in ,

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: প্রথম পর্ব

dav

নীলের কথা ভাবলে স্মৃতির পাতা থেকে উঠে আসে সেন্টমার্টিন। ছোটবেলার ভালবাসা, আবেগ, অনুভূতি সবকিছুর সাথে জড়িত এই নীল পরীর দেশ। বাংলাদেশে থেকে জীবনে একবার হলেও যার এই দ্বীপে যাবার সৌভাগ্য হল না তারা জীবন ষোল আনা নয় বত্রিশ আনাই বৃথা। আগের বছর ডা: সোহান ভাইয়ের ইভেন্টে যাবার পর, এ বছর তার কোন ইভেন্ট না দেখে কিছুটা মর্মাহত হলাম। কোন কিছু না ভেবে ফারুক ভাইয়ের একটা পোস্ট দেখে সেন্ট মার্টিন যাবার ইচ্ছা পুনরায় জেগে উঠলো।

গতবারের মত একটা রিইউনিয়ন ট্যুরের জন্য ইভেন্ট তৈরি করে প্রস্তবনা দিলাম। আগের বারের মত এবার ও তাঁবুবাস হবে। অনেক জল্পনা কল্পনার পর প্ল্যান হলেও যতই ট্যুরের দিন ঘনিয়ে আসে এক এক করে নক্ষত্র ঝরে পড়ে।সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলাম মুনতাসিম ভাইকে হারিয়ে। উনার হাতে বানানো খিঁচুড়ি আর ঝোল করে রাধা হাঁসের মাংসের স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে। আর আমাদের সোহান ভাই ব্যস্ত বিসিএস নিয়ে৷ ভিলেন রাব্বি আর রুহুল’দা ছুটির গ্যাড়াকলে পড়ে ঝরে গেল৷ থেকে থেকে রয়ে গেল হারাধনের ১১টা ছেলে সাথে তাদের বোন পারুল।

নাফ নদীতে কোস্ট গার্ডের ট্রলার। ছবি: লেখক

ট্যুরের একদিন আগেও জানতাম না ক’জন যাব। আমাদের প্যাটলা সুমন ভাই, আর মেহরাব ভাইয়ের ফ্রেন্ড সার্কেল মিলে সংখ্যাটা শেষ পর্যন্ত ২৩ হল। ১১ জনের টিকেট আগে কাটা হলেও বাকি ১২টা টিকেট খুব তাড়াহুড়ার ভিতর একদিনে কাটা হল। এবার যাবার পালা। শীপ না ছাড়ায় খুশিতে ১০টা লাফ আগেই দিয়ে নিলাম। পুরা খালি দ্বীপে নিব নীল জলরাশির অনুভূতি। ২৪শে অক্টোবর দিবাগত রাতে যাত্রা শুরু হল সেন্ট মার্টিনের পথে।

খুব সকালে টেকনাফ আমাদের বাস এসে পৌঁছালো। আবার সেই পুরান নীড়ে নতুন করে ফিরা, আবার সেই পুরান অনুভূতি ফিরে ফিরে আসা। সকালের নাস্তা পর্ব সেরে এবার আমাদের ২৩ জনের দল রওনা হলাম ট্রলার ঘাটের দিকে। ট্রলার উঠে মৃদু বমির উদ্দ্যেগ হল। মুরগীর খাঁচিতে বন্দী মুরগী করুণ দশায় দুঃখ পাব না কি নিজের সেইটা বুঝতে পারলাম না। আমরা ২৩ জন ছাড়াও অল্প সল্প মানুষ দেখলাম। টেকনাফ এসে দেখা হয়েছে হাদি ভাই, লুংগী রানা ভাই আর ওয়াফির সাথে। তাদের লক্ষ্য ছেঁড়া দ্বীপে ক্যাম্পিং।

ওই দেখা যায় সেন্টমার্টিন। ছবি: লেখক

চারদিকে এত হাওয়ার মাঝে ট্রলারে কেন মনে হচ্ছে বায়ুহীন। এত মানুষ নড়াচড়ার জায়গা নাই৷ নাফ নদীর বুকে সবুজ নীলাভ টারকুয়িস জলরাশি ভেদ করে চলছে আমাদের স্বপ্নতরী। কিন্তু খানিকটা দূরে গিয়ে বাঁধ সাধলো বিজিবি৷ ট্রলার ওভার লোডের কারণে জুটলো কিছু উত্তম মধ্যম সারেংয়ের কপালে৷ ওভার লোডের কথা শুনে চিকন ঘামের রেখা কপালের এক কোণে দেখা গেলে সবার সামনে হাসিমুখে বসে রইলাম৷ প্রায় এক ঘণ্টা লেট করে আর একটা ট্রলার আসার পর দুইটাকে চেক করে এক সাথে ছাড়লো৷ প্রিয় নাফ নদী আর প্রিয় মানুষগুলোকে সাথে নিয়ে পথের হল আবার শুরু।

আরকান পর্বতের সেই স্রোতধারা থেকে সৃষ্টি এই নাফ নদী টেকনাফের হোয়াক্যাং ইউনিয়নের পূর্বদিক থেকে এগিয়ে মায়ানমারের সাথে মিলিত হয়ে এই নাফ নদী বাংলাদেশ ও মায়ানমার সীমান্ত হয়ে দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। নাফ নদীর মূল স্রোতধারা থেকে যখন সাগরে প্রবেশ করবো অদ্ভূত অনুভূতি নিয়ে ভাষাহীন ভাবে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম। বিধাতার কি অপরূপ সৃষ্টি। সাগর আর নদীর মিলনস্থলে পানি এক সাথে না মিশে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এরপরও আমরা কোন কোন সৃষ্টিকে অস্বীকার করবো৷

নীল সবুজের মিতালি। ছবি: লেখক

বঙ্গোপসাগরের সচ্ছ নীলাভ জলরাশি, বড় বড় ঢেউয়ের স্রোতে ডানে বামে কাত হচ্ছে ট্রলার৷ আজানা অচেনা ভয় গ্রাস করে নতুনদের। কিন্তু এই পথের পুরান সাথী তো জানে অক্টোবর থেকে মার্চ সাগর থাকে শান্ত। ছিঁছকাঁদুনে ফুল বাবু না হলে দিব্যি আসা যায় কোন বড় অঘটন ছাড়া। তবুও মনে হাজার প্রশ্ন খচখচ করে৷ সাঁতার না জেনে উত্তাল সাগর ভরা বর্ষায় সেই কিশোর বয়সে বে অব বেঙ্গল পারি দিয়েছি। তখনকার উত্তেজনা ছিল অন্য রকম।

বয়সের সাথে রক্তে এসেছে ধীরতা৷ তাই সেফটি ফাস্ট। কাঠফাটা গরমে লাইফ জ্যাকেট পরে বসে আছি। প্রায় দুই ঘণ্টা এভাবে চলার পর ট্রলার থেকে এক চিলতে সেন্ট মার্টিনের ঝলক দেখলাম। দূর থেকে সে যেন এক নীলাম্ভ স্রোতধারার মাঝে এক সবুজের অরণ্য। সূর্যের সোনালী আলোয় চিক চিক করছে বালি। এক নস্টালজিক ভুবনে হারিয়ে নিজেকে যেন ফিরে পেলাম আবার সেন্ট মার্টিনের বুকে৷ ঘাটে যখন ট্রলার ভিড়লো চেনা পরিচিত দ্বীপটাকে অচেনা মনে হল।

মৃত প্রবাল। ছবি: লেখক

কোস্ট গার্ডের এই রকম কড়া চেকিং আমি এর আগেরবার এসে দেখি নাই৷ হোটেল বাহারের মাসুম ভাইয়ের সাথে আগেই যোগাযোগ করে রেখেছিলাম৷ সে কক্সবাজার থাকায় তার ছোট ভাই বাবু আমাদের রিসিভ করতে আসলো৷ ২৩ জনের বড় দল প্রথমে গেলাম হোটেল ব্লু প্যারাডাইস৷ গিয়ে হতাশ মাসুম ভাই এই সিজন ছাড়া কোথায় নিয়ে এল৷ মেইন বিচ থেকে ভিতরে পছন্দ হল না। আমরা দুপুরের খাবার হোটেল বাহারে খাব বলে তল্পিতল্পা নিয়ে রওনা হলাম ম্যারমেইড রিসোর্টের পথে।

গত বছর ম্যারমেইড রিসোর্টের বাহিরে তাঁবু পিচ করেছিলাম। এ বছর গিয়ে দেখলাম পানির লেভেল বেড়ে গেছে৷ রাতে পানি মারমেইডের দরজা পর্যন্ত এসে পড়ে৷ আর কোস্ট গার্ডে এবার রাত ১১টার পর বিচে থাকা যাবে না এই রকম একটা উদ্ভট নিয়ম করেছে, তাই সিদ্ধান্ত হল রিসোর্টের ভিতরে তাঁবু পিচ করবো। কমন রুমে আমাদের ব্যাগ রেখে খেয়াল করলাম এ বছর মারমেইডে হ্যামক চারটা ঝুলিয়েছে৷ গা এলিয়ে দিলাম হ্যামকে৷ চোখ মুদিলাম৷

আদুরে কুকুর, দ্বীপের পাহারাদার। ছবি: লেখক

এত বড় গ্রুপের ম্যানেজার হবার অভিশাপ আরামের চিন্তা নাই। সবাই দুপুরের খাবারের জন্য উদগ্রীব। পর্যটক বিহীন সেন্টমার্টিনে এখন হোটেলগুলো খা খা মরুভূমি। তাই বাহার হোটেলে বাবু ভাইকে আগেই বলে রেখেছিলান ২৩ জনের ব্যবস্থা করে রাখেন৷ আমাদের দুপুরের খাবার হতে হতে ৩টা বেজে গেল৷ লোক নাই, বার্বুচি নাই হোটেল বাহারে। লোক জোগাড় করে চুলা জ্বালাতে জ্বালাতে তাই দেরি হয়ে গেল।

আর এর মাধ্যমে এ বছর পর্যটক সিজনের আগে হোটেল বাহারের চুলা আমরা উদ্ধোধন করে দিলাম। খাওয়ার আয়োজন খুবই সামান্য। ভাত, আলু ভর্তা, ডাল, ডিম ভুনা৷ ক্ষুধা পেটে তাই অমৃত মনে হল। যাবার সময় বাবু ভাইকে রাতে বারবি কিউ করার কথা বলে গেলাম। ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মাছ ধরা নিষেধ। মাছের বদলে মুরগী! তাই সই। খাওয়ার পর্ব শেষে ফিরে এলাম মারমেইডে। এবার তাঁবু পিচের পালা। অনেকে প্রথম তাঁবু পিচ করছে। অনেক কস্টে তারা যখন তাঁবু পিচ করলো আমি আমার পপ আপ তাঁবুখানা ছেড়ে দিলাম। ২ সেকেন্ডে কাজ শেষ দেখে ব্যাপক হিংসার স্বীকার হলাম। এক পাশে হ্যামক, এক পাশে তাঁবু। আমার সুখের নীড়৷

চল বন্ধু ভাসাই মন পবনে নৌকা। ছবি: লেখক

তাঁবু পিচ শেষে এবার সাগরের আহবান বেধে রাখা দায়৷ হেঁটে হেঁটে চলে এলাম তার টানে৷ আসিফ ভাই আপন ভুবনে হারিয়ে হাঁটছিল। পিছন থেকে ছবি নিলাম৷ কিন্তু সাগরের কাছে গিয়ে গোসল করার জন্য মনটা নিশপিশ করতে থাকলো৷ মোবাইল আর মানিব্যাগ রুমে রেখে এসে আবার ঝাপিয়ে পড়লাম নীল জলরাশিতে৷ সাগরের বুকে ফুঁসে উঠা ঢেউয়ের মত হৃদয়ে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো আবার নতুন করে জেগে উঠে৷ দূর দিগন্ত রেখায় সূর্য ডুবে যাচ্ছে আর আমার কর্ণকুহরে বাজছে সাগরের বুনো গর্জন।

দিন শেষে রাতের আঁধার নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। কি অদ্ভূত আজকে ভরা পূর্ণিমা৷ যৌবন ভরা পূর্ণিমার চাঁদ আস্তে আস্তে উঠছে আকাশপানে৷ আর আমি উঠে এলাম সাগরের বুক থেকে৷ চাপকলের পানিতে গোসল সেরে প্রথমে আমার নিজের ব্যক্তিগত হ্যামকখানা ঝুলালাম। এবার দোল সাগরে ঘুম পাড় রে৷ রাত ৯টার আগে চলে গেলাম আবার হোটেল বাহার। বারবি কিউ এর সাথে চলছে নাচ গান৷ সিনিয়র সিটিজেন নাসির, রনি, টিপু ভাইরা এখানে নিজেদের অবাঞ্চিত ঘোষণা করিলেন।

বেলা শেষে। ছবি: লেখক

২২ ভাইয়ের একমাত্র ভাবী ব্যাপার‍টা উপভোগ করতে লাগলো। তবে এইটাও অভিজ্ঞতা। যে জিনিষ নারী করলে চোখের আর্কষণ পুরুষ করলে চোখের বির্কষণ। বারবি কিউ পার্টিতে সেন্ট মার্টিনের সেলেব্রেটি গায়ক কবি জিন্দা পীর নূর ভাইকে ডাকা হয়েছে। বারবি কিউটা এক কথায় তোফা হয়েছে৷ খাওয়া শেষে চলে এলাম সবাই জেটি ঘাট৷ আঁধারের পূর্ণিমার মাঝে চাঁদের আলোর ফোয়ারা এক অপার্থিব জগৎ সৃষ্টি করেছে৷ এই ভরা পূর্ণিমা রাতে বিস্মিত ভাবে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে চাঁদের ছায়া দেখছি সমুদ্রের বুকে৷ শুরু হল নূরের গানের পর্ব৷ আহা জীবন, জলের মত জীবন, পানির মত জীবন৷

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ময়নামতির দেশে ম্যাজিক প্যারাডাইজে!

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: দ্বিতীয় পর্ব