fbpx

হতংকুচো, মাতাইতুয়ারি, দেবতা পুকুর: দেবতার রাজ্যে একদিন

পাহাড়-ঝর্ণার নেশাটা এমন যে ঘরে মন টেকানো দায়। তাই তো পাহাড় থেকে ফিরেই আবার যখন Hit the Trail গ্রুপের থেকে ডে ট্যুরের একটা ইভেন্ট দেখলাম, খাগড়াছড়ির হতংকুচো ট্রেইল, দেবতা পুকুর আর মাতাইতুয়ারি ঝর্ণায়, খুশী হয়ে গেলাম। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এখনও তেমন পরিচিত না এই ট্রেইল। খুব বেশি মানুষের পা পড়েনি সেখানে। ট্রেইলের কিছু ছবি দেখে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। সৌভাগ্যক্রমে, তেহজীবের স্কুলে তখন পাঁচদিনের লম্বা ছুটি চলছে। যেহেতু ডে ট্যুর, ফিরে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগও আছে, তাই রাজি হয়ে গেলাম। এখানে বলে রাখি, মেয়ের অনুমতি নিয়েই আমরা কোথাও যাওয়া ঠিক করি। ও না চাইলে যাই না। সে রাজি হলো এক শর্তে, তার স্কুল যেন মিস না হয়।

রোমাঞ্চকর হতংকুচো ট্রেইল। ছবি: মাসুম ভাই

নির্দিস্ট তারিখে যথাসময়ে আমরা হাজির কাউন্টারে। রাতের বাস, আঁকাবাঁকা রাস্তার মজা নিতে নিতেই সকালে পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বর। ওখানে চট্টগ্রাম থেকে আমাদের বাকি সদস্যরা জয়েন করলো। এই ট্যুরে তাজিংডংয়ের অনেকেই ছিল। তাই এক অর্থে কিছুটা পুনর্মিলনীও হয়ে গেল। একসাথে নাস্তা করলাম সবাই। আমরা ছিলাম ৩০ জনের বিশাল একটা দল।

সবার নাম মনে নাই, আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে পরবর্তীতে আমাদের সাথে আরো ট্যুর দিয়েছেন বা ফেসবুকের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে এমন কয়েকজনের নাম উল্লেখ করতে চাই। আমাদের সাথে ছিলেন একদম নববিবাহিত চমৎকার এক জুটি, আরাফাত আর পাপড়ি, বিয়ে করে বউ নিয়ে ট্র‍্যাকিংয়ে চলে আসছে! আরেক জুটি ছিলেন, তাজিয়া আর সুজন, যাদের আমি নতুনই ভেবেছিলাম, পরে শুনি ওনাদের বিয়ে হয়েছে ১০ বছর। ভালোবাসায় ভরপুর হয়েই থাকুন। ছিলেন সানি ভাই, ফারাবি ভাই, মুন্না ভাই, আশিক ভাই, সুমাইয়া, নূপুর, রাসেল ভাই, মাসুম ভাই, রেদোয়ান ভাই, পাপন ভাই, অনুজ ভাই, সাঈদ ভাই (প্রথম দর্শনে ওনাকে হারকিউলিসের চেয়ে কম মনে হবে না)।

হাই-হ্যালো করে এরপর মাহেন্দ্রতে উঠে পড়লাম। চান্দের গাড়ির মতোই দেখতে। যেতে হবে নুনছড়ির থলিপাড়াতে। ঘণ্টাখানেকের পথ। গাড়ির ছাদে উঠে বসলাম সবাই। হেঁড়ে গলার গান আর গাড়ির গতি মিলেমিশে অন্যরকম একটা এক্সাইটমেন্ট! এই গাড়িগুলো বড় অদ্ভুত। ভেতরে, বাইরে, ছাদে কোনভাবেই বসে কোন আরাম নাই। কিন্তু উত্তেজনা কাজ করে! পথে বিজিবির একটা চেকপোস্ট পড়ে। সেখানে ব্যাগপত্র চেক করিয়ে নেয়া হলো।

থলিপাড়ায় নেমে আমাদের বাড়তি ব্যাগগুলো গাড়িতে রেখে দিলাম। তারপর গাইড দাদাকে সাথে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। ট্র‍্যাকিং শুরু হয় এখান থেকেই। প্রথমে দেবতা পুকুর বা মাতাই পুখির, যা এখানকার ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ত্রিপুরা অধ্যুষিত এই এলাকা। ত্রিপুরা ভাষায়, মাতাই মানে দেবতা আর পুখির হচ্ছে পুকুর। পুকুরের পাশে একটা শিবমন্দির আছে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষই এখানে পূজা দেন। গুগল করে জানা গেল, সমুদ্র সমতল হতে ৭০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় এই দেবতার পুকুর অবস্থিত। কথিত আছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের জল তৃঞ্চা নিবারণের জন্য স্বয়ং জল-দেবতা এ পুকুর খনন করেন। পুকুরের পানিকে স্থানীয় লোকজন দেবতার আশীর্বাদ বলে মনে করে। দেবতার অলৌকিকতায় পুকুরটি সৃষ্ট বলে এতো উঁচুতে অবস্থানের পরও পুকুর কখনও শুকিয়ে যায় না বলে তাদের বিশ্বাস।

ট্র‍্যাকিং মূলত এখান থেকেই শুরু, ছবিঃ তামান্না আজমী

এখানে যেতে হয় সিঁড়িপথে। সিঁড়িগুলো সুন্দর, বেশি উঁচু না। খুশি মনে সিঁড়ি ভাঙছি… তো ভাঙছিই! নামছি, উঠছি… শেষ আর হয় না। এই সিঁড়িতে বসেই বিশ্রামের কাজও সেরে নিচ্ছি। পরে জানলাম, এই দেবতা পুকুরে যাওয়ার জন্য পাড়ি দিতে হয় ১৭৭৬ টি সিঁড়ি! যাইহোক, অবশেষে দেখা পেলাম দেবতা পুকুরের। বিশাল বড় পুকুর। পানি নাকি বেশ গভীর। আর ঠাণ্ডা অনেক। কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়ার লোভ সংবরণ করতে হলো সবাইকে, কারণ পথের আরো অনেক বাকি। হাতমুখ ধুয়ে ওখানে বসে একটু বিশ্রাম নিলাম সবাই। শুকনো খাবার আর পানি নিয়ে নিলাম। এরপর খাবার আর পানির কোন সোর্স নেই।

দেবতা পুকুর যাওয়ার পথের সিঁড়ি, ছবিঃ তামান্না আজমী
এই সেই দেবতা পুকুর, ছবিঃ তামান্না আজমী

পরের গন্তব্য মাতাইতুয়ারি ঝর্ণা। দেবতা পুকুরের ডান পাশ দিয়ে উঁচুনিচু, পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। বেশ কয়েকটা পাহাড় পাড়ি দিতে হয়। সানি ভাই আমাকে অনেক সাহায্য করছিল। অনেক মানুষ ছিল, তাই গল্পে, আড্ডায় ভালোই লাগছিল। তেহজীবের সাথে তার প্রিয় সুমাইয়া আন্টি, নূপুর আন্টি, রাসেল চাচ্চু, মাসুম চাচ্চু ছিলেন। সেও গল্প করছিল আর হাঁটছিল। সাঈদ ভাই বারবার বলছিলেন, ওকে দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি! তবে সেদিন গরম ছিল চরমে। কতোবার বিশ্রাম নিয়েছি তার হিসাব নেই। অনেকটা পথ যাওয়ার পর একটা পাড়ায় বসলাম আমরা। হালকা খাওয়াদাওয়া হলো। পাহাড়ি ঝিরির ঠাণ্ডা পানি খেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে গেল! এই পাহাড়ি মানুষগুলো যথেষ্ট কষ্ট করেই পানি সংগ্রহ করেন। কিন্তু আমাদের পানি পান করাতে কোন কার্পণ্য করেন না। সত্যিকার মানুষ এরা!

পাহাড়ি দুষ্টু মিষ্টি বাচ্চাগুলো, ছবিঃ তামান্না আজমী
এরকম বেশ কিছু পাহাড় চড়তে হয়, ছবিঃ তামান্না আজমী

উঠে পড়লাম। ঝর্ণায় যেয়ে ভিজবো, এই লোভে দ্রুতই হাঁটছিলাম। শেষ দিকের এই পাহাড়ি রাস্তাটা বেশ রিস্কি ছিল। অনেক খাড়া আর সরু পথ। নূপুর এক আছাড় খেলো। আমি বসে প্রায় ছেঁচড়ে নামতে লাগলাম। আমরা হয়ে গেলাম গ্রুপের ‘ছ্যাঁচড়া ট্র‍্যাকার!’ হঠাৎই কানে আসলো, পানির শব্দ। কিছুক্ষণ হাঁটার পরই চোখে পড়লো কাঙ্খিত মাতাইতুয়ারি ঝর্ণা। মোটামুটি ঘণ্টা তিনেক লেগেছিল আমাদের।

মাতাইতুয়ারি ঝর্ণা অথবা দেবতার ঝর্ণা, এখানেও পূজা দেন স্থানীয় মানুষ। বাঁশের মাচায় পূজার সরঞ্জাম ছিল তখনও। পায়ের নিচে শুধু ধান আর ধান। শরীর জ্বলা গরমের পর ঝর্ণা দেখে সবাই ঝাঁপাঝাঁপি শুরু করলো। গাছের শেকড় ধরে ঝুলে ঝুলে কয়েকজন টারজান হয়ে গেল। কেউ আবার উপর থেকে ঝর্ণায় ঝাঁপও দিচ্ছিলো। আর আমার মতো যারা সাঁতার না জানা, তারা দূর থেকে দেখছিলাম। মুশতাক ভয় কাটানোর জন্য পানিতে এক চুবানি খাওয়ালো আমাকে। খুব একটা লাভ হলো না যদিও। আমাদের সাথে লাইফ জ্যাকেট ছিল। একটা জ্যাকেট পড়ে আমিও নামলাম। একটু সাহস হলো। তারপর উল্টো সাঁতার কাটা শুরু করলাম। সোজাটা পারি না আমি। সোজা হয়ে ভাসতেও পারি না। ঝর্ণার নিচে একটা খাঁজ আছে। সেখানে বসে থাকা যায়। আরাম করে ভিজলাম। তবে পানি যে কি ঠাণ্ডা! কাঁপুনি ধরে যায়। একা, দোকা, গ্রুপ নানাভাবে ছবি তোলা হলো এখানে।

মাতাইতুয়ারি বা দেবতার ঝর্ণা, ছবিঃ মোস্তাক হোসেন

এখন ফেরার পালা। পাহাড়ি পথে না যেয়ে আমরা ধরলাম ঝিরি পথ। আর ঝিরি পথের এই ট্রেইলের নামই হলো হতংকুচো। এক অদ্ভুত, মায়াবী, রহস্যময়, আর অবশ্যই কিছুটা বিপদসংকুল গিরিপথ। কোথাও কোমর, কোথাও বুক সমান পানি। পানির নিচে পিচ্ছিল পাথর যা দেখার কোন উপায় নেই। সাবধানতার মার নেই এখানে। ব্যাগপত্র যা ছিল, সব মাথার উপর তুলে নিয়ে এক সারিতে আমরা যাচ্ছিলাম। বুড়ি তার বাবার ঘাড়ের উপর। ঠিক যেন শরনার্থী! আর এর মাঝে জোঁকের অত্যাচার বাড়তি পাওনা। সাঈদ ভাই সেইরকম সাহায্য করছিলেন সবাইকে। খুবই ভালো সাঁতারু।

কোমর সমান পানিতে আমরা। ছবি: মাসুম ভাই
সমতল ঝিরি দিয়েই শেষ হবে ট্রেইল। ছবি: মাসুম ভাই

একসময় শেষ হলো গিরিপথ। সমতল ঝিরি দিয়ে কিছুদূর হেঁটে উপরে উঠেই পেয়ে গেলাম সেই পাড়া, যাওয়ার সময় যেখানে বসেছিলাম। পড়ন্ত বিকেলে সেখানে বসে থাকতে খুবই ভালো লাগছিল। আর আকাশের যে ভিউটা ছিল! এদিকে আলো প্রায় কমে আসছে। আবার হাঁটা শুরু করলাম। অবশেষে সন্ধ্যায় যেয়ে পৌঁছালাম দেবতা পুকুর। অনেকেই পুকুরে গোসল করে নিলেন। কেউ হাতমুখ ধুয়ে নিলেন।

পড়ন্ত বিকেলের মন উচাটন করা আকাশ,
ছবিঃ তামান্না আজমী

ফেরার সময় চাঁদের আলোতে সিঁড়িগুলো ভালো লাগছিল। আমি আর নূপুর খুব গল্প করছিলাম। একসময় শেষ হলো সিঁড়ি। খোলা একটা জায়গায় এসে পড়লাম। দেখি হাজার হাজার জোনাকি আলো ছড়াচ্ছে। আকাশে গোল থালার মতো একটা চাঁদ। ঠিক কেমন লাগছিল বলে বুঝাতে পারবো না। তবে এরকম দৃশ্য দেখার জন্য হলেও আমি বারবার ঘর ছাড়বো!

ফিরতি পথের উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠে বসলাম। জানালা দিয়ে চাঁদটা উঁকি দিচ্ছিলো। হয়তো বলছিল, আবার এসো যেন!

আমরা যে গ্রুপের সাথে গিয়েছিলাম, তাদের ফেসবুক লিংক আর যোগাযোগের নাম্বার নিচে দিয়ে দেয়া হলো।

https://www.facebook.com/groups/HitTheTrailBd/

মাসুম ভাই: 01672970714

রাসেল ভাই: 01873340122

রিফাত ভাই: 01931800139

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে আমরা কোন ময়লা বাইরে ফেলি না। ব্যাগে করে নিয়ে আসি। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন রাখাটাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: মাহবুব আলম পাপন

Back to top