in ,

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: শেষ পর্ব

সকালে আধো ঘুম আধো জাগরণের মাঝে অবচেতন মনে ছেড়া দ্বীপের শব্দ যেন কর্ণ কুহরে বাজছে। লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম। ঘড়িতে বাজে প্রায় ছয়টা। এত সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারবো কি না ছিল দ্বিধাদ্বন্দ্ব। আর একটি নতুন দিনের শুরু আর আজ এই দ্বীপে আমাদের শেষ দিন ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাঁবু থেকে বের হয়ে সকালে ঝিরি ঝিরি বাতাসে নতুন দিনের সূর্যের এক আহবার টের পেলাম। হেঁটে হেঁটে চলে এলাম সাগর পাড়ে৷ উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটার মধ্যে এক আমেজ লুকিয়ে আছে।

আস্তে আস্তে ঘুম ভাংগলো সব তাঁবুবাসীর। ছেঁড়াদ্বীপের ট্রলার খুব সকালেই ছেড়ে যায় তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যারা যাব জেটিঘাটে সকালের নাস্তা সেরে নিব। আস্তে আস্তে দল ভারি হওয়া শুরু হল। রনি, মাজহার, আসিফ ভাইয়ের সাথে কচি মাহমুদুল, ঝুনা সৌরভ, জাহিদ ভাই জুটে গেল। হাঁটছি ৮ জনের টিম। জেটিঘাট আসতে আসতে বেজে গেল সাতটা। কোন হোটেলে ঢুকলাম মনে আসছে না কিন্তু তাদের সকালের নাস্তা খেয়ে মনে হল বাই চান্স এই দ্বীপ কি আগে মসলার উৎপাদন অনেক বেশি হত। আলু ভাজিতে সাঁতার কাটছে তেলের সাথে মসলা। ডিম অমলেট আর পরোটা দিয়ে কোন রকম খেয়ে নিলাম৷ খেয়েই সিগন্যাল টের পেলাম। ইচ্ছা করছে না সকাল সকাল আবার বাথরুমে যাবার। হাসিখুশি মুখে চেপে গেলাম। সহনীয় পর্যায়ে আছে।

ছেড়া দ্বীপ যাবার পথে। ছবি: লেখক

ট্রলার ঘাট থেকে আটখানা টিকেট কেটে খুশিতে আটখানা হতে পারলাম না। বিশজন না হলে ট্রলার ছাড়বে না। অনন্ত নীলিমা জুড়ে নীল আকাশের সেই সূর্যটা আজ মধ্য গগণে। থেকে থেকে তার তাপ বিকিরনে মাথার চাদি গরম করে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ হল আমাদের ট্রলার৷ এর মধ্যে সেল্ফি ত্রাপল উঠলো মানে তিনজন আর ১২ জনের একটা গ্রুপ উঠলো। ত্রাপল বলার কারণ এই বান্দারা প্রকৃতির বুকে এসে ভোগ না করে বৃহত্তর সেল্ফির স্বার্থে ত্যাগ করে যাচ্ছেন।

সেল্ফির ত্যাগেই যেন দুনিয়ার সব সুখ। এই সুখ তারা ছেড়াদ্বীপে গিয়েও ছাড়তে পারে নেই। আটটা বাজার আগেই আমাদের ট্রলার ছেড়ে দিল। নীল জলের রাশি কেটে কেটে চলছে আমাদের ট্রলার। দূর থেকে সেন্ট মার্টিন যেন আরও সুন্দরী হয়ে গেল। নতুন শতাব্দীর শুরুর দিকেই ছেড়াদ্বীপের সন্ধান পায় ভ্রমণ পিপাসুরা। সেন্ট মার্টিনের সর্ব দক্ষিণে প্রায় ৩ কিলোমিটার আয়তন জুড়ে এই দ্বীপ বাংলাদেশের শেষ ভূ-সীমানা।

ওই দেখা যায় ছেড়া দ্বীপ। ছবি: লেখক

পথে এক নৌকাকে ট্রলারের সাথে বেধে নিয়ে যেতে দেখলাম৷ বে অব বেঙ্গল আজ শান্ত। শান্ত সমুদ্রের জল, গাঢ়নীল সমুদ্র। প্রায় আধা ঘণ্টা পর ছেড়া দ্বীপের শেষ মাথায় চলে এলাম। প্রবালের কারণে তীরে ট্রলার ভিড়াতে পারলো না। এতক্ষণ পর নৌকা সাথে আনার মাজেজা টের পেলাম। দুই ব্যাচে ১২ জন করে এইটুকু পথ পার করে দিবে৷ সিগারেট তৃষ্ণা পেল বড়। প্রথম ব্যাচ তাই মিস হয়ে গেল। এরপর যখন আবার নৌকা ফিরে এল আমাদের গ্রুপ আর সেই সেল্ফি ত্রাপল নৌকায় চড়ে বসলো।

নৌকা যখন পার হচ্ছে আমি জলের খেলা দেখছি। আহা এত সচ্ছ পানি। পানির নিচে দেখা যাচ্ছে মৃত প্রবাল আর এক পাল দুষ্টু মাছের দল। হাত বাড়ালেই ভো দৌঁড় দিচ্ছে৷ পারে নৌকা ভিড়ার সাথে সেল্ফি ত্রাপল নৌকা থেকে নামতে গিয়ে ইম ব্যালেন্স করে ফেললো আর একটু হলে নিজেও পড়তো আমাদের ও ডুবাতো। এরাই সেই বান্দা যারা ভূমিকম্পের সাথে সেল্ফি তুলে৷ আল্লাহ এদের উপর ঠাডা ফেলায় না আমাদের মত পাপীদের শাস্তি দেবার জন্য।

শেষ ভূ-সীমানায় বসে উদাসী পথিক। ছবি: সৌরভ

চতুর্থ বারের মত এই অধমের পায়ের ধুলি পড়লো ছেড়াদ্বীপে। শেষ মাথায় যেতে হলে খানিকটা প্রবাল আর বালু মিশ্রিত পথ পারি দিতে হবে। অপরূপ প্রকৃতির মাঝে দোলা দিচ্ছে ঝাউবনের সারি। পিছে তাকিয়ে কিছু নারিকেল গাছ দেখতে পেলাম। এখানকার ঢেউগুলো যেন পাড়ে এসে আরও জোরে জোরে ধাক্কা দেয়। এই তো সামনে ছেঁড়া দ্বীপের সেই ছেঁড়া অংশ। আমাদের শেষ ভূ-সীমানায় এসে একটা বড় প্রবাল বসে ঢেউয়ের খেলায় সবাই মুগ্ধ দর্শক হয়ে গেলাম। ঢেউ জোরে জোরে পাড়ে ধাক্কা খাচ্ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের। এরপরও এক বুনো মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে রইলাম। দেখতে দেখতে যাবার সময় ঘনিয়ে এল। একরাশ বেদনা নিয়ে ছেঁড়াদ্বীপ থেকে রওনা হলাম। জানি না ২০১৯ সালে আর আসা হবে কি না। মেইন ল্যান্ডে ফিরে এসে প্রথমে ডাব পান করে চাংগা হয়ে নিলাম।

আজ শেষ দিন কিছু ভাল লাগছে না। রিসোর্টে ঢুকে আমাদের তাঁবু গুটিয়ে ফেললাম। বিদায়ের ঘণ্টা বেজে যাচ্ছে। শেষের দিন কিছু সুখ স্মৃতিকে সঙ্গী করে নিয়ে যাব যান্ত্রিক ঢাকায়। শেষবারের মত সমুদ্রে নামলাম। খানিকক্ষণের জন্য যাবার কথা ভুলে গেলাম। আজ আমার কোথাও যাবার নেই এই নীল সাগরের ডুব দিব, হারিয়ে যাব দূরে। সব কিছু থেমে গেছে আজ, আছে শুধু সুরের নোনা বেদনা। এক ঘণ্টা সমুদ্রে কাটানোর পর পাড়ে এসে উঠে বসলাম।

দিন শেষে উড়ে যায় গাংচিল। ছবি: লেখক

তাকিয়ে আছি দূর দিগন্তে। বড় বড় ঢেউগুলো যেন পাড়ে এসে কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে। আর আমি বুনে যাই নকশিকাঁথার বালুচর এই স্বপ্নের বালুকাবেলায়। কাল থেকে অফিসিয়ালি শিপ ছাড়ছে বিধায় আজ ট্রলারের তাড়া নেই। এর মাঝে ডা: সোহানের এতিম বাচ্চাদের হেল্পিং প্রজেক্টের ২টা বাচ্চা এসে হাজির হল। ২০ জন মানুষ ২০০০ টাকা উঠিয়ে তাদের হাতে দিলাম। ছেলে দুইটার মুখে ফুটে উঠলো স্বর্গীয় হাসি। আমাদের জন্য সামান্য টাকা। তাদের জন্য তো শিক্ষা উপকরণ কেনার জারিয়া।

দুপুর একটায় শেষ বারের মত মারমেইড থেকে বের হয়ে গেলাম। জেটিঘাটে দেখা হল নূরের সাথে আমাদের টিকেটের ব্যবস্থা করে দিল শীপের৷ এই আর একটা ছেলে যে নিঃস্বার্থ ভাবে সাহায্য করে। বেঁচে থাক নূর, তোমার হৃদয়ে এক টুকরো সেন্ট মার্টিন ভাসিয়ে দিও। যেখানেই যাবে মানুষ তোমার মাঝে সেন্ট মার্টিন দেখতে পাবে। দুপুরের খাবারে কোরাল মাছ পেয়ে কিছুটা খুশি হলাম। এই প্রথম মনে হয় মাছ খাচ্ছি গত দুই দিনের ভিতর। বে ক্রুজের আমাদের একটা ব্যবস্থা হল। শিপ ছাড়বে তিনটায়।

নাফ নদীর পাড়ে ওই বেগুনী আকাশ। ছবি: লেখক

মোটামুটি আমরা আড়াইটার দিকে শিপে উঠে পড়লাম। কানায় কানায় পরিপূর্ণ সিট নাই। এর মধ্যে দেখতে পেলাম ক্যাপ্টেন ডেকের রেলিংয়ের সামনে সিটগুলোও দখল হয়ে গেছে। কোন রকম চিপায় চাপায় বসলাম। তবে ছাড়ার আগে এক গার্ডিয়ান এঞ্জেল এসে ঘোষণা দিল আপনারা সবাই ভিতরে গিয়ে বসুন এসির হাওয়া খান। হুড়মুড়িয়ে বাঙালি ভিতরে ঢুকে গেল আর আমাদের মুখে দেখা দিল এক চিলতে হাসির রেখা। শিপ ছাড়ার পর পা ঝুলিয়ে বসে দেখতে লাগলাম সমুদ্র আর গাংচিলের খেলা৷ পর্যটক আসলে এই পাখিগুলোও মনে হয় টের পেয়ে যায়৷ শিপের পিছে পিছে তাদের কি দূরন্ত ছুটে চলা। তাদের এই চলা দেখে পাবলো নেরুদার কবিতার পংক্তি মনে পড়ে গেল। শুধু একটু সংস্করণ করে মনে মনে গুন গুন করতে লাগলাম কবিতাটা:

আকাশের মায়াময় খেলা। ছবি: লেখক
তিনটি গাংচিল, রোদের ফলার মত, 
ধারালো সুঁচের মত, সমুদ্রের ওপর 

শীতার্ত আকাশ বেয়ে চলে যায় সেন্ট মার্টিন৷ শেষ গোধূলিবেলায় যখন নাফ নদীতে প্রবেশ করলাম আকাশে দেখতে লাগলাম হরেক রকম মেঘের খেলা। কখন মনে হচ্ছে ইঁদুরটা দৌড় দিল, কখন মনে হচ্ছে কোন মানুষ তাকিয়ে আছে আমার দিকে কখন বা দূরের পাহাড়ের গাছগুলো মেঘের চাঁদরে ঢেকে যাওয়া অপার্থিব কিছু মনে হচ্ছে। আকাশে লাল নীল গোলাপী বর্ণ ধারণ করেছে। যেন একরাশ বিষণ্নতা নিয়ে নাফ আমাদের বিদায় জানাচ্ছে। বিদায় পথিক আবার দেখা হবে। আমার ও বলতে ইচ্ছে করে বিদায় প্রিয় নাফ আবার দেখা হবে কোন স্বপ্ন রঙিন দিনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন: তৃতীয় পর্ব

সুন্দরবনে কয়েকদিন (দ্বিতীয় কিস্তি)