বিড়ালের ঝর্ণাগুলো: ধুপপানি

আজকে দেখবো সেই কাঙ্ক্ষিত ধুপপানি ঝর্ণা। এই ঝর্ণা রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের ওড়াছড়ি নামক স্থানে অবস্থিত। অনেক দূরের পথ। ভোর ৪ টায় উঠে তৈরি হয়ে নিলাম। নাস্তার অর্ডার দেয়াই ছিল। শান্তদা খিচুড়ি-ডিম ভাজা প্যাকেট করে দিলেন। পানির বোতলও দিয়ে দিলেন সাথে। ট্রলারে নাস্তা করবো। আমরা ৫ টার মধ্যেই রওনা হয়ে গেলাম। যেতে হবে উলুছড়ি, দুই আড়াই ঘণ্টা লেগে যাবে। পথে দুটা আর্মি ক্যাম্প পড়লো। দুই ক্যাম্পেই ন্যাশনাল আইডির কপি জমা দিতে হয়েছে। একটা ক্যাম্পে গ্রুপের ছেলে সদস্যদের ছবিও তোলা হয়েছে। এখানে দেখলাম নিরাপত্তা বাহিনীর সেই কড়াকড়ি!

ভোর হলো, দোর খোলো। ছবি: হৃদয় ভাই

উলুছড়ি পৌঁছে নৌকা থেকে নেমে এরপর কোষা নৌকায় উঠতে হলো। কারণ সরু পথে বড় নৌকা যাবে না। আমরা লাইফ জ্যাকেট পরে নিলাম। এই নৌকায় করে যে পথটা যেতে হয়, সেখানে পাহাড়ি ঢলের পানি আসে। কোষা নৌকা মিনিট বিশেক পরেই যেখানে নামিয়ে দিল আমাদের, মূলত সেখান থেকেই ট্র‍্যাকিং শুরু।  

ছোট তরীতে আমরা। ছবি: আশরাফ ভাই
সরু জলপথ। ছবি: তামান্না আজমী

ট্র‍্যাকিং শুরু না বলে বলা ভালো দূর্ভোগ শুরু হলো। ভিডিও দেখেছিলাম আগেই, এবার অভিজ্ঞতা হয়ে গেল। এতো বাজে ট্রেইলে আমি আগে হাঁটিনি। প্রথম দিকে আধা ঘণ্টা শুধু পা ডুবানো কর্দমাক্ত পথ। পা গেঁথে যায়, বের করা যে কি কষ্টসাধ্য!

পা ডুবিয়ে হাঁটা। ছবি: তামান্না আজমী

তারপর শুরু হলো পাহাড়ি চড়াই উৎরাই। কখনো আবার ঝিরিপথের দেখাও পাওয়া যায়। ঝিরির পাথরগুলো পিচ্ছিল, সতর্কতা জরুরি। পুরো ট্রেইলে মোটামুটি তিনটা পাহাড় পারি দিতে হয়। বাঁশটা এইক্ষেত্রে পরম বন্ধুর পরিচয় দিয়েছে। একবারের জন্যেও আছাড় খেতে দেয়নি।

এমন অনেকগুলো গাছের সেতু পার হতে হয়। ছবি: তামান্না আজমী
ধুপপানির ঝিরির পানিও ধবধবে সাদা। ছবি: তামান্না আজমী
পাহাড় সবসময় মুগ্ধ করে। ছবি: তামান্না আজমী
পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি। ছবি: জিয়া ভাই

ঘণ্টা দুয়েকের ট্র‍্যাকিংয়ের পর আমরা পৌঁছে গেলাম ধুপপানি পাড়া। এই পাড়া থেকে মাটির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেই ধুপপানি ঝর্ণার দেখা পাওয়া যায়। সেই সিঁড়ি দেখতে অনেকটা সুপ্তধারা ঝর্ণায় যাওয়ার সিঁড়ির মতো। খুব খাড়া আর কাদায় পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। এইসব সিঁড়ির চেয়ে পাহাড় বেয়ে নামা সহজ। যেহেতু জান নিয়ে টানাটানি, তাই সিঁড়ির নমুনা ছবি তোলার রিস্ক নিতে পারিনি। যাইহোক, সব ধকল সহ্য করে যখন ধুপপানির কাছাকাছি পৌঁছালাম, তার তর্জন-গর্জনে ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে গেল।   

ঝিরিতে বসে আরামের ফাঁকে ছবি। ছবি: আরমান ভাই
হ্যাঁ, এইদিক দিয়েই। ছবি: তামান্না আজমী
ধুপপানির ক্যাসকেড। ছবি: তামান্না আজমী

ধুপপানি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ঝর্ণাগুলোর মধ্যে একটি। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ধুপ অর্থ সাদা আর পানিকে পানিই বলে। প্রায় ১৫০ ফুট উচ্চতা থেকে যখন পানি পড়ে, শ্বেত শুভ্র জলরাশি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। তাই একে ধুপপানি বা সাদা পানির ঝর্ণা বলা হয়।

দ্য মাইটি ধুপপানি। ছবি: হৃদয় ভাই
সাদা পানির সামনে আমরা, পেছনে রংধনু। ছবি: আশরাফ ভাই

ঝর্ণাটি লোক চক্ষুর আড়ালে ছিল। ২০০০ সালের দিকে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী গভীর অরণ্যে ধুপপানি ঝর্ণার নিচে ধ্যান শুরু করেন। পরে স্থানীয় লোকজন জেনে ঐ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় বা উপলক্ষ্যে সেবা করতে গেলে ধুপপানি পরিচিতি লাভ করে। এই ঝর্ণার ওপরে সাধু তাঁর আশ্রমে ধ্যান করেন। স্থানীয় ভাষায় এই ধর্মযাজক সাধুকে বলা হয় ‘ভান্তে’। উনি কোন চিৎকার-চেঁচামেচি পছন্দ করেন না। তিনি সপ্তাহের ছয় দিন ধ্যান করে শুধু রোববারে খাবার খাওয়ার জন্য নিচে নেমে আসেন। তাই আগে শুধু রোববারেই ঝর্ণাটায় লোকজনের যাওয়ার অনুমতি দেয়া হতো। তবে এখন অন্যান্য দিনেও যেতে দেয়া হয়, তবে অতিরিক্ত শব্দ না করার শর্তে। ধুপপানি যাওয়ার শুরুতেই একটা নির্দেশনাও আছে এই ব্যাপারে। 

নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। ছবি: তামান্না আজমী

ঝর্ণার নিচের দিকে একটা গুহা আছে। সেখানে ধ্যানের মুদ্রায় বসে থাকলে মনে হয় একেবারে অন্য জগতে চলে গেলাম। এবং এই ধ্যান মুদ্রায় বসে একটা ছবি ধুপপানি ঝর্ণায় যাওয়া সব পর্যটকের জন্য ফরজ বলা যায়! ঝর্ণার পানি পড়ে চারপাশে একটা ধোঁয়ার মতো তৈরি হয়। সাদা ধোঁয়াশা দেখে ধুপপানি নামের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়। বেশ দূরে পাথরে বসে থেকেও গায়ে পানির স্পর্শ পাচ্ছিলাম। ঠাণ্ডায় কাঁপছিলাম। একসময় উঠতে হলো। ঝর্ণায় ভিড় বাড়ছিল। আমরা একটু নীরবেই সময় কাটাতে পেরেছিলাম।

আমার ধ্যানরত কন্যা। ছবি: মোস্তাক হোসেন

ফেরার সময় ঝিরিপথে এক জায়গায় গাইড দাদা আমাদের গাছ থেকে জংলী ডুমুর পেড়ে খাওয়ালেন। টক-মিষ্টি দারুণ খেতে! ঝর্ণায় যাওয়ার সময় একটা দোকানে থেমে কলা আর সেদ্ধ ডিমের অর্ডার দেয়া হয়েছিল, ফেরার পথে খাওয়ার জন্যে। সেই দোকানে বসে সবাই কলা, ডিম, বিস্কুট, আর লজেন্সের ফ্লেভারের এক কাপ চা খেয়ে চাঙা হয়ে নিলাম। তেমন সমস্যা হয়নি পুরো ট্রেইলে, শুধু সেই কাদায় মাখামাখি হওয়া ছাড়া। 

জংলি ডুমুর। ছবি: তামান্না আজমী
ডুমুর দেখতে এরকম। ছবি: তামান্না আজমী

ফেরার সময় মুশতাক কিছুদূর কোষা নৌকা চালিয়ে আনলো। গ্রামে বেড়ে ওঠা, বৈঠা দেখলেই হাত নিশপিশ করে! মাঝি ছেলেটা অবশ্য খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। বৈঠার দখল নিয়ে নিল তাড়াতাড়ি। তারপর আমাদের নৌকার কাছে পৌঁছে দিল।

মাঝি নাও ছাইড়া দে। ছবি: তামান্না আজমী

নিত্যদা বিকালের মধ্যেই আমরা কটেজে ফিরিয়ে আনলেন। পেটে ইঁদুর দৌড় চলছিল। খেতে বসে গেলাম। মেন্যুতে ছিল কালিবাউশ মাছ। ঢাকায় হলে এই মাছ খাওয়া তো দূরের কথা, বাসায়ই আনতাম না হয়তো। কিন্তু লেকের টাটকা মাছটা এতো ভালো ছিল খেতে! নানারকম মাছ খেতে হলেও আবার কাপ্তাই যেতে হবে। শান্তদা বলছিলেন, বিলাইছড়ি একটু হেঁটে দেখবেন। নইলে তো ভাববেন, বিলাইছড়ি মানে শুধুই পানি। বিকালে তাই হাঁটতে বের হলাম। যেখানে আমরা ছিলাম, সেই জায়গাটার নাম দীঘলছড়ি। সূর্যদীঘল বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল! ঝুলন্ত সেতুর আদলে একটা সেতু, বার্মিজ জিনিসপত্রের একটা দোকান, ব্রীজ, ঘরবাড়ি, সব মিলে ছিমছাম জায়গাটা। দোকানে চা খেলাম।

গাছের গুড়ি বহন করে এসব ট্রলার। ছবি: মোস্তাক হোসেন
এই জায়গাকে ওরা মিনি কক্সবাজার বলে! ছবি: তামান্না আজমী
এক কাপ চা। ছবি: তামান্না আজমী

কটেজে ফিরছি, এমন সময় দেখি আশরাফ ভাইরা বাজারে যাচ্ছেন। রাতে বারবিকিউ হবে। তার জন্যে মুরগী, মসলা কিনতে হবে। বাজার বেশ দূরে। মোটরবাইকে চলাচল করে লোকজন। আমরা হেঁটেই গেলাম। বাজার বেশ জমজমাট। আশরাফ ভাই ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আমরা বাকিরা গল্প করছিলাম। তেহজীব গান শোনালো। আমরা আইসক্রিম খেলাম। স্থানীয় মালাই আইসক্রিম আর এক টাকার তেঁতুল ফ্লেভারের পাইপ আইসক্রিম। এখনো এক টাকার কিছু আছে তাহলে! বাজার হয়ে গেলে কটেজের দিকে ফিরে চললাম। ব্রিজে আবার সবাই একটু দাঁড়িয়ে তেহজীবের গান শুনলো। অন্ধকারে, হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে খুব ভালো লাগছিল গান শুনতে। 

বিলাইছড়ি বাজার। ছবি: তামান্না আজমী
আইসক্রিম! ছবি: তামান্না আজমী

কটেজে ফিরে দেখি বারবিকিউয়ের আয়োজন সম্পন্ন। হৃদয় ভাই ছিলেন প্রধান শেফ। বাকিরা তাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। বারবিকিউটা আসলেই খুব ভালো হয়েছিল। বারবিকিউ শেষ হলো আর ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। কি টাইমিং!

বারবিকিউ আয়োজনের ব্যস্ততা। ছবি: তামান্না আজমী
মুরগীরাও প্রস্তুত। ছবি: তামান্না আজমী
হাতে বানানো বারবিকিউ চুলা। ছবি: তামান্না আজমী
তেহজীব বলছে, মজা হয়েছে। ছবি: তামান্না আজমী

ভরপেট খেয়ে ঘুমাতে গেলাম আর কারেন্ট চলে গেল। সেই কারেন্ট সারারাতেও আসেনি। ঘুমের ঘোরে গরম, মশা কিছুই টের পাইনি যদিও। চোখে তখন ঘুম, সাথে নতুন কোন ঝর্ণার স্বপ্ন… 

ভিডিওচিত্রে বিলাইছড়ি ট্যুরের স্বাদ নিতে ক্লিক করুন এই লিংকে: https://youtu.be/epme7_HItZI

আমার পুরানো ভ্রমণ কাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ ঘুরতে গেলে আমরা জায়গা নোংরা করি না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: তামান্না আজমী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top