fbpx

হাজারী খীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য: মন জুড়ানো ট্রেইল

মুশতাক যখন বললো, হাজারী খীল ক্যাম্পিংয়ে যাবা? এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। বনজঙ্গলে তাঁবুতে রাত কাটানোর ব্যাপারটা আমার বরাবরই খুব থ্রিলিং মনে হয়। বছরতিনেক আগে সিলেটের খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানে একবার ক্যাম্পিং করা হয়েছিল। তখন অবশ্য আমরা তিনজনই ছিলাম। এইবার যাচ্ছি গ্রুপে। এক্সট্রিম ট্রেকার অফ বাংলাদেশ (ইটিবি) এর একটা ক্যাম্পিং ইভেন্ট এটা। সব মিলিয়ে সদস্য সংখ্যা দশ। ইটিবির সাথে এর আগে চন্দ্রনাথে ট্যুর দেয়া হয়েছিল। তাই সেতুদা আর সাব্বির ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলই। সেই ট্যুরেই পরিচয় হওয়া সালমা আপা, ফখরুল ভাই আর তাঁদের ছেলে ফাসকাও ছিলেন এইবার। নতুন মুখ ছিলেন শরীফ সাব্বির ভাই, রোমান ভাই আর সেবা আপু। শ্যামলীর কাউন্টারে দশটার বাসের অপেক্ষা করতে করতে যখন ক্লান্ত, জানতে পারলাম, আমরা ফটিকছড়ির সরাসরি বাসটা পাইনি। আমাদের চট্টগ্রামের বাসে উঠতে হবে। অগত্যা সাড়ে এগারোটায় বাস আসলো আর আমরা ঝটপট উঠে বসলাম। বাসে উঠে যথারীতি ঘুম। 

হাজারী খীলে স্বাগতম। ছবি: লেখক

ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। আমাদের চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে নামিয়ে দেয়া হলো। সেখান থেকে মাহেন্দ্রতে করে আমরা গেলাম অক্সিজেন মোড়। এখান থেকে ফটিকছড়ির বাস পাওয়া যায়। আমরা অবশ্য বাসের অপেক্ষায় থাকলাম না। দুই সিএনজি নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম ফটিকছড়ি। অক্সিজেন থেকে ফটিকছড়ি যেতে ঘন্টাখানেক লাগলো। সিএনজি থেকে নেমে আমরা ঢুকে গেলাম হোটেলে সকালের নাস্তা করতে। পরোটা, ডালভাজি, ডিম অর্ডার দেয়া হলো। এর মাঝে দেখি সালমা আপা একটা আইসক্রিমের বাটি বের করলেন। ‘কি আছে এটাতে’ জিজ্ঞেস করায় জানা গেল, গরুর মাংস ভুনা করে নিয়ে আসছেন আপা বাসা থেকে। তারপর আর কি! মাংস-পরোটা দিয়ে জম্পেশ একটা নাস্তা হয়ে গেল। শুনলাম, আপা এমন প্রায় সব ট্যুরেই অনেক কিছু রান্না করে নিয়ে যান। আর আপার রান্নাও অসাধারণ! 

নাস্তা করে হোটেলের সামনে থেকেই সিএনজি ঠিক করে ফেললেন সেতুদা আর সাব্বির ভাই। সিএনজি একবারে হাজারী খীল অভয়ারণ্যের গেইটে নামিয়ে দিলো আমাদের। প্রায় ৩ হাজার একর জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে এই হাজারী খীল অভয়ারণ্য। ২০১০ সালে ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর থানার হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের হাজারী খীলবনাঞ্চলকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

অভয়ারণ্যের শুরু। ছবি: লেখক
চা বাগান। ছবি: লেখক

ভেতরে ঢুকতে ঢুকতেই কিন্তু ভালোলাগার শুরু। পাকা রাস্তাটা ধরে হাঁটতে থাকলে হাতের ডান দিকে ওদের অফিস ঘর। হাতের বাম পাশে লোহার বেষ্টনী দিয়ে ঘেরাও করা খুব সুন্দর চা বাগান। কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলেই একটা দোকান। দোকানটাও সুন্দর গাছপালা দিয়ে ঘেরা। 

ছিমছাম দোকান। ছবি: লেখক
নাম না জানা ফুল। ছবি: লেখক

হাজারী খীলের দায়িত্বে আছেন আশীষদা, খুবই ভালো একজন মানুষ। উনি দোকানেই আমাদের ব্যাগপত্র রাখার ব্যবস্থা করে দিলেন। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। দোকানের একটু সামনে একটা বিশাল তেঁতুল গাছ। পাকেনি যদিও। সাব্বির ভাই উঠে গেলেন গাছে তেঁতুল পাড়তে। আহা! জিভে জল আনা স্বাদ ছিল। এর আগে মারায়নতং যেয়েও প্রচুর কাঁচা তেঁতুল খাওয়া হয়েছিল।  

এর মাঝে আমাদের গাইড তৈয়ব ভাই চলে আসলেন।  আমাদের প্রথম গন্তব্য হচ্ছে কালাপানি ঝর্ণা। যাওয়া আসা মোটামুটি পাঁচ ঘণ্টার মতো লাগবে। আমরা একটা গ্রুপ ছবি তুলে হাঁটা ধরলাম। এখানে বলে রাখি, কালাপানি ঝর্ণাটা তেমন আহামরি কিছু না। ছোট্ট একটা ঝর্ণা। সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। চারপাশটা অন্ধকার থাকায় পানিটা কালো দেখায়। সম্ভবত এজন্যেই এমন নামকরণ। গঠনের দিক থেকে সীতাকুণ্ডের হরিণমারা ট্রেইলের সর্পপ্রপাত ঝর্ণার মতো লেগেছে আমার কাছে। 

সৌন্দর্য! ছবি: লেখক
ট্র‍্যাকিংয়ের শুরুতে আমরা। ছবি: মোস্তাক হোসেন

কিন্তু ঝর্ণাটা দর্শনীয় না হলেও পুরো ট্রেইলটা অবশ্যই দেখার মতো। মূলত কালাপানি ঝর্ণার এই ট্রেইল হাজারী খীলের অন্যতম আকর্ষণ। হাঁটা শুরু করে কিছুদূর যেতেই গাছগাছালিতে ঘেরা ঝিরিপথ শুরু হয়ে গেল। তেহজীব আর ফাসকা ঝিরি ধরে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। অদম্য দুই ভাইবোন। আমরা হাঁটছি, গল্প করছি। সালমা আপা জোঁক ভয় পান। মুশতাক মাঝেমাঝে আপাকে ভয় দেখাচ্ছে। সেবা আপু, শরীফ সাব্বির ভাই, আমি কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। মজা করছিলাম আমরা দুই সাব্বির ভাইকে নিয়ে। ‘কুম্ভের মেলায় হারিয়ে যাওয়া দুই ভাই!’ শরীফ ভাই একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক। খুবই সহজ, সরল মানুষ। মুশতাক বলছিল, এতো ভালোও মানুষ হয়! সেবা আপু তো তেহজীবের প্রিয় আন্টি হয়ে গেলেন। ঝিরিতে একসাথে হাঁটছিলেন তারা। সবাই কথা বলছিলাম, শুধু একজন ছাড়া। উনি ছিলেন রোমান ভাই। একজন মানুষ কিভাবে এতো কম কথা বলেন, এটা একটা রহস্য! ওনাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেও উনি শুধু হাসেন। ফাসকা তাই রোমান ভাইয়ের নাম দিয়েছিল  ‘হাসি মামা’। তবে ওনার এক ভিন্ন রূপও দেখেছি। সেই গল্প পরে হবে। 

গাছের ছায়ায় ঘেরা ট্রেইল। ছবি: লেখক
ঝিরিপথ। ছবি: লেখক
ট্রেইলের সঙ্গী। ছবি: লেখক

ট্রেইলের এক জায়গায় গাছের ডাল দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া সুন্দর একটা দোলনার সন্ধান পাওয়া গেল। সবাই দোল খাচ্ছিলো। আমি ঠিক সাহস পাচ্ছিলাম না। সেবা আপু আমাকে বললেন, ‘আপু, উঠো, ভালো লাগবে।’ উঠে বসলাম। তারপর যখন দোল দিল মুশতাক, আমার পা দুটো মাটি ছুঁয়ে শূণ্যে চলে গেল, মুহূর্তের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গেল আমার শরীর আর মন। এই অনুভূতি আসলে আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। শুধু এতোটুকুই বলতে পারি, mother nature can heal everything!

সেদিন কিন্তু প্রচণ্ড রোদ ছিল। কিন্তু ট্রেইলে তার ছিঁটেফোঁটাও টের পাওয়া যায়নি। আলো ছায়ার খেলা চলছিল পুরো ট্রেইল জুড়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এতো সময় ধরে হেঁটেও এতোটুকু ক্লান্তি আসেনি। ঝিরিপথে হাঁটার মজাই এখানে। সারাদিন হাঁটলেও খারাপ লাগবে না।

প্রকৃতির কোলে বড় হওয়া মেয়ে। ছবি: সাব্বির ভাই
আমি বনফুল গো! ছবি: সাব্বির ভাই
স্বর্গীয় আলো! ছবি: সাব্বির ভাই

একসময় ঝর্ণার কাছাকাছি চলে আসলাম। পার হতে হবে একটা ছোট খালের মতো। সেখানে আবার গলা পানি। সালমা আপা তুখোড় সাঁতারু। চলে গেলেন আগেভাগে। ফাসকা আর তেহজীব লাইফ জ্যাকেট পরে সাঁতার কেটে পার হয়ে গেল। আমিও কোনরকমে পার হলাম। শরীফ ভাই আটকে গেলেন। কিছুতেই যাবেন না। আর মুশতাক ওনাকে না নিয়ে যাবে না। সে এগিয়ে গেল ভাইয়াকে সাহায্য করতে। মাঝপথে এনে হাত ছেড়ে দিতেই বেচারা বেকায়দাভাবে হঠাৎ পড়ে গেলেন আর পানি খেয়ে কাশতে লাগলেন। ভাইয়াকে পরে ওনার অনুভূতি জিজ্ঞেস করা হলে উনি সুন্দর করে হাত নেড়ে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কোন অনুভূতি নাই!’ শরীফ ভাইকে দেখে আমি সত্যি সাহস পেয়েছিলাম। তাহলে এমন কেউও আছে যে আমার চেয়ে পানি বেশি ভয় পায়! 

এরকম আরেকটা ছোট কোমর পানি সমান ঝিরি পার হয়ে অবশেষে ঝর্ণার কাছে পৌঁছে গেলাম। লাইফ জ্যাকেট পরে নেমে গেলাম পানিতে। যেহেতু সূর্যের তাপ পৌঁছায় না, পানি ভীষণ ঠাণ্ডা! বেশিক্ষণ থাকা গেল না ঝর্ণায়। তেহজীবের কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল। আবার সেই একই পথে ফিরতে হবে। সাব্বির ভাই পানি খেয়ে এতোই ভয় পেয়েছিলেন যে এরপর খুব সাবধানে পা ফেলছিলেন। আসলে আমরা যারা সাঁতার পারি না, তারা জীবনে কিছুই জানি না।

পারাপার। ছবি: সাব্বির ভাই
নিমগ্ন তেহজীব। ছবি: সাব্বির ভাই
এই খাল পার হতে হয়। ছবি: লেখক
কালাপানি ঝর্ণা। ছবি: সাব্বির ভাই

ফিরতে ফিরতে দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেল। সেই দোকানে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম সবাই। পুকুরে গোসল করতে চেয়েছিল কয়েকজন। কিন্তু দুইটা পুকুরই এখন ব্যবহারের অনুপযুক্ত। তৈয়ব ভাই আমাদের অফিস ঘরে বসতে বললেন। সেখানেই সবাই ফ্রেশ হয়ে নিলো। এদিকে বিকাল হয়ে গিয়েছে। ট্রি এক্টিভিটির জন্য হাঁকডাক শুরু হয়ে গেল। পাঁচটার পর আর করা যাবে না। জনপ্রতি ১০০ টাকা করে লাগবে এই ট্রি এক্টিভিটিতে। প্রথম গেলেন সেতুদা, আমাদের নমুনা দেখানোর জন্য। তারপর একে একে গেলেন সালমা আপা, ফখরুল ভাই। তেহজীব আর ফাসকা আরাম করে একটা হ্যামকে দোল খাচ্ছিলো। সেবা আপু ছিলেন at their service! সালমা আপা দ্বিতীয় ধাপে যেয়ে পা আটকে আর এগোতে পারছিলেন না। ওনাকে নামানো হলো। মুশতাককে বললাম, তুমি যাও। কিন্তু সেফটি গিয়ার যেগুলো ছিল, ওর জন্য কষ্টকর হয়ে যেতো। আমাকে বললো, তুমি করবা না? আমি তেমন কিছু না ভেবেই বললাম, করবো। বলে তো দিলাম, কিন্তু ভেতরে হাতুড়ির বাড়ি পড়ছিল।

এক্টিভিটির শুরু। ছবি: লেখক
শেষ ধাপ। ছবি: লেখক

যে দড়ির মইটা বেয়ে উঠতে হয়, সেটাই মনে হচ্ছিলো আমি পড়ে যাচ্ছি। যাইহোক, কোনরকমে সিঁড়ি বেয়ে উঠে দাঁড়ালাম। প্রথম ধাপও পার করে ফেললাম কিভাবে যেন। দ্বিতীয় ধাপে যেয়ে আমার সারা শরীর কাঁপতে লাগলো। ভাবলাম, ছেড়ে দেই। মনে পড়লো, আমি সেফটি বেল্ট পরে আছি। মাথা ফাটানোর সম্ভাবনা নেই অন্তত। পা ফেলতে লাগলাম। এভাবে দ্বিতীয় ধাপটাও পার হয়ে গেলাম। একদিনের জন্যে যথেষ্ট অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গিয়েছে, ভাবছিলাম আমি! শেষ দুই ধাপে যাওয়ার আর সাহস হলো না। মই বেয়ে নেমে এলাম।

ট্রি এক্টিভিটিতে আমি। ছবি: মোস্তাক হোসেন

নিচে নামার পর বেঞ্চে বসে যখন বাকিদের অ্যাক্টিভিটি করতে দেখছিলাম, তখন হঠাৎ মনে হলো, আমি হয়তো পুরোটাই শেষ করতে পারতাম। ভয়টাকে কিছুটা জয় করেই ফেলেছিলাম। বাকিটুকুও হয়তো চেষ্টা করলে কাটাতে পারতাম। পরে এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার রীতিমতো আফসোস হয়েছে। শেষমেশ নিজেকে স্বান্তনা দিয়েছি এইভাবে, প্রথমবার বলে হয়তো পারিনি, পরেরবার নিশ্চয়ই পারবো! 

আমরা গিয়েছিলাম এক্সট্রিম ট্রেকার অফ বাংলাদেশ (ইটিবি) এর সাথে। তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নীচে দেয়া হলো। https://www.facebook.com/groups/extremeTbangladesh/?refid=12

সেতু দাস: ০১৮৮৩৬৯৭৭২৮

মিরাজুল ইসলাম সাব্বির: ০১৭১০২৮৯৯৮৪/ ০১৮৬১৯৮০০৩৮

ভিডিওচিত্রে আমাদের হাজারী খীল ট্যুর দেখতে পারেন এই লিংকে:
https://youtu.be/BKu0uvXUZQU

আমার পুরানো ভ্রমণ কাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করুন নিচের লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi

বিঃদ্রঃ ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলবেন। নিজের দেশ পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: লেখক নিজে

ভিডিও কৃতজ্ঞতা: মিরাজুল ইসলাম সাব্বির ভাই


One thought on “হাজারী খীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য: মন জুড়ানো ট্রেইল

  1. অসাধারণলেখা আপনার লেখার হাত ও বেশ পাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top