in

বিড়ালের ঝর্ণাগুলো: মুপ্পোছড়া ও ন-কাটা

তেহজীবের পরীক্ষা, কুরবানি ইদ সবকিছু মিলে একটানা বাসায় থেকে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। ঈদের ছুটিতে তাই ছুটে চলা আবশ্যক হয়ে গিয়েছিল। এর মাঝেই আশরাফ ভাইরা প্ল্যান করছিলেন বিলাইছড়ির। আমরা তিনজন ওনাদের প্ল্যানে সামিল হয়ে গেলাম। ঈদের পরের রাতেই রওনা হলাম কাপ্তাইয়ের উদ্দেশে। ঢাকা থেকে কাপ্তাই সরাসরি বাস সার্ভিস আছে। রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলাটি কাপ্তাই লেকের প্রান্তে অবস্থিত। সড়ক পথে এই উপজেলায় যাওয়ার কোন উপায় নেই। কাপ্তাই থেকে শুধুমাত্র নৌপথে বিলাইছড়ি পৌঁছানো সম্ভব।

সবুজে ছাওয়া কাপ্তাই লেক। ছবি: তামান্না আজমী

বিলাইছড়ি চাকমা শব্দ থেকে উৎপত্তি। বিলাই অর্থ বিড়াল আর ছড়ি অর্থ পাহাড় হতে প্রবাহিত ঝর্ণা বা ছড়া। কথিত আছে, অনেক বছর আগে এই এলাকা জঙ্গলে ঘেরা ছিল। একদিন কিছু পাহাড়ী লোক কাঠ কাটার উদ্দেশ্যে এলাকায় আসে এবং এক বিরাট বনবিড়ালের মুখোমুখি হয়। বিড়ালের ভাবমূর্তি হিংস্র মনে করে তারা তাকে তাড়াবার চেষ্টা করলে বিড়ালটিও তাদেরকে আক্রমণ করে এবং উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। শেষ পর্যায়ে বিড়ালটিকে মেরে ফেলা হয়। পরে এই বিড়ালটিকে পাড়ায় নিয়ে আসা হয়। পাড়ার লোকেরা এতো বড় বনবিড়াল দেখে আশ্চর্য হয় এবং বিরাট সামাজিক অনুষ্ঠান করা হয়। এরপর থেকেই এলাকাটি বিলাইছড়ি নামে আখ্যায়িত হয়। দূর্গম পার্বত্য অঞ্চল হিসাবে এই উপজেলায় রয়েছে ছোট বড় পাহাড়, আর রয়েছে প্রচুর ঝর্ণা। ঠিক ধরেছেন! আমাদের ঈদ যাত্রা ছিল এবার বিলাইছড়ির ঝর্ণাগুলোর পথে। 

বিলাইছড়ির পথে। ছবি: তামান্না আজমী
এমন অনেক পানির প্রবাহই চোখে পড়ে। ছবি: মোস্তাক হোসেন
থাক! আজ মেঘলা আকাশ দিয়েই না হয় স্বাগত জানাক।
ছবি: তামান্না আজমী

ভোরে বাস থেকে নামলাম রিজার্ভ বাজারে। সেখানে নাস্তা সেরে নেভী ক্যাম্পে চলে যাই সিএনজি নিয়ে। আমাদের কাপ্তাই থেকেই ট্রলার ভাড়া নেয়া ছিল। সেখানে আমাদের জন্যে ট্রলার নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন নিত্যরঞ্জন দাদা, আমাদের নাবিক। তিনদিনের জন্যে আমাদের সঙ্গী এই দাদাটি অসম্ভব ভালো এবং সরল মানুষ। যদিও ট্রলার, কিন্তু আমি নৌকাই বলবো। প্রকৃতির সাথে ট্রলারটা ঠিক যায় না! যাইহোক, নৌকা কাপ্তাইয়ের বুক চিরে চলা শুরু করলো। চারপাশের সবুজ, মেঘলা আকাশ, সবকিছুর ছায়া তখন লেকের জলে। নৌকার ছাদে বসে মুগ্ধ হতে হতেই পৌঁছে গেলাম বরকল উপজেলার সুবলং ঝর্ণায়।

কাপ্তাইয়ের বুকে আমাদের তরী। ছবি: মাহিম আহমেদ

গঠনের দিক থেকে বেশ প্রশস্ত এবং উঁচু পাহাড় থেকে ছোট ছোট কয়েকটি ধারায় অঝোরে ঝরে পড়ছে ঝর্ণার পানি। কোন ট্র‍্যাকিংয়ের ঝামেলা নেই। নৌকা নিয়ে সহজেই চলে যাওয়া যায় সুবলং। প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঈদের ছুটিতে। এখন সেখানে টিকেট কেটে যেতে হয়। একটা কফি হাউজ আছে। বসে কফি খাবেন আর ঝর্ণা দেখবেন। জীবন সুন্দর! আমরা সেখানে আর নামিনি। নৌকায় বসেই দেখছিলাম। 

সুবলং ঝর্ণা। ছবি: মোস্তাক হোসেন
কফি হাউজের আড্ডা। ছবি: তামান্না আজমী
সুবলং ঝর্ণারই আরেক অংশ, একে ছোট সুবলং বলে।
ছবি: মোস্তাক হোসেন

সুবলং থেকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই পড়বে গাছকাটা আর্মি ক্যাম্প। সবাইকে নামতে হলো। নাম-ধাম এন্ট্রি করলাম। ন্যাশনাল আইডি কার্ডের কপি জমা দিলাম। তারপর ওরা একটা গ্রুপ ছবি তুললো। আমরা দুইজন মেয়ে ছিলাম। আমাদের আলাদা ছবি তোলা হলো। আবার আমি বিবাহিত বিধায় আমার স্বামী-সন্তানসহ একটা পারিবারিক ছবিও তুলে রাখা হলো। আর্মিক্যাম্পে এরকম ফটোসেশনের অভিজ্ঞতা এই প্রথম! সব ফর্মালিটি শেষ করে যখন শান্ত স্যারের কটেজে এসে নৌকা ভিড়লো, ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটার আশেপাশে।

শান্ত স্যারের কটেজ। ছবি: তামান্না আজমী
বারান্দায় দাঁড়ালে লেকের ভিউ পাওয়া যায়। ছবি: তামান্না আজমী
মেঝেতে মাদুর পেতে খাওয়া। ছবি: তামান্না আজমী

শান্ত স্যার… প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক, লেকের পাড়েই বাড়ি, নামের মতোই শান্ত, ভদ্র মানুষ। সবাই হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে গেলাম। আলু ভর্তা, ডাল, ভাত আর কাপ্তাইয়ের তাজা আইর মাছ। বহুদিন পর এতো মজা করে ভুঁড়ি ভোজ করেছি আমি। রান্না এতোই সুস্বাদু ছিল যে কব্জি ডুবিয়ে শুধু খেয়েছি, ফোন মুঠোতে নিয়ে ছবি তোলার কথা মনে পড়েনি। কটেজে ব্যাগপত্র রেখে সবাই জলদি তৈরি হয়ে নিলাম। শান্ত স্যার আমার মেয়েটার জন্যে কতো যে চিন্তা করছিলেন! স্যারকে ‘সাবধানে থাকবো’ কথা দিয়ে রওনা হলাম। 

মুপ্পোছড়ায় রওনা দেয়ার আগে গ্রুপ। ছবি: আশরাফ ভাই

নিত্যদা আমাদের আধা ঘণ্টার ভেতর নামিয়ে দিলেন বাঙ্গালকাটা নামে একটা জায়গায়, যেখান থেকে বাকি পথ হেঁটে মুপ্পোছড়ায় যেতে হয়। যাওয়ার আগে একটা দোকানে আমরা লেবুর শরবত আর পাহাড়ি কলার অর্ডার দিয়ে গেলাম। সেখানে ট্র‍্যাকিং শুরুর আগে সবার ফ্রেশ চেহারা নিয়ে একটা গ্রুপ ছবি তোলা হলো। তারপর হাঁটা শুরু করলাম।

পাথুরে ঝিরিপথ। ছবি: তামান্না আজমী
মুপ্পোছড়া যেতে এমন কতো যে ক্যাসকেড আছে তার হিসাব নেই।
ছবি: মোস্তাক হোসেন
মজা করে নাম দিয়েছিলাম ‘থ্রি সিস্টার্স ফলস’! ছবি: মোস্তাক হোসেন

মুপ্পোছড়া ঝর্ণাটি বিলাইছড়ির অন্যতম বৃহত্তম ঝর্ণা। ট্রেইলটা বেশ সুন্দর। পথে ধান গাছ, জংলি ফুল, ছোট বড় ঝর্ণার ক্যাসকেড, ঝিরি পথ, কাদা মাখা রাস্তা সবই পাবেন। যাওয়ার পথে ন-কাটা ঝর্ণার ক্যাসকেড দেখলাম উঁকি দিচ্ছে।

ধানক্ষেতও আছে গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটা পথে। ছবি: তামান্না আজমী
এমন অনেক ফুল চোখে পড়বে ট্রেইলে। ছবি: তামান্না আজমী

আমরা পাশের পাহাড়ি রাস্তা ধরে আগে চলে গেলাম মুপ্পোছড়া। দেখতে বেশ কিছুটাই সুবলং ঝর্ণার মতো প্রশস্ত। এতোটাই চওড়া পাহাড়টা যে মোবাইলে পুরোটা একসাথে তোলা সম্ভব হয় নাই। আর এই বিশাল পাহাড় জুড়ে থাকার কারণেই পানি সেভাবে বোঝা যায় না। তবে যেখানটায় পানি আছড়ে পড়ছে উঁচু থেকে, সেখানে দাঁড়ানো যায় না বেশি সময়। পানির এতো তোড়জোড়! অনেকে উপরে উঠছিলেন। পিচ্ছিল পাথুরে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা বিপদজনকই বটে। গাইড এবং নিত্যদা নিষেধ করছিলেন বারবার। এরকম কোন ট্র‍্যাকিং ট্যুরে গেলে গাইডের কথা শোনা উচিত। বিপদ বলে কয়ে আসে না। আনন্দ-উত্তেজনা কখনোই জীবনের চেয়ে বেশি নয়।  

মুপ্পোছড়া। ছবি: মোস্তাক হোসেন
মুপ্পোছড়ার নীচে আমরা। ছবি: হৃদয় ভাই

মুপ্পোছড়া থেকে এবার আমরা ঝিরি পথ ধরে হাঁটা ধরলাম। এই ঝিরি পথ আমাদের পৌঁছে দিলো ন-কাটা ঝর্ণার উপরের স্ট্রীমে। সেখান থেকে পাশের খাড়া টিলা পার হয়ে নামলেই পাওয়া যাবে ন-কাটা। হেঁটে পার হওয়ার রিস্ক নিলাম না। বসে স্লাইড করে নেমে গেলাম পুরো পথটা। ঝর্ণায় যেয়ে পানিতে বসে পড়লাম। উরিব্বাস! ঝর্ণার নিচে কিছুক্ষণ বসে থেকে আমার মাথা আর পীঠ ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। ভরা বর্ষার ঝর্ণা, সেই তেজ তার! আর দেখতে লাগছিল এডিট করা কোন ভিডিওর মতো। সাপের মতো এঁকেবেঁকে নামছে পানির স্রোত! অসাধারণ সময় কাটলো। 

এখান থেকে পিছল খাড়া পথ নামলে দেখা মিলবে ন-কাটার।
ছবি: তামান্না আজমী
ন-কাটায় আমরা। ছবি: আশরাফ ভাই

এদিকে বিকাল প্রায় গড়িয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টা দেড়েকের ট্র‍্যাকিং করে আবার ফিরতে হবে। পাহাড়-জঙ্গলে অন্ধকার নামলে বড় অসহায় লাগে। তাই আমরা ফিরতি পথে হাঁটা ধরলাম। মাঝে সেই দোকানে থেমে আগে থেকে অর্ডার দেয়া শরবত আর কলা খেয়ে নিলাম। আহা! শরবতটা অমৃত ছিল। সন্ধ্যার আগেই নৌকা পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। আবার নৌকা চলতে লাগলো।

সন্ধ্যা নামছে। ছবি: হৃদয় ভাই

দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নামলো লেকের বুকে। পূর্ণিমা ছিল, কিন্তু চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। খুব আশা নিয়ে অন্ধকার হয়ে আসা নীলাভ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। প্রকৃতি কাউকে নিরাশ করে না। হঠাৎ করেই মেঘ সরে রূপালী চাঁদ উঁকি দিল। লেকের ঢেউ তোলা জলে চাঁদের ছায়া, নৌকার উপর আমরা কয়েকজন, দূরে ব্রীজটায় চাঁদের আলোতে দাঁড়ানো কিছু মানুষ, সবই কেমন যেন ঘোর লাগা!

নীল আকাশ চেরা রুপালী চাঁদ। ছবি: তামান্ন আজমী
চন্দ্রাহত কয়েকজন। ছবি: তামান্না আজমী

কটেজে ফিরলাম যখন, চারদিক অন্ধকার। কারেন্ট আসছে আর যাচ্ছে। মোবাইলে চার্জ প্রায় শেষ সবার। শাহেদ ভাই আক্ষেপ করে বললেন, ‘কারেন্টের দেশে আসলাম আর কারেন্ট পাচ্ছি না।’ উল্লেখ্য, দেশের একমাত্র পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এই কাপ্তাইয়ে অবস্থিত! আলো আসতেই সবাই তাড়াহুড়ো করে খেয়ে নিলাম। তারপর যে যার মতো ঘুম। পরদিন খুব ভোরে উঠতে হবে। সাদা পানির ঝর্ণা আমাদের অপেক্ষায় আছে… 

আমার পুরানো ভ্রমণ কাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করুন নীচের লিঙ্কেঃ

https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ ঘুরতে গেলে আমরা জায়গা নোংরা করি না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: তামান্না আজমী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতীয় ভিসা আবেদন করার নিয়ম ২০১৯

নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়িতে একদিন: ইতিহাস পর্ব