in ,

ঐতিহ্য অন্বেষণে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি: হারিয়ে যাই ঐতিহ্যে

শেষ বিকালের লাল সূর্যটি জানান দিচ্ছে দিন শেষের আহবান। তবে আমাদের যাত্রার যে শেষ হয়নি। দেখতে দেখতে চলে এলাম রায়ের কাঠি জমিদার বাড়ির অঙ্গনে। সূর্যটাও ছুই ছুই করে জানান দিচ্ছে দিনের শেষের আহবান। তবে এই দিনের শেষের আহবান যে এত বিষণ্ন হবে জানলে আমার পদযুগল পড়তো না এই বাটে। বয়সের ভারে ন্যূয, জীর্ণ-শীর্ণ এই ইট সুড়কির দেয়াল শুনায় সোনালী অতীতের ইতিহাসের কথা।

২০০ একর জমির উপর প্রতিষ্টিত এই রাজবাড়িটি অযত্নের স্পর্শে জানান দিচ্ছে শেষের কবিতা। ভেঙ্গে পড়েছে ঐ ইট সুড়কির দেয়াল, দেয়ালে জন্মাচ্ছে আগাছা হারিয়েছে আপন খেয়াল। শ্যাওলা জমে গিয়ে সবুজাভ রূপ জানান দিচ্ছে প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার আকুতি। বাড়ির প্রধান ফটক, জমিদারদের বসবাসে প্রাসাদ, কাচারি, অতিথিশাল, নাট্যশালা, জলসাঘর, অন্ধকূপ সব কিছুই যেন মিশে যেতে চায় কালের গর্ভে এক চাপা অভিমান নিয়ে।

টিকে আছে ধ্বংসস্তুপ হয়ে। ছবি: লেখক

এ যেন হাঁটছি আমরা কোন ঐতিহ্যের জঙ্গলের ভিতর। প্রজাবিহীন প্রাসাদ পড়ে রয়েছে জমিদার নাই। এককালে এখানে মুখরিত ছিল মানুষের পদধুলিতে। আমি আর ওয়াফি আহমেদ ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি জমিদার বাড়ি। রাতের বেলা এখানে কেউ থাকে কি না এই সন্দেহের দোটানায় পড়ে গেলাম। এই ভূতুড়ে রাজবাড়ির রাত কি গুঞ্জন শুনায় পথিকের পথে। শুনাতে চায় কি রাত্রি শেষের গান। যে গানটি কত যুগ ধরে শুনতে ভয় পায় উত্তর পুরুষ।

ঐতিহ্যের জানালা। ছবি: লেখক

তবে পুরানের মাঝে নতুন জাকিয়ে বসেছে। এ বংশের উত্তরাসুরিরা এখনও বসবাস করে। নতুন বিল্ডিং হয়েছে জমিদার বাড়ির পাশেই। তবে আমাদের আর সৌভাগ্য কোথায় তাদের সাথে দেখা করার। দিনের শেষ আলোর ছিটেফোটায় তো দেখতে হবে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ ১১টি মঠ। কালের বির্বতণে সব কিছু হারালেও হারায়নি মঠগুলো। এক সময় ৪০ থেকে ৫০টি সুরম্য ভবন ছিল এখানে। এখন ৬-৭টা ধুকে ধুকে টিকে আছে ঐতিহ্য পিপাসুদের শেষ গল্পটি বলতে। কি ছিল সেই গল্প।

ঐতিহ্যের দুয়ার। ছবি: লেখক

ভারতবর্ষে তখন চলছিল সম্রাট আকবরের শাসন আমল। সে অস্থির সময়ে পিরোজপুরের রায়েরকাঠি নামক জায়গায় জমিদার বাড়ির গোড়া পত্তন হয়। তখন সেখানে ছিল না কোন জনপথ, বন জঙ্গলে ছিল আশেপাশে। পরিষ্কার করে এখানে এই বাড়ির গোড়াপত্তন হয় বিধায় নামকরণ হয় রায়েরকাঠি। সে অস্থির সময়ে শাহজাদা সেলিম বিদ্রোহ করে বসে দিল্লির সালতানাতের বিরুদ্ধে। সেই সেলিম পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিদ্রোহী সেলিম বর্তমান পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বাগেরহাটের কিছু অংশ নিয়ে সেলিমাবাদ নামক পরগণার সৃষ্টি করেন।

টিকে আছে কালের সাক্ষী হতে। ছবি: লেখক

পরবর্তীতে উক্ত এলাকার রাজস্ব আদায়ের ভার পরে মোদন পালের উপর, মোদন পাল সে দ্বায়িত্ব তার ছেলে শ্রীনাথের উপর হস্তান্তর করেন। রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে শ্রীনাথ ছিল বেশ পটু। তিনি বর্তমান ঝালকাঠির লুৎফুবাদ নামক গ্রামে রাজস্ব আদায়ের জন্য একটি কাচারিঘর নির্মাণ করেন। সেখান থেকে তিনি অতি দক্ষতার সাথে প্রজাদের কাছ থেকে রাজ কর আদায় করতেন। যার ফল মোগল সম্রাটের সুদৃষ্টি পড়ে শ্রীনাথের উপর। তাকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

ঐতিহ্যের সন্ধানে। ছবি: লেখক

এর পরের গল্পটিতে এই জমিদারি বাড়ি শত বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে। রাজা শ্রীনাথ তার পুত্র রুদ্র নারায়ন কে দ্বায়িত্ব দেবার পর তিনি এই রায়েরকাঠি এলাকার বিশাল বন জঙ্গল পরিষ্কার করে জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সাথে নির্মাণ করেন কালী মন্দির। আর নরবলির রক্তে কালি মূর্তির উন্মোচন করেন রুদ্র নারায়ণ। ৫ জন নিম্ন বর্ণের হিন্দুর মুণ্ডু কেটে ভেট হিসাবে পেশ করে কালি মাতার চরণে।

জমিদারবাড়ির মঠ। ছবি: লেখক

এই নিষ্ঠুর রিচুয়ালের কথা শুনে তৎকালীন ঢাকার প্রাদেশিক সুবেদার শাহবাজ খান ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি বাঘের খাচায় রুদ্র নারায়নকে ঢুকিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। হাজার হাজার মানুষের সামনে রুদ্র নারায়নকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বাঘের খাচায়। যেন প্রাচীন ক্লসিয়াম ফিরত এসেছে বাংলার বুকে। আর গ্ল্যাডিয়েটর হিসাবে ঢুকেছেন রাজা রুদ্র নারায়ন। খালি হাতে বাঘের সাথে সে অসম লড়াই দেখতে যেন রক্ত ছলাত করে উঠেছিল জনতার। কে জানতো কি হবে রুদ্র নারায়নের ভাগ্যে। তার ভাগ্য যেন বিধাতা অন্য ভাবে লিখতে চেয়েছিলেন। রাজা রুদ্র নারায়নের সত্তায় যেন ভর করেছিল কোন আদিম মানুষের আত্মা। তাই তো সবাই কে অবাক করে দিয়ে খালি হাতে লড়াই করে মেরে ফেললেন বনের রাজাকে। এক বনে তো দুই রাজা থাকতে পারে না।

গোলাপিকে ভালোবাসি। ছবি: লেখক

এ খবর শোনার পর শাহবাজ খান তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে দেন। মোগলরা বীরদের সম্মান দিতে জানে। কিন্তু এরপর কি হল। অমূলে পরিবর্তন হয়ে গেল রুদ্র নারায়নের জীবন। তার নিষ্ঠুর কৃতকর্মের জন্য প্রায়শ্চিত্তের আগুনে জ্বলতে থাকে তার হৃদয়। সংসার ধর্ম, রাজ দরবার কোন কিছুই তাকে পিছুটান দেয় না। ছেলে নরোত্তম নারায়নকে তার জমিদারিত্ব দিয়ে চলে যান কাশি। সেখানেই তিনি আমৃত্যু সন্ন্যাস জীবন পালন করেন।

ডুবে ছিলাম ভগ্ন ভবনে রায়েরকাঠির গল্পটি শুনতে। কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। পুরান পুরাকীর্তি কত গল্প শোনায়, প্রতি দেয়ালে দেয়ালে লুকিয়ে আছে কত গল্প। সে গল্পটা কি অনুভব করে পথিক? সে প্রশ্ন তো রয়েই গেল। তবে দিনের আলো যে বেশি বাকি নেই। আমরা রওনা হলা, মঠ গুলো দেখতে। সাই সাই বেগে চলছে আমাদের ক্রিচক্রযানের আধুনিল ভার্সন ব্যাটারি রিক্সা। এবার একেবারে রায়ের কাঠি জমিদারদের মঠের সামনে গিয়েই থামলো আমাদের রিক্সা।

সাক্ষী ছিল মঠ। ছবি: লেখক

রায়েরকাঠির পুলিশ লাইন পেরিয়ে কিছুটা সামনে কালী মন্দির ও ১১টি মঠ। ধারণা করা হয় এই মঠ ও কালী মন্দিরের নির্মাণ সাল ১৬৬৮। এরই একটি মঠে স্থাপন করা হয়েছে ২৫ মণ ওজনের বিশালাকার একটি শিবলিঙ্গ। কষ্টি পাথরের তৈরি এ মহামূল্যবান শিবলিঙ্গটি উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ বলে জনশ্রুতি আছে।

আমরা মঠগুলোর সুউচ্চসম উচ্চতা দেখে কিছুক্ষণের জন্য মুগ্ধতার জগতে চলে গেলাম। মঠগুলোতে আগাছার বাস লক্ষ্য করা যায়। তবে এর বিশালতা পথিককে বার বার হাতছানি দিয়ে ডাকে। বাগেরহাটের কাছে হয়েও এই ঐতিহ্য যেন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে সযত্মে। এখানে এসে জানতে পারলাম এই রাজবংশের ২৯তম পুরুষ সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গৌতম নারাণ রায় চৌধুরীর অবদানের কারণে মঠগুলো এখনও টিকে আছে।

চলে যায় পথিক, বিদায় রায়েরকাঠি। ছবি: লেখক

আস্তে আস্তে ফুরিয়ে যাচ্ছে দিনের শেষ আলো। এবার যে রায়েরকাঠির সাথে আমাদের বিদায় নেবার পালা। বিদায় বেলায় এক রাশ ক্লান্তি নিয়ে শেষ এক ঝলক দেখতে পিছে তাকালাম। রায়েরকাঠি তার রাজকীয় দাম্ভিকতায় যেন আমাদের বিদায় জানালো। বিদায় রায়েরকাঠি। এবার বাগেরহাটের দিকে ছুটে যাওয়ার পালা। তোমাদের নগর খলিফাতাবাদের গল্প শুনানোর পালা।  

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঐতিহ্য অন্বেষণে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি: পথের রোমাঞ্চ

মারায়নতং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: চূড়ায় পদার্পণ