমাদের প্রাচীন সাহিত্য, হিন্দু-পুরাণ, লোককাহিনীতে কেয়ার কথা লেখা আছে। এইটা মূলত ওষুধি গাছ। নারিকেল জিঞ্জিরার মূল আর্কষণ নারিকেল গাছ তো আছেই, এর সাথে তাদের সঙ্গ দিচ্ছে কেয়া আর ঝাউ গাছ। ঝাউ বনের পাতা ঝিরি ঝিরি হাওয়া নড়ছে। হীম শীতল বাতাসে দেহ মন ভরে যাচ্ছে। আবার শুরু করলাম হাঁটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: প্রথম পর্ব

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: তৃতীয় পর্ব