fbpx

মন চলরে লালদিয়ার বনে: নতুন করে ফেরা

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়। সে কথার মর্ম এখানে এসে টের পেলাম ভাল ভাবে। আমরা আস্তে আস্তে হেঁটে চলে এলাম একেবারের ব্রিজের শুরুর দিকে। স্থানীয় এক ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম এই ব্রিজ পর্যন্তই কি ঘুরা শেষ নাকি দেখার আরও কিছু বাকি আছে। সে বললো ব্রিজের শেষ মাথায় লালদিয়ার বনের শেষ মাথা। সেখান থেকে বিষখালি ও বলেশ্বর নদীর মোহনা ও সমুদ্র দেখা যায়। বললো আপনারা আবার সামনে যান উচু সিড়ি জায়গায় ডানে দিকে আর একটা সিড়ি নেমে গেছে সেখান দিয়ে বনের ভিতর যাওয়া যায়। কিছুদূর আগালেই পাবেন ওয়াচ টাওয়ার আর একটা বড় পুকুর।

ভাইয়ের কথা যেন পায়ে আবার নতুন করে জোর ফিরে পেলাম। পদ যুগল বাড়ালাম আবার নতুনের খোযে। সেই ব্রিজের ধারে এসে ডানে নেমে গিয়ে ঢুকে গেলাম বনের রাস্তায়। বনের ভিতর দিয়ে শান্ত পথে একে বেকে গেছে বহুদূরে। দূর-দূরান্তে আদি দিগন্তে পর্যন্ত যেন দেখা যায় না কোন মানুষের পদচিহ্ন। আমরা দুজনে শুধু হেঁটে চলছি।

ক্লান্ত লেখক। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

চারদিকের এক অপূর্ব নিস্তব্ধতার মাঝে কোন অচিন পাখি ডেকে যায় করূন সুরে। বড় বড় গাছ যেন ঢেকে দিয়েছে সূর্যের প্রতাপ। ওরা যেন বলতে চাইলে আমার বনে আমি রাজা। হে চির সবুজ তোমাকে ঘিরে কত ঐশ্বর্য সাজিয়ে রেখেছে বনের দেবী থরে থরে।

বনের ভিতর খাল। ছবি: লেখক

তাকে ঘিরেই কত আয়োজন, পাখিদের কুহুকুহু ডাক, কত রঙিন প্রজাপতি উড়ে যায়, কত কীট পতঙ্গ হেটে যায়। আর বৃক্ষগুলো যেন দাঁড়িয়ে আছে বন দেবীর সৈন্যের মত। কিছু বৃক্ষ আকাশকে ঢেকে দেয়, কিছু বৃক্ষের কাণ্ড লতাপাতার মত আকানো বাকানো আর তার মাঝে হেঁটে যাচ্ছে বনের আদি দুই সন্তান। যেন প্রকৃতি মা ফিরে পেয়েছে দুই হারানো ধন। তার মৃদু আদরের স্পর্শে চোখ যে জুড়িয়ে আসে, ঝিরিঝিরি দক্ষিণা হাওয়ায় নতুন দিনের শুরুর আহবান।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখি আকাশ। ছবি: লেখক

এই বনে তো নেই কোন হিংস্র প্রাণী। গরু ছাগল সব ঘাস খেতে ঢুকেছে। তাদের সাথে খানিকটা খুনসুটিতে মেতে উঠলাম। বনের গরুগুলো বেশ লাজুক স্বভাবের। ধারে কাছে গেলেই দূরে সরে যায়। পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়া শুকনো পাতার মচ মচ শব্দ ক্ষণিকের জন্য শিহরণ ধরায়। এ বনে যে এখন পর্যন্ত মানুষের চিহ্ন দেখছি না।

বনের নকশা। ছবি: লেখক

মানুষের চিহ্ন দেখা না গেলেও দূরে সেই ওয়াচ টাওয়ারটা দেখতে পেলাম। ওয়াচ টাওয়ারটা পাঁচতলা হবে। আমরা দুজনেই একেবারে উপরে উঠে গেলাম। আহা কোথাও কেউ নেই। তাই এই ওয়াচ টাওয়ারের মালিক ও যেন আমরা দুজন। ওয়াফি আহমেদ আবার অস্থির প্রকৃতির। এক জায়গায় ধীর স্থির ভাবে বেশিক্ষণ বসতে চায় না।

ওয়াচ টাওয়ার। ছবি: লেখক

তাই যখন ওয়াচ টাওয়ারের সিমেন্টের বেঞ্চে যখন তার পেটা দেহ এলিয়ে দিল বনের দেবী ও তার অস্থিরতা দূর করে দিল। তার মায়াবী স্পর্শে ওয়াফি আহমেদ তলিয়ে গেল ঘুমের রাজ্যে। আর আমি ডূবে গেলাম প্রকৃতির মাঝে। ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখছি পাখির চোখে লালদিয়ার বন।

ওয়াচ টাওয়ারে বসে কোমল সিগ্ধতায় দেহ মন জুড়িয়ে গেল। জুতা আর গেঞ্জি খুলে উদলা গায়ে মেখে নিছে ফুসফুসের ছুই ছুই বাতাস। সে বাতাস শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে ঢুকে তৈরি করছে অদ্ভূত এক মাদকতা। এই মাদক বুনোতার এই মাদক আদিমতার। আমাদের আদিম পূর্ব পুরুষের বাস তো এই বনেই ছিল।

এই সেই পুকুরঘাট। ছবি: লেখক

আশেপাশে চোখ বুলাতে রঙবেরঙের পাখির উড়ে যাওয়া দেখতে পেলাম। আমি পাখি চিনি কম তবে হলদে পাখি, আর মাছরাঙা, কাঠঠোকরা পাখি চিনতে তেমন বেগ পেতে হল না। আহা বন তুমি কত সুন্দর, তোমার বুকে লুকিয়ে রেখেছো সৃষ্টির কি রহস্য। ওয়াফি আহমেদের এক ঘণ্টা ঘুম আমার জন্য সাপে বর। তাই কুম্ভকর্ণ ঘুম থেকে উঠার পর আমার রাগ না দেখে বেশ অবাক হল। অবাক হবারই তো কথা।

এই সেই পুকুর। ছবি: লেখক

আমরা নেমে পড়লাম এবার ওয়াচ টাওয়ার থেকে। লালদিয়ার বন তার মায়ার আচলে এখন বেঁধে রেখেছে আমাদের। তাই সেই বড় পুকুরের খোঁজে নামলাম দুজন। বেশ বেগ পেতে হল না খুঁজে পেতে। সকাল নয়টার উপরে বেজে যাওয়ায় হয়তো বনে এবার মানুষের পদচারণা বেড়ে গেছে। পুকুর পাড়ে বাধানো ঘাট। সেখানে বসার সুব্যবস্থা।

আহা মন ডুব দাও বনে। ছবি: লেখক

আমি দুদণ্ড বসার সুযোগ পেলাম কই ছবিয়াল কবি ওয়াফির অত্যাচার শুরু হল। দিলাম তাহার ছবি তুলে। বনের ভিতরে পুকুরে পশুপাখির বেশ আনাগোনা দেখা যায়। শুনেছি এই বনে চিত্রাল হরিণ আছে। আমাদের ভাগ্য হল দেখার। তবে এদের কারণেই লালদিয়ার বনের আরেক নাম হয়ে গেছে হরিণবাড়িয়া। হরিন ছাড়াও বানর, শুকর, কাঠবিড়ালি, মেছো বাঘ, ডোরা বাঘ, সজারু, উদ, শৃগালসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের কলরব তো আছেই।

এই সেই ঝুলন্ত সেতু। ছবি: লেখক

আফসোস হচ্ছিলো এতদূর এসে লালদিয়া সমুদ্র সৈকতে যাওয়া হবে না। তবে পরিব্রাজকের মনে অপূর্ণতা থাকতে হয়তো সৃষ্টিকর্তাও পছন্দ করেন না। লালদিয়া ছাড়াও পদ্মা লাঠমারা নামক দুটি সমুদ্র সৈকত আছে। একপাশে সবুজের স্বর্গরাজ্য অন্য পাশে সমুদ্রের গর্জন। এ দেখে না গেলে তো পথিকের আফসোস হবে। সেই আফসোসের গীত গাইতে গাইতেই বের হচ্ছিলাম। পথে দেখতে পেলাম সেলিম, পলাশ, মৃধা ভাইদের দলকে। খোস গল্প করে বনের ভিতর ঢুকছে তিন আত্মহারা পথিক। সে পথিকদের নিয়েও তো এবারের আমাদের গল্প নতুন করে আগে বাড়বে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

2 thoughts on “মন চলরে লালদিয়ার বনে: নতুন করে ফেরা

  1. আমি যেতে চাই… কিন্তু কিভাবে যাওয়া যায় তার বিস্তারিত বললে একটু সুবিধা হতো।

    1. গাবতলি থেকে পাথরঘাটার বাসে উঠুন। সাকুরা পরিবহন ভাল। রাত আটটায় শেষ বাস। সেই বাস আপনাকে খুব ভোরে পাথরঘাটা নামিয়ে দিবে। এবার পাথরঘাটা থেকে বাইক/অটো রিক্সা করে হরিণবাড়িয়ার নামবেন। সেখান থেকে যে কেউ কে জিজ্ঞেস করলে লালদিয়া/হরিণবাড়িয়া বন কোথায় দেখিয়ে দিবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top