in ,

ঐতিহ্য অন্বেষণে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি: পথের রোমাঞ্চ

পাথরঘাটা সফর শেষে পা যুগল থেমে থাকেনি। আমাদের পলাশ দাদাদের গ্রুপকে বিদায় জানিয়ে আমরা রওনা হয়েছি পিরোজপুরের পথে। উদ্দেশ্য আর কিছু নয় রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি দেখে যাওয়া। সেখান থেকে আমরা চলে যাব বাগেরহাট। পাথরঘাটা যেন এক জনবিচ্ছিন্ন উপজেলা। এখানে বাসও বের হয় মেপে। ফেরির হিসাব আছে। তাই জুম্মার দিনও দুপুর ১টা বাজে বাস ছাড়লো। পথে হয়তো কোথাও নামাজের জন্য বিরতি দিবে। বিআরটিসির বাস, যাবে খুলনা। আর আমরা নেমে যাব পিরোজপুর শহর।

ঐ দেখা যায় ফেরি। ছবি: লেখক

যথা সময়ে বাস ছাড়লেও। এবার বাসে উঠবার মাত্রই দুই পথিকই ঘুমিয়ে গেল। সারা রাত বাস জার্নির ক্লান্তি আমাদের দেয়নি ক্ষমা। তাই রাস্তায় কোথায় জুম্মার বিরতি দিলে টেরই পেলাম না। বাসে উঠার ঠিক দেড় ঘণ্টা পর প্রবল ঝাকুনিতে ঘুমের রাজ্য থেকে ফিরে এলাম। ভাঙ্গা রাস্তায় বাস দুলছে, ছুটছে তার আপন বেগে আবার কোথাও থামছে যাত্রী নেবার জন্য। বিআরটিসি বাস যাবে খুলনায় সিটিংয়ের নামে চিটিং করা শুরু করলো। যাত্রী ভর্তি বাসে গাদাগাদি অবস্থা। বাসের দুলুনির সাথে যেন পেণ্ডুলামের মত দুলছে যাত্রী মহোদয় গণ।

কচা নদীর বুকে মেঘের খেলা। ছবি: লেখক

ফেরিঘাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় তিনটা বেজে গেল। টগরা-চরখালী রুটে ফেরি খুব পর্যাপ্ত। ভাগ্য ভাল আগে এসেছিল টান দিয়ে পিছে বাসের একটা লম্বা লাইন দেখতে পেলাম। পেটে সাময়িক ছুছোর দৌড়াদৌড়িকে শান্ত করতে পুড়ি, ছোলা মেরে দিলাম। তবে এইগুলো পেটে গিয়ে যে পৈটিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ভিসুভিয়াসের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি কি জ্বালিয়ে সেই বা কি জানতো। পুরোটা দিন এরপর অস্থির বায়বীয়তার মাঝে কাটেয়েছি। যাক ফেরির অপেক্ষার মাঝে একটু নদী উপভোগ তো করা যায়।

বেপরোয়া মেঘ। ছবি: লেখক

ওয়াফি আর আমি সামনে হেঁটে গেলাম। নদীর নাম কচা। নদীর শান্ত স্রোতের সাথে বিষণ্ন আকাশে দেখা যাচ্ছে কটন কান্ডির মত মেঘের ছড়াছড়ি। আজ আকাশেসেই টক টক গন্ধ নেই তবে বিষণ্ন মিষ্টতা নদীর ভাঙ্গনের কাব্য শুনায় যদি পথিকের শোনার সময় হয়। কচা নদীর সেই ভাঙনে কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠি ইউনিয়নের ফলইবুনিয়া, সাপলেজা, জোলাগাতী গ্রাম বিলীনের পথে। এই তিন গ্রাম আর এর আশেপাশের গ্রামের প্রায় ১০,০০০ মানুষের জীবন কাটছে উদাসী পাখির মত। সে জানে না কোথায় হবে তার ঠিকানা। এ শান্ত নদী যে নীরব ঘাতক, কচা নদী বয়ে চলে তার গল্প নিয়ে একুল থেকে ওকুলে।

নীল আকাশ বেপরোয়া রৌদ্দুর ছায়া পড়ে কত দূর। ছবি: লেখক

ফেরিঘাটের পাশেই স্থানীয় ছোটখাট বাজার। রাস্তায় পাশেই মাছ নিয়ে বসেছে জেলেরা। নদীর একেবারে তাজা ইলিশ মাছ। দেখেই ইলিশ খাওয়ার জন্য মনে ছুটে গেল। তবে এই ইলিশের ভিড়েও নকল ইলিশ দেখতে পেলাম। সারডিন মাছের সাথে ইলিশ আছে মিশে। তাই তো পথে পথে অনুকাব্য এসে পড়লো মুখে।

আসলের মধ্যে নকল
পথিকের চোখে পথের ধকল
দেখে খাবেন ভাই সকল
খেলে দিতে খাবেন সারডিন
মুছে তা দিয়ে বলবেন আহ টেস্ট কঠিন
তুমি যে হুজুগে মাতো বোকাচোদা
ইলিশ না খেয়ে দুদু খাও খোকা।

জমিদার বাড়ি ধ্বংসস্তুপে ওয়াফি। ছবি: লেখক

দূরে দেখা যাচ্ছে ফেরি আসছে। সবার মধ্যে আবার প্রাণ চঞ্চলতা দেখা দিল। আমরাও দূর থেকে বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম ফেরির। ঘাটে ফেরি ভিড়ার সাথে সাথে সবার মাঝে কর্মচঞ্চলতা পরিলক্ষিত করলাম। আমাদের বাস ধীরে সুস্থে উঠছে ফেরিতে। আমরাও হেঁটে হেঁটে উঠে গেলাম। কচা নদীর ঘোলা জলে যেন খুঁজে পাই আমার জীবনের প্রতিচ্ছবি। কি নিদারুণ অস্থিরতায় কেটে গেল এই জীবন। পথেই যেন আমি খুঁজে পাই পায়ের তলায় সর্ষে।

আহা ধ্বংসস্তুপের ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

চলা শুরু করলো আমাদের ফেরি। আকাশের মেঘ ঘন হচ্ছে, মনে হয় বৃষ্টির আগমনী বার্তা নিয়ে আসবে প্রকৃতি। এর মাঝেই আলোর ভেংচি দিয়ে উঠছে আকাশটা। ফেরি যখন ঘাটে ভিড়লো তখন আকাশের মন খারাপ ভাবটা যেন পুরো উবে গেল। বাস এবার সাই সাই বেগে ছুটতে লাগলো কচা নদীর মায়াকে পিছে ফেলে। 

এবারের পথটা ছিল সবুজের মায়ায় মোড়ানো। বাস ছুটে চলছে পিরোজপুর শহরের অধিপানে। ঘড়ির কাটা বিকাল হবার ছুই ছুই বার্তা দিচ্ছে। আমাদের রায়ের কাঠি জমিদার বাড়ি দেখে আজকেই বাগেরহাট যাবার প্ল্যান। তাই রক্তে সাময়িক উত্তেজনা দেখা গেল। বাস দেখতে দেখতে পিরোজপুর শহরে গেল। আমরা নেমে আড়মোড়া ভাঙ্গলাম। এখন চারটা বাজে ঠিক। পেটে সেই ভোরে কিছু দানা পানি পড়েছিল এরপর থেকে তেমন ভারি খাবার খাওয়া পড়েনি। তাই রায়ের কাঠি জমিদার বাড়ি যাবার আগে পেটের ক্ষুধা মিটানো যেন প্রথম অগ্রাধিকার হয়ে গেল।

পুরাণকে ভালোবাসি। ছবি: লেখক

ঢুকে গেলাম বাস স্ট্যান্ডের সাথে হোটেলে। জালি আলমারির ভিতরে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন প্রকারের মাছ যেন আমাদের দিকে লোভুতুর চোখে চেখে দেখার আহবান জানাচ্ছে। সে আহবান কি ফেলে দেয়া যায়? ওয়াফি কোরাল মাছের সাথে ডিম, সবজি নিল। আর আমি ইলিশ মাছ দিয়ে সাটকিয়ে দিলাম ভাত। এইটা যে মাছ নয়, বাঙালির আবেগ। স্বাদে রসে অপূর্ণ পেটে করেছে পূর্ণ। হালকা হেলান দিয়ে সুখের ঢেকুর দিলাম। এবার বিশ্রাম পর্ব শেষ। হোটেল থেকে বের হয়ে রায়ের কাঠি জমিদার বাড়ি যাবার জন্য রিক্সা খুঁজতে লাগলাম।

জমিদার বাড়ির পুকুরঘাট। ছবি: লেখক

ভাগ্য প্রসন্ন হল। রিক্সা পেয়েও গেলাম খুব তাড়াতাড়ি। ছুটে চলছে পিচ ঢালা পথে ত্রিচক্রযান। আকাশটা এখন পরিষ্কার। শরৎতের নীল আকাশে গায়ে শুভ্র মেঘের তুলো যেন কোন উদাসী চিত্রকর আপন খেয়ালে একে দিয়েছে। সেই ভাসা ভাসা মেঘেদের দলের সাথে ছুটে যাচ্ছে আমাদের ত্রিচক্রযান। রাস্তার দুইপাশে সবুজ বৃক্ষের আচ্ছাদন। ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলাচ্ছে আজ আকাশ। পিচ ঢালা পথে সোনা রোদের মৃদু উমে ছায়া দেখা যায় দুজনের পথিকের। সুতো-নাটাইহীন ঘুড়ির মত তারা ওই আকাশে উড়তে চায়। ডুবে গেলাম রাস্তার মায়ায়। রায়ের কাঠি জমিদার বাড়ি যাবার আরও পথ বাকি।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্কুল পালানো ছেলের ডায়েরি: গোয়ালদি গ্রামে

ঐতিহ্য অন্বেষণে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি: হারিয়ে যাই ঐতিহ্যে