fbpx

আমার প্রথম সমুদ্র দর্শন

সমুদ্রের প্রতি ভালোবাসা সব মানুষের হৃদয়ে লালিত থাকে। বিশেষ করে আমরা যারা নব্বই দশকে বড় হয়েছি তারা তো শব্দের জাদুকর রকিব হাসানের কলমের ছোয়ায় ঘুরে এসেছি লস এঞ্জেলসের সেই রকি বিচ। নব্বই দশকের মানুষ অথচ তিন গোয়েন্দা পড়েনি এমন মানুষ খুবই কম পাওয়া যাবে। সমুদ্রের প্রতি একটা সুপ্ত ভালোবাসা সেই তখন থেকেই। সমুদ্রের সেই ডাক শুনার জন্য অবশ্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। সবার সমুদ্র দেখার শুরু হয় কক্সবাজার থেকে আমার বেলায় হয়েছে উলটা। আমার প্রথম সমুদ্র দেখা শুরু হয় সাগর কন্যাকে দিয়ে।

তখন আমার চির তরুণি নিতু আপুরা থাকতো বরিশালে। আমাদের কুয়াকাটা যাবার তেমন কোন প্ল্যান ছিল না। সেবার স্কুলের বন্ধে গিয়েছিলাম নানা বাড়ি বেড়াতে। রেশাদ ভাইয়া হঠাৎ করে প্ল্যান করলেন আমরা সবাই কুয়াকাটা যাব। যে সময়ের কথা বলছি সে সময় কুয়াকাটার যাবার জন্য অনেক কাঠখড়ি পুড়াতে হত। ফেরি ছিল অনেক। সব বাধা পেরিয়ে কোন শীতের সকালে রওনা হলাম আমরা কাজিন প্ল্যাটুন। রেশাদ ভাইয়া, নিতু আপু, রানা ভাইয়া, রকি, আমি, খালামনিরা আর সাথে রেশাদ ভাইয়ার বন্ধু সুমন ভাই।

বিশ বছর আগের স্মৃতি খুড়ে বের করা তো খুব সহজ ব্যাপার নয়।

সন্ধ্যার আগমনি বার্তায় কুয়াকাটা। ছবি: লেখক

বরিশাল থেকে ধুকেপুকে আমরা কুয়াকাটা এসে পৌঁছালাম বিকালে। রাস্তা প্রচুর খারাপ আর সেবার আমাদের সাথে হাওয়া আর বিলকিস খালা গিয়েছিলেন। তাদের আবার গাড়িতে উঠলে পেটে বেমো হয়, ঘন ঘন বমি হয়। বমির সেই সব দৃশ্য কচি মনে এমন ভাবে গেথে গিয়েছিল আজ বিশ বছর পর স্মরণ করতে গিয়ে গায়ে রি রি ভাব এসে পড়ছে। সে যাই হক বমির কাব্য শুনিয়ে গল্পের রুচি না হয় নষ্ট না করি। কুয়াকাটায় তখন এখনকার মত গড়ে উঠেনি এত হোটেল রিসোর্ট। আমাদের হোটেল ছিল টিনের চালের।

শরতের পরিষ্কার আকাশে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। ছবি: লেখক

হোটেল ব্যাগ রেখে আমরা খানিকটা জিরিয়ে নিলাম৷ তবে সমুদ্রের কাছে যাওয়ার সেই কিশোর মনের টান টান উত্তেজনা যেন সে সব দিনের কথা আবার স্মরণ করিয়ে দেয়৷ যতই এখন সহস্রবার সমুদ্র দেখি, প্রথম সমুদ্র দর্শনের অনুভূতি সে তো অন্য রকম। সে সময় আমার কাজিন রেশাদ ভাইয়ার সে এক অদ্ভূত বাতিক ছিল। সব জায়গায় সেনাবাহিনীর কায়দায় রুলার ঘুরাতো৷ লেটস গো, কুইক কুইক, এটেনসন৷ তার সে ছোটবেলায় সেনাবাহিনীতে চান্স না পাবার ব্যথা যেন বড় বেলায় এসে কাজিন প্ল্যাটুন আর নিতু আপুর উপর দিয়ে উঠিয়ে নিচ্ছে৷ কুয়াকাটার বুকে অভিশপ্ত সেনা অফিসারের আত্মা যেন ভর করেছে রেশাদ ভাইয়ার সত্তায়৷ তাই আমরা তাকে কর্ণেল রাশুয়ার নামে ডাকতাম। এ নিয়ে নিতু আপুর সাথে প্রায় খুঁনসুটি লেগে থাকতো৷ তবে তাদের ঝগড়াগুলোও বেশ উপভোগ্য ছিল। ভাই বোনের সম্পর্ক বুঝি এমনই হয়৷

২০১৭ সালের কুয়াকাটা। ছবি: লেখক

সে যাই হক স্মৃতি খুঁড়তে গেলে যেন কেঁচো খুঁড়তে ডাইনোসর বের হয়ে আসে। ভূমিকা টানার জন্য এতদূর আসা। এবার আমার প্রথম সমুদ্র দর্শন করার কথাটা তো বাকিই রয়ে গেল৷ ব্যাগ রেখে কিশোর মন ছুটছে সমুদ্রের পানে৷ মন কত আনন্দ, নেই কোন দুঃখ কষ্ট। ছুটে চলছি আমি আর আমার মেঝ ভাই৷ দুজনের পিঠাপিঠি ছিলাম বলে আমার ছোটবেলাটা দুর্বিষহ করে তুলেছিল মেঝ ভাই নামক ছেলেটা। সে কথা না হয় আরেক দিন হবে৷ এবার শুধু হবে সমুদ্রের কথা।

চল সমুদ্র দেখি। ছবি: লেখক

ওই তো দূরে দেখা যাচ্ছে সেই স্বপ্নের সমুদ্র কে৷ আমাদের সাগর কন্যা কুয়াকাটা৷ এই সাগর কন্যা বড্ড শান্ত যেন উত্তাল ঢেউ শুনাতে বড় তার অনীহা৷ দুই ভাই দুই হাত ছড়িয়ে এরোপ্লেনের মত ডানা মেলে উড়ছি। সাগর কন্যার সাথে প্রথম প্রণয়, একেবারে ল্যান্ড করলাম গিয়ে সাগরের জলে৷ কিশোর মনের ভালোবাসায় তো কোন ক্লেদ নেই৷ এই অনুভূতি আবার কখনও কি ফিরে পাবো? বড় বয়সে আরও বেশ কয়েক বার গিয়েছি কুয়াকাটায়। পাখা মেলে ভাবুলুতায় ডুবতে চেয়েছিলাম কিন্তু মন থেকে যেন সেই কিশোর সত্তাটা বলে উঠে বুইড়া ব্যাডা৷ তাই সেই প্রথম অনুভূতি কে লালিত করে রেখেছি সযত্নে৷ সে এখনও যে কিশোর, সে বড় হতে চায় না।

গাছের আড়ালে লেখকের বড় বেলার ছবি। ছবি: জুয়েল রানা

আমি তখনও ঘোরের মধ্যে আছি৷ সমুদ্র বুঝি এমনই হয়৷ তখনও আমার সেই নীল পরীদের দেশে যাওয়া হয়নি৷ এ জায়াগার সমুদ্র শান্ত, শুনায় না উত্তাল গর্জন। সমুদ্র স্নানের পর সৈকতে দাঁড়িয়ে রইলাম। শান্ত সাগরের জল আমার পা ভিজিয়ে দিয়ে যেন জানাচ্ছে নতুন রোমান্টিসিজমের আহ্বান। পশ্চিমাকাশে রক্তিম সূর্যটা জানান দিচ্ছে দিন শেষের গল্প৷ তার সোনালী আভায় চিক চিক করে বালুচর। আকাশের দিগন্তের ছুটে যায় নবীন কিশোরের দল সাথে সাগরের জলে বিলীন হয়ে যেন খুঁজে নতুনের উত্তেজনা৷ এই তো প্রথম সমুদ্র দর্শন। প্রথম বার সব কিছুই তো অনেক রঙ্গিন হয়৷ সূর্যটারও যেন ঘুমু ঘুমু ভাব। সে ডুবে গেলেই তো চাঁদের বুড়ি চরকা কাটতে আসবে।

চল যাই টেংরাগিরির বনে। ছবি: লেখক

আমি যে মায়ার টানে হেঁটে যাচ্ছি। সমুদ্র আমায় গ্রাস করে তার আত্মার ভিতর টেনে নিয়ে যাচ্ছে৷ দূর দিগন্তে তাকিয়ে দেখি টুপ করে সূর্যটা যেন সমুদ্রের জলে ডুবে গেল। যেন সমুদ্র এক মায়াবী রাক্ষস৷ তার বুকে এই আধার ঘন রাত্রিতে সূর্যকে ঠাই না দিলে সে যাবে কোথায়৷ আমরা হেঁটে হেঁটে সবাই হোটেলে ফিরছি৷ সমুদ্রর তরে আহবানটা যেন শেষ হয়নি৷ তবে আমরা মেতে আছি সবাই সরল খুঁনসুটিতে৷ শান্ত ঢেউয়ের গর্জন আজও সে দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে দিন আকাশে এক ফালি চাঁদ উঠেছিল তবে সুকান্ত আসেনি, সুকান্ত আসবেই বা কেন৷ এই ক্ষুধা যে হৃদয়ের, এই ক্ষুধা যে সাগর কন্যার সাথে প্রণয়ের৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top