in ,

আলীকদমে আলীর খোঁজে: আলীর সুড়ঙ্গ

মারায়ন তং থেকে নেমে আমরা অটোতে উঠলাম। হঠাৎ সে কি ঝুম বৃষ্টি! ভাগ্যিস পাহাড় থেকে নামার সময় বৃষ্টি ছিল না। তাহলে একবারে স্লাইড করে নামতে হতো। অটো আবার আমাদের আলীকদম বাস টার্মিনালে নামিয়ে দিলো। ভাত, ডাল, মুরগী, আলু ভাজি আর কচুর ফুল দিয়ে খাওয়া হলো। কচুর ফুল খেতে কচুর লতির মতোই। তবে গলা চুলকায় খুব। এই ফুল যে খাওয়া যায় তাই জানতাম না। তেজুর স্কুলের সামনে কিনতে পাওয়া যায় খুব সুন্দর কমলা হলুদাভ এই কচুর ফুল। একজন প্রায়ই কিনতেন আর বলতেন, এটা খেতে খুব ভালো। খাওয়ার ইচ্ছা হতো শুনে এবং সেটাও পূরণ হয়ে গেল। এদিকে রাব্বি ভাই দেখি তখন কমলা একটা ফল নিয়ে ঢুকলেন। সবাই বলাবলি করছিল, এতো বড় মাল্টা! রঙটা এতো সুন্দর! কাটার পর দেখি জিনিসটা মাল্টা না। দেখতে হালকা ঘিয়ে রঙের মাঝে কমলা অনেকগুলো দানা। খেয়ে দেখলাম। স্বাদ অনেকটাই শসার মতো। বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এর নাম সিনারগোল। অদ্ভুত নামের আরো অনেক পাহাড়ি সবজি, ফল ছিল টার্মিনালের পাশে বাজারে। নামগুলো শুনেছি শুধু, মর্মোদ্ধার করতে পারিনি।

পাহাড়ি ফল। ছবি: লেখক
শসার মতো স্বাদ। ছবি: লেখক

বিকাল তখন চারটা। আমাদের আলীর সুড়ঙ্গে যাওয়ার প্ল্যান। যে খালটা পার হয়ে সেখানে যেতে হয়, তার নাম তৈন খাল। কেউ আবার উচ্চারণ করেন টোয়াইন খাল। খালের পাশে নাকি একটা চর জেগেছে। সেই চরেই আমাদের রাতে ক্যাম্পিং করার কথা। আলীকদম থেকে অটোতে গেলাম প্রথমে মংচপ্রু পাড়ায়। এই পাড়া পর্যন্ত আপডাউন ভাড়া ছিল জনপ্রতি ৪০ টাকা। সেখানে টোয়াইন খালের কাছে একটা চায়ের দোকানে ব্যাগ রেখে আমরা নৌকায় উঠলাম। এই খালটা হেঁটেই পার হওয়া যায়। কিন্তু বৃষ্টি হওয়াতে পানি বেড়ে গিয়েছিল। নৌকা ভাড়া ছিল আপডাউন ২০ টাকা জনপ্রতি। এই নৌকার কথা না বললেই নয়। খালের এক পার থেকে আরেক পারে একটা রশি লাগানো আছে। নৌকাটা সেই রশির সাথে একটা আংটা দিয়ে বাঁধা। এবং সেই আংটা টেনে টেনে খালটা পার করে দেয়া হয়। এমন অদ্ভুত নৌকা পারাপারের ভাগ্য হয়নি আগে। জীবনে কতো অভিজ্ঞতা যে হলো, ভাবছিলাম আমি। কিন্তু আসল রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নেয়ার তখনো বাকি ছিল।

আংটা বাঁধা নৌকা। ছবি: লেখক
খাল পারাপার। ছবি: নীল ভাই

খাল পার হয়ে কিছুটা পাহাড়ি পথ এবং কিছুটা ঝিরি পথে মিনিট বিশেক হেঁটে গেলেই আলীর সুড়ঙ্গ মুখ। ঘড়িতে তখন প্রায় ৫ টা। এমনিতেই গুহার ভেতর অন্ধকার। তার উপর ঢুকছি প্রায় সন্ধ্যা নামার সময়। পুরো গুহাটা ঘুরতে গেলে ঘন্টা দুয়েক সময় নিতে হবে। আলীর সুড়ঙ্গ নামকরণের সঠিক কোনো তথ্য কারো জানা নেই। পুরো পথটাই দুইপাশে পাহাড়। মাঝে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তীব্র পানির স্রোত। পাথুরে পাহাড় ঘেরা এই গুহার কিছু অংশে মোটা দড়ির সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। প্রথম গুহায় যাওয়ার জন্যে আলীকদম সেনা জোনের উদ্যোগে আলগা একটা সিঁড়ি লাগানো হয়েছে। পাহাড়ের মাঝখানে লম্বাকৃতির এই গুহাটি প্রায় ১০০ ফুট লম্বা। তার পাশেই আরও দুটি গুহা রয়েছে। যাদের দৈর্ঘ্যও প্রায় একই রকম। অন্ধকার গুহার ভেতর যেতে হলে টর্চ লাইট বা আগুনের মশাল নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। হামাগুড়িও দিতে হয় কিছু জায়গায়।

দুই পাহাড়ের মাঝে এই সুড়ঙ্গ পথ। ছবি: মীম আপু
দড়ির সিঁড়ি। ছবি: মীম আপু

লোহার সিঁড়ি পাহাড়ের গায়ে কোনরকমে লাগানো আছে। সিঁড়ির ধাপে এক পা ফেলি আর সিঁড়ি মনে হয় আমার সাথে চলে আসে। সন্ধ্যার ভর অন্ধকারে সেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠা ছিল অ্যাডভেঞ্চারের আরেক নাম! ভয় এবং উত্তেজনা মিলেমিশে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিলো। অবশ্যই এই অন্ধকারে বাকি গুহাগুলোতে আমরা আর যাইনি। একদিনে এতোটা অ্যাডভেঞ্চার আবার সহ্য করা যায় না। গুহা থেকে বের হয়ে মনে হলো বাঁচলাম। দুই পাহাড়ের মাঝের পথে এক পর্যায়ে আমার পা আটকে গিয়েছিল। দিনের বেলা গেলে হয়তো ভালো লাগতো। সবটা ঘুরে দেখা যেতো। কিন্তু সন্ধ্যায় যেয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে আমার সারাজীবন সঞ্চয় করে রাখার মতো স্মৃতি জমা হলো। 

অন্ধকার গুহার মুখ। ছবি: মীম আপু
লোহার সিঁড়ি। ছবি: লেখক
গুহার ভেতর ঢুকছি। ছবি: লেখক
গুহার ভেতর আমরা। ছবি: আশরাফ ভাই

খাল পার হয়ে চায়ের দোকানে বসে খবর পেলাম, পাড়ায় ক্যাম্পিং করতে দেয়া হবে না। সবার মন খারাপ। আমি যথারীতি ‘কি যায় আসে’ মুডে আছি। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। এই ভেজা আবহাওয়ায় ক্যাম্পিংটা ঠিক যুৎসই হতো বলে আমার মনে হয় নাই। আমাদের জন্যে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ঠিক করা হলো। পানবাজারে সরকারি এই বাংলোর অবস্থান। এক রুমে আমরা আর বাকি তিন রুমে ভাগাভাগি করে বাকি সবাই ছিল। বেচারা ভাইগুলো আমার অনেক কষ্ট করেছে। রুম ভাড়া সব মিলে ২৫০০ টাকা পড়েছিল।

নতুন বাংলো যেখানে আমরা ছিলাম। ছবি: লেখক
ডাকবাংলোর পুরানো বিল্ডিং। ছবি: লেখক

রাতে আমরা হোটেলে খেতে গেলাম। খাবারটা মোটামুটি ভালোই ছিল। পাহাড়ি এলাকাগুলোর মুরগী রান্না আর আমাদের রান্নার মাঝে অনেক পার্থক্য। ওরা কি মসলা দেয় আর কি দেয় না, কে জানে! খাওয়া শেষে বুড়ি আর আমি আইসক্রিম খেতে খেতে ফিরলাম ডাক বাংলোতে। একটু আড্ডা, গানের কোন উপায় ছিল না। আমাদের উপর নির্দেশ ছিল হৈচৈ করা যাবে না! সবাই তাই বাধ্য শিশুর মতো ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম। 

ভিডিওচিত্রে আলীর সুড়ঙ্গের গা ছমছমে অভিজ্ঞতা নিতে ক্লিক করতে পারেন এই লিংকেঃ

মারায়নতং ও আলীর সুড়ঙ্গ

আমার পুরানো ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করুন নিচের লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বি:দ্র: ঘুরতে গেলে আমরা জায়গা নোংরা করি না। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: সাঈদ ভাই

ভিডিও কৃতজ্ঞতাঃ নীল ভাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আলীকদমে আলীর খোঁজে: তুক-অ-দামতুয়া

ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: রাজা সীতারাম