fbpx

সাগরকন্যা কুয়াকাটায়

হুটহাট করে বেরিয়ে পড়লাম। অনেক আগে থেকেই কুয়াকাটা যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও ব্যাটে বলে মিলছিল না। তাই বর্তমানে কিছুটা ফ্রি টাইম থাকায় আর কালক্ষেপণ না করে ঘুরে এলাম দক্ষিণ বাংলার রূপের আধার কুয়াকাটা থেকে।

ময়মনসিংহ রেলস্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে যে হাওড় এক্সপ্রেস ছাড়ার কথা সকাল এগারো টায়। বিলম্বের উপর বিলম্ব করিয়া উহা ছাড়িল দুপুর দেড় টায়। বিকাল চার টায় কমলাপুর নেমে পড়িমরি করে ছুটলাম সদরঘাটের দিকে। পটুয়াখালীর লঞ্চগুলো সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে ছয়টার মধ্যে সদরঘাট থেকে ছেড়ে যায়। তাই একটু দেরি হয়ে গেলে আমাদের ছাড়াই লঞ্চগুলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাত্রা শুরু করে দিবে।

অবশেষে সাড়ে পাঁচটার দিকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঢুকলাম। কমলাপুর রেলস্টেশনের প্লাটফরমগুলোর মত এখানেও যে একাধিক প্লাটফরম তথা পল্টুন আছে তা আমাদের কারোরই জানা ছিল না। আমরা ঢুকে পড়েছিলাম ভুল পল্টুনে। সেখান থেকে বেড়িয়ে আবার ছুটলাম পটুয়াখালীগামী লঞ্চগুলোর পল্টুনে। সময় তখন ছয়টা। ইতমধ্যে কয়েকটা লঞ্চ ঘাট ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি পাকা করে ফেলেছে। দ্রুত উঠে গেলাম সুন্দরবন – ৯ নামের লঞ্চটিতে। ইন্টারনেট সূত্রে জেনেছিলাম এটাই না কি এই রুটের সবচেয়ে বড় আর নিরাপদ লঞ্চ।

লঞ্চে তো উঠলাম এবার থাকার ব্যবস্থা! আগেই জানতাম লঞ্চের ডেকে মানে ফ্লোরে শুয়ে-বসে গল্প করতে করতে চলে যাব। কিন্তু নিচতলা আর দোতালার ডেকে ছোটাছুটি করেও আমাদের ৪ জনের শুয়ে বসে যাওয়ার মত কোনো জায়গা খুঁজে পেলাম না। অবশেষে এক ব্যক্তি দয়াপরবশ হয়ে! ৫০ টাকার বিনিময়ে তার দখলকৃত জায়গাটি আমাদের ছেড়ে দিতে রাজি হলেন। সেখানে কিছুক্ষণ বসতেই লঞ্চ ছেড়ে দিল। এর কিছুক্ষণ পরেই লঞ্চের লাউডস্পিকারে এশার নামাজের আজান ভেসে আসল। নামাজ পড়তে তিনতলায় গিয়ে আমাদের ভ্রমণসঙ্গী বড় ভাই থাকার জন্য দারুণ এক জায়গা আবিষ্কার করে ফেললেন। তিনতলার একেবারে সামনের অংশে। লঞ্চের মাস্টার যেখান থেকে লঞ্চ চালায় তার সামনে তখনো বেশ খানিকটা জায়গা ফাঁকা ছিল। নিচতলা থেকে আমরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে সেখানে স্থায়ী আস্তানা গাড়লাম। উপরে খোলা আকাশ, সামনের তিনপাশ পুরোপুরি ফাঁকা, পেছনে লঞ্চের ককপিট, মৃদু বাতাস, পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। আর কি চাই! লঞ্চ যাত্রা উপভোগের জন্য একেবারে পারফেক্ট স্থান। ইচ্ছে হলে শুয়ে শুয়ে আকাশভরা তারা দেখা যায়; মাথা একটু উঁচু করে ডানে-বামে তাকালেই বিভিন্ন আকৃতির লঞ্চ, ট্রলার, কার্গো, মাছ ধরার ছোটো নৌকা চোখে পড়ে। রাতের বেলা নদীর মধ্যে এক লঞ্চ থেকে আরেক লঞ্চের দিকে তাকালে মনে হয় ঠিক যেন একটুকরো আলো ঝলমলে স্বর্গ ভেসে যাচ্ছে। রাত একটু গভীর হতেই আকাশে চাঁদের দেখা মিলল। সদ্য উদিত চাঁদের সোনালি জ্যোৎস্না সেরাতে মেঘনার বুকটাকেও রাঙিয়ে দিয়েছিল। শুধু আমরা ৪ জনই না, আমাদের আশেপাশের সকলেই নিশ্চুপ হয়ে এ অপার্থিব দৃশ্য উপভোগ করছিল।

একদম কাকডাকা ভোরে পৌঁছলাম পটুয়াখালী লঞ্চঘাট। সেখান থেকে ডাইরেক্ট বাসে কুয়াকাটা। কুয়াকাটা নেমেই হোটেলে ফ্রেস হয়ে নাস্তা করে সোজা সৈকতে। আমাদের এক সঙ্গী চলে গেলেন বোট যোগে সুন্দরবনের পূর্বাংশের টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্গত ফাতরার বনের বোট ঠিক করতে আর আমারা চলে গেলাম সৈকতে ফটোগ্রাফি করতে। কিছুক্ষণ পরেই আমরা ৪ জনসহ মোট ৯ জন বোট যোগে শিববাড়িয়া নদী দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম ফাতরার বনের উদ্দেশে। দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রঙবেরঙের পতাকাবাহী শয়ে শয়ে সুউচ্চ মাছধরা সামুদ্রিক ট্রলারের মাঝ দিয়ে অল্পক্ষণেই পৌঁছলাম তিন নদীর মোহনায়। একপাশে বঙ্গোপসাগর অন্যপাশে শিববাড়িয়া, আন্ধারমানিক ও সোনারতলা নদী। উঁচু উঁচু ঢেউ সাহসের সাথে! পাড়ি দিতে দিতে আমরা তখন ঢেউয়ের পানির ছিটাতে কাকভেজা হয়ে গেছি। তিন নদীর মোহনা পাড়ি দিয়ে আমরা ঢুকলাম টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটি খালের ভেতরে।

ফাতরার বন, টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ছবি: লেখক

একটু পরেই আমাদের নামিয়ে দিল নির্দিষ্ট ঘাটে। এই ঘাট থেকে একটু সামনে হেঁটে গেলেই মাঝারি আকারের একটি শানবাঁধানো পুকুর। পুকুরপারে বনরক্ষকদের থাকার পাকা দালান। পুকুরের একপাশ থেকে বনের গভীর দিয়ে সমুদ্র পর্যন্ত একটি রাস্তা আছে। এই রাস্তার কিছু অংশে কংক্রিটের ওয়াকওয়ে থাকলেও বেশিরভাগ অংশ কাদামাটির পথ। সে সময় আমরা ৪ জন ছাড়া বাকি কেউ এই পথে আসতে পারেনি। ওয়াকওয়ে থেকে নামার পর যখন সুন্দরী, গোলপাতা, কেওড়া গাছের ফাক দিয়ে; এক হাঁটু পরিমাণ কাদার মধ্যে দিয়ে; পায়ের তলায় শ্বাসমূলের খোঁচা খেতে খেতে হাঁটছিলাম তখন এক অদ্ভুত শিহরণে বারবার শিহরিত হচ্ছিলাম। জানতাম বনের এই অংশে বাঘসহ কোনো হিংস্র জানোয়ার নেই। তবুও দৃষ্টিসীমা ও শ্রবণসীমায় কোনো মানুষজন বা তাদের আওয়াজ না পাওয়ায় একটা গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এই নির্জন বনে হাঁটু পরিমাণ কাদার মধ্যে দিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা সমুদ্রের পাশে পৌঁছলাম।

ওয়াকওয়ে, ফাতরার বন। ছবি: লেখক

সমুদ্র তীরের সব গাছগুলির উপরের অংশের শিকড়ে কোনো মাটি নেই। গাছগুলো পরস্পরের শিকড় দিয়ে যেন জাল বুনে রেখেছে। এই শিকড়জালের নিচ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউগুলি যাতায়াত করছে আবার এই শিকড়জালের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে সমুদ্র পর্যন্ত যাওয়া যায়। অদ্ভুত এক দৃশ্য। সেখান থেকে আবার বনের ভেতর দিয়ে ফিরে এসে বোট চালককে সবাইমিলে অনুরোধ করলাম, বোট দিয়ে যাতে বনের আরেকটু ভেতর থেকে ঘুরিয়ে আনে। তিনি রাজি হলেন। বোট বনের ভেতরের খাল ধরে যত গভীরে যাচ্ছিল বনের সৌন্দর্য ততই প্রস্ফুটিত হচ্ছিল। ভেতরে আরো অনেক শাখা খাল চোখে পড়ছিল। গাছগুলোকে আরো ঘন, আরো সবুজ, আরো নিবিঢ়। মনে হচ্ছিল সুন্দরবনের একেবারে গহীনে চলে এসেছি। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর বোটের মুখ ঘুরিয়ে আবার বুকে কাঁপন ধরা তিন নদীর মোহনার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। শুনলাম খারাপ আবহাওয়ায় অনেক মাছধরা ট্রলারের সলিল সমাধি হয় এই মোহনাতে। ভালোয় ভালোয় মোহনা পার হয়ে আমাদের নামিয়ে দিল কুয়াকাটার লেম্বুর বনে। সেখান থেকে আবার যাত্রা করে নামলাম শুঁটকি পল্লীতে। শুঁটকিমাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের পুরো বিষয়টি এখানে দেখলাম। এখান থেকে ফিরে এলাম ঘাটে। ঘাট থেকে হোটেলে এসে ফ্রেস হয়ে খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নিলাম সবাই। হোটেলে আমাদের বিছানায় শুয়ে শুয়েই সমুদ্র দেখা যেত। হোটেল থেকে দেড়শ থেকে দুইশ ফিট দূরেই সৈকত।

শুটকিপল্লী। ছবি: লেখক

বিকেলে ঘুম থেকে উঠে সৈকতে হাঁটাহাঁটি করেই কাটিয়ে দিলাম। মেঘের কারণে সূর্যাস্তটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারলাম না। অনেকরাত পর্যন্ত সৈকতের কিটকটে বসে থেকে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরে শুয়ে পড়লাম। মধ্যরাতে জোয়ারের সময় সমুদ্রের গর্জন শুনে মনে হচ্ছিল সমুদ্রের ঢেউ বুঝি জানালা পর্যন্ত চলে এসেছে। সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই।

ঘুম ভাঙলো বড় ভাইয়ের ডাকে। দেখি ভোর সাড়ে চারটা বাজে। পাঁচটার মধ্যে রেডি হয়ে মোটরবাইকে চড়ে বেড়িয়ে পড়লাম গঙ্গামতি চরের উদ্দেশে। একপাশে সমুদ্র আরেকপাশে সৈকতের পাশে গড়ে উঠা সবুজ গাছগাছালিকে নিয়ে পৌঁছলাম গঙ্গামতি চরে। গঙ্গামতি চর থেকে গঙ্গামতি ক্যানেল পাড়ি দিয়ে সূর্যোদয় দেখলাম কাউয়ার চরে। অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে দেখা দিলেন সূয্যিমামা। ভোরের সোনালি আলো মেঘে মেঘে ছড়িয়ে দিয়ে, সমুদ্রের জলে লাল আভা তৈরি করে আগমন ঘটলো তার। তখন ভাটা চলছিল। ভোরের সোনালি আলো সমুদ্রের ভেজা বালির সৈকতে এমন প্রতিবিম্ব তৈরি করেছিল যে আকাশের সূর্যেদয়ের চেয়ে সৈকতের ভেজা বালির উপরের সূর্যোদয়কেই বেশি বাস্তব মনে হচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা এমনিতেই আসে। 

কাউয়ার চর থেকে শুরু হল ঘন ঝাউবন। এবার একপাশে ঘন ঝাউবন আর আরেক পাশে সমুদ্রকে রেখে সৈকত ধরে আমরা চললাম কাউয়ার চরের শেষ মাথায়। এখানে হাঁটুজলের একটি ছোটো ক্যানেল পাড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা গেলাম মনপুরা চরে। গিয়ে দেখি টকটকে লাল রঙের হাজার হাজার কাঁকড়া ঘুরে বেড়েচ্ছে। একটু কাছে যেতেই টুপ করে গর্তের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। এ এক দারুণ মোহনীয় দৃশ্য।

লাল কাঁকড়া দেখে ঢুকলাম ঝাউবনে। মনে হচ্ছিল বিশাল বিশাল ঝাউগাছ সমুদ্রের হামলা থেকে গ্রামবাসীকে রক্ষার জন্য যেন পাহাড়া দিচ্ছে। এক একটা যেন গাছ নয় সুবৃহৎ সাহসী প্রহরী। এমন বিশাল ঝাউবন আমি আর অন্য কোথাও দেখিনি। বেশ অনেকটা সময় ঝাউবনের ভেতের হেঁটে হেঁটে ঘুরলাম।

ঝাউবন থেকে চলে গেলাম মিশ্রিপাড়ার বৌদ্ধ বিহারে। এই বিহারের বৌদ্ধ মূর্তিটি এক সময়কার উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ বুদ্ধ প্রতিকৃতি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। যা ৩৬ ফুট উঁচু এবং প্রায় ১০০ বছরের পুরনো। বাইরে থেকে দেখলে বোঝাই যায় না যে এই মন্দিরে এতবড় বৌদ্ধ মূর্তি আছে। এর পাশেই রয়েছে একটি সুপ্রাচীন কুয়া।

এখান থেকে চলে আসলাম আরেক বৌদ্ধ বিহারে। ঐতিহ্যবাহী শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার। এটিও অনেক পুরনো এবং এখানকার বুদ্ধ প্রতিকৃতিটি প্রায় টন খানেক অষ্টধাতু দ্বারা নির্মিত।

এই বিহারের পাশেই যেই কুয়ার কারণে এই অঞ্চলের নাম হয়েছে কুয়াকাটা সেই কুয়ার অবস্থান। বর্তমানে এটি সংস্কার করা হয়েছে। আমাদের মোটরবাইক চালক নাকি নিজেও বাল্যকালে এই কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যেত ব্যবহারের জন্য।

সম্প্রতি কুয়াকাটা সৈকতে বালির নিচ থেকে একটি কাঠের সুবিশাল প্রাচীন নৌকা জেগে উঠে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে এই নৌকার বয়স প্রায় ২০০ বছর। ধারণা করা হয় রাখাইনরা এই নৌকা ব্যবহার করে বার্মা থেকে কুয়াকাটা এসেছিল। অনেক মোটা মোটা কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি, তামার পাত দিয়ে মুড়ানো অবশিষ্টাংশ, বৃহদাকার এই নৌকাটি কুয়াকাটার একটি অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।  কুয়া দেখে ফিরে এসে এই নৌকা দেখে হোটেলে ফিরলাম। 

সূর্যোদয়। ছবি: লেখক

দুপুরে সমুদ্রে কিছুক্ষণ ঝাপাঝাপি করে এবার স্থলপথে মোটরবাইকে চললাম লেম্বুর বনে। নামে লেম্বুর বন হলেও এই চরে কোনো লেবু গাছের চর চোখে পড়েনি। পরে শুনলাম লেম্বু নামে এক ব্যক্তির নামে এই চরের নামকরণ করা হয়েছে। লেম্বুর বনের কাঁকড়া ভাজা, সামুদ্রিক মাছভাজা খুব বিখ্যাত।

লেম্বুর বনের অন্য অংশের নাম ঝিনুকের চর। যেখানে হাজার হাজার সাদা ঝিনুক সৈকতে বিছিয়ে থাকে। সৈকতজুরে অসংখ্য শুভ্র ঝিনুকের আলপনা দেখতে দারুণ লাগে।

লেম্বুর বনের আরেক অংশের নাম ক্র‍্যাব আইল্যান্ড বা লাল কাঁকড়ার দ্বীপ। বিকালে আমরা তেমন লাল কাঁকড়া দেখতে পাইনি।

লেম্বুর বন থেকে সূর্যাস্ত দেখে হোটেলে ফিরে ব্যাকপ্যাকের সাথে এক ঝুড়ি আনন্দময়  অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে বাসে উঠি। পরে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ আসি।

লেখক: সৈয়দ আশরারুল হাসান (জ্যোতি) 

ফিচার ছবি: লেখক

Back to top