in ,

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: তৃতীয় পর্ব

dav

আর কিছুদূর যাবার পর আর এক জেলেকে পেলাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই ছেড়াদ্বীপ কত দূর। সে বললো এই জোর দিয়ে হাঁটলে বড় জোর এক ঘণ্টা লাগবে। পিছে তাকিয়ে দেখি দূর-দূরান্তে নীল দিগন্তে কোথাও কেউ নেই। সূর্যের সোনালী রোদে দূর থেকে দেখতে পেলাম এক সাইকেল আরোহী আসছে। রনি ভাই হাল্কা মূত্র বির্সজন দিতে গেছে। সে ফাঁকে আরোহীকে আমাদের আরও কাছে আসতে দেখলাম। দুজন দাঁড়িয়ে আছি কাছে আসার পর বুঝতে পারলাম আমাদের সৌরভ ভাই।

বাকিদের স্লো স্পিড দেখে উনিও বিরক্ত হয়ে সাইকেল চালিয়ে আসছেন। তবে এই মুমিন বান্দা যদি জানতো সাইকেলের রুট ভিন্ন তাহলে এত কষ্ট তার করতে হত না। ইতিমধ্যে আমাদের জেলে ভাই ডাব পান করাতে চাইলেন।দাম দস্তুর করে ২৫ টাকা পার পিস ঠিক হল। ঢুকে গেলাম গ্রামের মেঠো পথ ধারে তাঁর বাড়িতে৷ আমরা জিরিয়ে নিচ্ছি এই তালে উনি গাছে উঠে গেলেন৷

শান্ত সাগরে ভাসিয়েছে সপ্ন তড়ি। ছবি: লেখক

দড়ি ডাবের ছড়িতে ভাল মত বেঁধে নিচ থেকে আমাদের ইশারা দিলেন দঁড়ি আস্তে আস্তে ঢিল দিয়ে নিচে নামাতে৷ এরপর উনি নেমে এসে ডাব কেটে আমাদের খাওয়ালেন। সত্যি বলতে সেন্ট মার্টিন আসার পর থেকে যত ডাব খেয়েছি এর থেকে সেরা ডাব আর হতে পারে না। কচি শাসের সাথে মিস্টি পানি। পানির নহর যেন শেষই হচ্ছে না। ডাবের পানি খেয়ে পেট ঢোল সাগর৷ ভাইব্রেশন দিয়ে নড়ছে তবুও পানি শেষ হয় না। দুখানা ডাব খাওয়া শেষ করার পর দেখতে পেলাম সাড়ে চারটার কাছাকাছি বাজে আবার হাঁটা ধরলাম।

আমাদের সৌরভ ভাই এই প্রবালের পথে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা হাঁটছি। সৃষ্টিকর্তা মনে হয় আমাদের উপর প্রসন্ন ছিল এত মৃত্য প্রবালের ভীড়ে খুঁজে পেলাম জীবিত দুইটা প্রবাল। নরম মানুষের মস্তকের মত প্রবাল দুটো যেন জানান দিচ্ছে তাদের শেষ বংশধরের জন্মকথা। ঘড়িতে পাঁচটার কাছাকাছি বাজে আর আমরা পৌঁছে গেলাম সেন্ট মার্টিনের শেষ মাথায়। এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি আগে যাব কি যাব না।

আমাদের তাঁবুগুলো। ছবি: লেখক

ইতিমধ্যে সৌরভ ভাইকে আবার নতুন করে ফিরে পেলাম। এখন কি ভাবে ছেড়া দ্বীপ যাবে কনফিউজড হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঝাউ গাছের নিচে মাতালী হাওয়ায় কোন যুবক সুখ টান দিচ্ছিলো। তাঁকে জিজ্ঞেস করা মাত্র বললো আর মাত্র আধা ঘন্টা হাঁটলে ছেঁড়া দ্বীপ। তার দেখানো সঠিক রাস্তায় আলা ভূত পেয়ে ভুল রাস্তায় এসে গেলাম। এখানেও প্রচুর প্রবাল। কিন্তু ছেঁড়া দ্বীপের শেষ মাথা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। কম বয়সী কতগুলো কিশোরের দল পেলাম বসে ছিল প্রবালের গা ঘেষে। তাদের জিজ্ঞেস করা মাত্র বললো, এই পথে আপনাদের কে পাঠিয়েছে? এখন আর ছেড়া দ্বীপ যাবেন না। সন্ধ্যা হয়ে যাবে জোয়ারের পানি আসবে৷ আমরা আপনাদের ভিতর দিয়ে পথ দেখিয়ে দিচ্ছি সেখান দিয়ে চলে যান।

আমরা বললাম তোমরা তো সেন্ট মার্টিন ফিরবে আমাদের পথ দেখিয়ে দেও না। তারা বললো আমরা সাইকেল নিয়ে এসেছি আমাদের তো একটু দেরি হবে। আপনারা বড় ভাই মানুষ আছেন সত্যি কথা বলতে তো সমস্যা নেই৷ আমাদের এক বন্ধু ডেট করতে এসেছে আমরা পাহাড়া দিচ্ছি আর মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে৷ রনি ভাই মুখে রস নিয়ে বললো হাফ ডেট না কি ফুল ডেট। ততক্ষণে ঝাউবন থেকে অদ্ভূত সব শুনতে পারছি। ডিস কালচারের কালো থাবা আজ শহর ছেড়ে সেন্ট মার্টিনকেও গ্রাস করলো। অদ্ভূত আমাদের সংস্কৃতি।

হলুদিয়া তাঁবু সাথে হলুদিয়া পান্ডা। ছবি: নাসির ভাই

পাঁচ মিনিটের টাইম লাইন শেষে ছোট ভাইয়ের দল আমাদের মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসলো এরপর বললো এ পথ ধরে সোজা চলে যান। কোন ডান বাম নাই। চাঁদের আলোয় হাঁটছি তিনজন মানুষ গ্রামের মেঠো পথ ধরে। সৌরভ ভাই এক হাতে সাইকেল ঠেলছে আজ যেন শরীরে আসুরের শক্তি ভর করেছে তার। বড় বড় প্রবালের পথ দিয়ে উনি কি ভাবে সাইকেল চালিয়ে আসলেন সেইটাই তো সপ্ত আশ্চর্য।

প্রায় দুঘণ্টা হাঁটার পর ফিরে এলাম আমরা আপন নীড়ে৷ এবার হাল্কা বিশ্রামের পর দেখলাম রাত আটটা বেজে গেছে। এর মধ্যে জানতে পারলাম ধোকাবাজদের দলের একাংশ গলাচিপা থেকে সাইকেল গেছে ছেড়া দ্বীপ আর বাকি দল ভিতরের রাস্তা দিয়ে মেরেছে শর্টকাট আর বাকিরা ক্লান্ত হয়ে গলাচিপা থেকেই ফিরে এসেছে রিসোর্টে।

আকাশে উঠেছে পঞ্চমীর চাঁদ, মরিবার হল সাধ। ছবি: লেখক

নয়টার দিকে আমাদের বারবি কিউ পোলাও এসে পড়লো৷ খেয়ে সিগারেট সুখ টান দিয়ে খানিকক্ষণ সি-বিচে হাঁটলাম। সুখ দুঃখের গল্প সেরে আজ দেহে আর বল নেই৷ রাত ১১টা বাজে আর আমি ফিরে এলাম আমার জিপসি তাঁবুতে।।ফারুক ছেলেটার মধ্যে ইলেক্টিক ইলের মত এনার্জি৷ তারা আবার দলবল নিয়ে চলে গেল জেটিঘাট৷ মনে জিদ কাল সকালে যে ভাবে হক যাব ছেড়াদ্বীপ৷ বাহিরে মাতাল হাওয়া বইছে আর আমি ভাবছি নতুন কোন কবিতা:

আজ আমি দেশান্তরী
নকল দুক্ষের প্রিয় ঘুড়ি উড়িয়েছি আকাশে,
হিয়ার মাঝে নেই কোন বেদনা
পৃথিবীর বুকে টানিয়েছি জিপসি তাঁবু। 
কাঁচা রোদ হেসে উঠে
পথের ধারে বসে আছে আত্মভোলা
নেই কোন মায়া, নেই পিছুটান
দ্বীপের মাঝে ঘর, ঘরের মাঝে জিপসি৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: দ্বিতীয় পর্ব

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: শেষ পর্ব