আলীকদমে আলীর খোঁজে: মারায়ন তং জাদি

অনেকদিন থেকেই প্ল্যান ছিল মারায়ন তংয়ের চূড়ায় ক্যাম্পিং করবো। সেপ্টেম্বরের মধু পূর্ণিমায় যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তেহজীবের স্কুলের জন্যে সেই যাত্রা যাওয়া হলো না। এদিকে পরে খবর পেলাম, মধু পূর্ণিমায় যারা গিয়েছিল, তাদের রাতে ক্যাম্পিং করতে দেয়া হয়নি। এবং এখন নাকি চূড়ায় কাউকে উঠতেও দিচ্ছে না নিরাপত্তাবাহিনী, ক্যাম্পিং তো দূরের কথা! মন অনেকটাই ভেঙে গেল। তাই বলে ট্যুর বাতিল হয়ে যাবে? কক্ষনোই না! মারায়ন তং না হোক, দেখার আরো অনেক কিছু আছে। আবার মারায়ন তংয়ের আশা একেবারে ছেড়ে দিচ্ছি, তাও না। নির্দিষ্ট দিন তাই বাস কাউন্টারে হাজির আমরা সময়মতো। বাস মিনিট পনেরো দেরি করে ছাড়লো রাত পৌনে দশটায়। এবার আমাদের দল ভারি ছিল। আমরা ১৮ জন ছিলাম। পরে গাইডসহ ১৯ জন হয়ে যাই।  

চোখ জুড়ানো সবুজ পাহাড় পুরো পথেই চোখে পড়বে। ছবি: লেখক

আমরা সরাসরি আলীকদমের বাসের টিকেট করেছিলাম। ভাড়া ৮৫০ টাকা জনপ্রতি। এছাড়া ঢাকা থেকে বাসে করে চকোরিয়া যেয়ে সেখান থেকে আলীকদমের লোকাল জিপে করেও যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ৭৫০ টাকা এবং জিপে ৭০ টাকা জনপ্রতি। আলীকদম যাবার আগেই আবাসিক নামক জায়গায় নেমে যেতে হবে। আলীকদমের সরাসরি যে বাস, সেটাও চকোরিয়া হয়েই যায়। পুরো জার্নিতে কুমিল্লা এবং চকোরিয়াতে দুইবার যাত্রাবিরতি দেয়া হয়। ভোর হতেই চোখ খুলে গেল। আর তারপর আকাশের যে রূপটা দেখলাম! সদ্য ভোর হওয়া আকাশের বুক চিরে অদ্ভুত সুন্দর কমলা রঙ ছড়িয়ে সূর্যটা উঠি উঠি করছে। এমনিতে পাহাড়ের উপর থেকে সূর্যোদয় দেখেছি আগেও। কিন্তু সেদিন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ভোর হওয়া দেখেছি আমি। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করলাম মনে মনে। আর পুরো দৃশ্যটা এতো মনোমুগ্ধকর ছিল যে ছবি তোলার কথা মনেই হয়নি।

যাত্রাবিরতি। ছবি: হৃদয় ভাই
বাস টার্মিনাল। ছবি: লেখক

আলীকদম হচ্ছে বান্দরবানের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। আলীকদম বাস টার্মিনালে নেমে আমরা সকালের নাস্তা করে নিলাম। এরমাঝে আশরাফ ভাই যেয়ে ফেরার টিকেট করে ফেললেন। আলীকদম থেকে ঢাকার দুইটা মাত্রই বাস, হানিফ এবং শ্যামলী এন.আর। তাই পৌঁছেই ফিরতি টিকেট করে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সবার নাস্তা করা হলে পরে তিনটা অটোতে করে আমরা চলে যাই আবাসিকে। অটো ভাড়া আলীকদম থেকে আবাসিক পর্যন্ত আপডাউন ছিল জনপ্রতি ৭০ টাকা। যেহেতু আমাদের ক্যাম্পিং করার প্ল্যান ছিল, আমরা ঢাকা থেকে তাঁবু নিয়ে গিয়েছিলাম, যার ভাড়া পড়েছিল জনপ্রতি ২০০ টাকা করে। 

শিলবুনিয়া পাড়া। ছবি: লেখক

আবাসিকে যেয়ে পাড়ার কারবারিকে খুঁজছিলাম অনুমতি নেয়ার জন্যে যদি দয়া করে রাতে থাকতে দেন। শুনলাম কারবারি বাজারে গিয়েছেন। এবং ততোক্ষণে আমরা বুঝে গেলাম যে মারায়ন তংয়ের চূড়ায় রাতে থাকাটা আসলে সম্ভব না। এখন প্রশ্ন হলো চূড়ায় ওঠাও কি যাবে না? সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। অগত্যা গাইড ফারুক ভাইয়ের দেখানো পথে আমরা হাতের ডানের রাস্তা ধরে শিলবুনিয়া পাড়া দিয়ে রওনা হলাম শিলবুনিয়া ঝর্ণার উদ্দেশ্যে। শিলবুনিয়া হচ্ছে মারমা অধ্যুষিত পাড়া। ঝর্ণায় যাবার পুরো ট্রেইলটা ছোট বড় নানারকম পাথরে ভরপুর। সুন্দর এবং কিছুটা বিপদজনকও বটে। দেখেশুনে পা ফেলতে হচ্ছিলো। আধা ঘণ্টা মধ্যে আমরা চলে গেলাম ঝর্ণার কাছে। ঝর্ণাটা ছোট কিন্তু সুন্দর। আর গঠনটা এমন যে মনে হয় নিজেকে একটু আড়াল করে রাখার চেষ্টায় মগ্ন। জানিনা কেন আমার মনে হচ্ছিলো আর কি! 

ঝিরিপথ। ছবি: হৃদয় ভাই
ঝর্ণায় যাওয়ার পুরো পথটাই এমন। ছবি: লেখক
শিলবুনিয়া ঝর্ণা। ছবি: লেখক

ঝর্ণা থেকে ফিরে এলাম আবার পাড়ায়। দেখলাম নিরাপত্তাবাহিনীর এক দল যাচ্ছেন মারায়ন তংয়ের দিকে। ওনাদের জিজ্ঞেস করা হলো পরে বললেন, আসেন, ঘুরে যান। কিন্তু থাকতে পারবেন না। আমরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। এতো কাছে এসে যদি পাহাড়ে উঠতে না পারতাম, কি যে আফসোস হতো! আসলে ঘোরাঘুরির ব্যাপারে আমাদের ভাগ্য সবসময়ই ভালো। এখন সত্যিই পাহাড়ে ওঠাও নিষেধ। শুধুমাত্র তখন সেনারা যাচ্ছিলেন, তাই আমাদের যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। আমাদের পরে দুইটা গ্রুপ ছিল, যাদের অর্ধেক পথ থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। 

পাহাড়ে ওঠার পথ। ছবি: লেখক
পথে বিশ্রাম। ছবি: লেখক
চলছে জাম্বুরা খাওয়া। ছবি: লেখক

মারায়ন তং বান্দরবানের আলীকদমে অবস্থিত মিরিঞ্জা রেঞ্জের একটি পাহাড়, যার উচ্চতা প্রায় ১,৬৪০ ফিট এবং প্রায় ৭০ ডিগ্রি খাড়া। পাহাড়ে ওঠার জন্য ইট বিছানো রাস্তা আছে। কিন্তু আমার মনে হলো এই রাস্তার চেয়ে পাহাড়ি রাস্তাই ভালো হতো। পুরো পথটাই ইটগুলোতে শ্যাওলা পড়ে মারাত্মক পিচ্ছিল হয়ে আছে। এক পা এগোলে দুই পা পিছিয়ে যায়। আর খাড়া উঠতে উঠতে হাঁফ ধরে যাচ্ছিলো। এদিকে সেনাদল কিন্তু আমাদের সাথেই যাচ্ছেন। মাঝে গাইড ভাইকেও কিছুটা শাসালেন ওনারা, ‘আবার যদি এখানে দেখি…।’ আমরা যেখানে বসে বিশ্রাম নেই, ওনাদেরও দুই একজন সেখানে বসেন। আমরা হাঁটলে ওনারাও হাঁটেন। মানে একদম ভিআইপি প্রটোকলে যাচ্ছিলাম। এদিকে বিশ্রামের ফাঁকে পাহাড়ি জাম্বুরা, তেঁতুল, কমলা পেড়েও খাওয়া হচ্ছিলো। সবই এত্তো টক! গরমে অবশ্য টক ভালো লাগে। 

অর্ধেক পথ। ছবি: লেখক
ঐ দেখা যায় চূড়া। ছবি: লেখক
শরতের মেঘের ভেলা। ছবি: লেখক

আস্তে আস্তে যতো উপরে উঠছিলাম, মুগ্ধতা বাড়ছিল। শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, চারপাশের সবুজ পাহাড়… এগুলো বর্ণনা করার মতো ভাষা, এবং ফুটিয়ে তোলার মতো কোন লেন্স আবিষ্কার হয়নি। যেই সৌন্দর্য চোখে ধরা পড়ে, তার কিছুই ছবিতে তুলতে পারিনি। এদিকে যতো উপরে উঠছি, মাথার উপর সূর্যটাও কাছে চলে আসছিল। গরমে ঘামে যখন প্রায় দিশেহারা, সেই মুহূর্তে পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত চূড়ায়। মারায়ন তংয়ের চূড়ায় রয়েছে এক বৌদ্ধ উপাসনালয়। এতে আছে বুদ্ধের এক বিশাল মূর্তি। আগে খোলা ছিল। এখন দেয়াল তুলে দিয়েছে। সমতল এই চূড়ার চারপাশে যতো দূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়। কোন পাহাড় চূড়ায় রোদ, তো কোনটার চূড়ায় আবার ছায়া পড়ে আছে। ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে পাহাড়ি আদিবাসীদের ঘরগুলো। এই পাহাড়ে মূলত ত্রিপুরা, মারমা আর মুরংদের আবাস। জুমঘরও দেখা যায় পাহাড়ের কোলে। নিচে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে যাচ্ছে মাতামুহুরী নদী। তার দুই পাশে ফসলের ক্ষেত। রাতে থাকলে সকালের মেঘের সাগর হয়তো দেখা যেতো। সেটা হলো না। কিন্তু আমি আবার আফসোস করা শিখিনি। পাহাড়ে উঠতে তো পেরেছি। যা দেখছি, সবই তো আমার জন্যে সৌভাগ্য। তাতেই আমি খুব খুশি হচ্ছিলাম। 

পাহাড়ে বিষ্ময়। ছবি: লেখক
গাছের ডালে। ছবি: লেখক
বৌদ্ধ উপাসনালয়। ছবি: লেখক
পাহাড় চূড়ায় গ্রুপ। ছবি: হৃদয় ভাই

এদিকে তেহজীব ততোক্ষণে সেনা চাচ্চুদের গান শোনানো শুরু করেছে। মোস্তাক, বাকের ভাই, খাজা ভাই, আশরাফ ভাইসহ কয়েকজন একটা গাছে উঠে বসে রইলেন। বিশ্রাম নেয়ার জন্যে আদর্শ জায়গা! আমরা গাছের ছায়ায় বসে বাটার বান আর কলা খেয়ে নিলাম যেগুলো পাড়া থেকে নিয়ে আসছিলাম। ঘণ্টাখানেক পর ওনারা জানালেন এখন নামতে হবে। আমরা নামার প্রস্তুতি নিলাম। এবং সাথে তারাও নেমে আসছিলেন। নামতে আমার কষ্ট হয় বেশি। পা থামানোই যায় না। ব্যথা হয়ে যায়! কিন্তু এই কষ্টের সাথে পাহাড় থেকে নেমে আসছিলাম এক রাশ প্রশান্তি নিয়ে। যার জন্যে বার বার ছুটে যাওয়া পাহাড়ে।

ভিডিওচিত্রে আমাদের আলীকদম ট্যুরের প্রথম পর্ব দেখতে ক্লিক করুনঃ

https://youtu.be/Cptb_Tsu7hU

আমার পুরানো ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করুন নিচের লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে জায়গা নোংরা করা থেকে বিরত থাকুন। আমাদের দেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: লেখক

ভিডিও কৃতজ্ঞতা: নীল ভাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top