fbpx

সান্দাকফু ফালুট মিশন-পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ বিন্দুতে

২৭ অক্টোবর ২০১৯
আজ কালাপোখরি থেকে সান্দাকফু যেতে হবে। ৭ কিলোমিটার যেতে হবে। রাতেই বলা হয়েছিল যে আমাদেরকে সকাল সকাল বের হতে হবে, কালাপোখরির সকাল সবার ফুরফুরে মেজাজ, নাস্তা দেখে সবাই আরও খুশি হয়ে গেলো বিকজ নাস্তায় ছিলো রুটি, সবজি, ডিম সেদ্ধ পাপড়। রুটিটা মেবি গমের আটার রুটি হবে। নাস্তা করে বাইরে যখন বের হলাম কিরন ভাই বলল আপু ওই যে দেখতে পাচ্ছেন একটা ঘর ওইটাই সান্দাকফু। বাট আমি বুঝতে পারলাম সান্দাকফু এখান থেকে দেখা গেলেও মোটেও কাছে নয় কারণ আমি বুঝে গেছি পাহাড় থেকে সব কাছে মনে হলেও ওর কাছে যেতে বেশ ধকল পাড় করতে হয়। প্রথমে কিলোমিটার হিসাব করতাম কোন এক ঠিকানা থেকে আরেক ঠিকানার। আর এটাই স্বাভাবিক কিন্তু পাহাড়ের কিলোমিটার হিসাব অনেক তফাৎ। এই ট্যুর দেয়ার আগে আমাদেরকে অনেক ইন্সট্রাকশন দেয়া হয়েছিলো, যে ২.৫০ কিলোমিটার দৌড় ২৫ মিনিটে দিতে পারবে তার জন্য এই ট্যুর পারফেক্ট আমি মনে মনে ভাবলাম এ আর এমন কি! ৭ মিনিট এ আমার অবস্থা দফারফা হয়ে যেত। আমি অলওয়েজ ফাঁকিবাজ, প্র্যাকটিসে ফাঁকিবাজি করেছি, দৌড়াতে বলেছিল ১ ঘণ্টা সেখানে করতাম ৪০ মিনিট, প্রতিদিন সিঁড়ি ওঠানামা হতো ৩০/৩৬ তলা ১ মাস লিফট ইউজ করা বাদ দিয়েছিলাম। আমাদের হোস্ট আমাদেরকে বলেছিলো পারলে প্রতিদিন আমরা যেন রসুন খাই, রসুন খেলে হার্ট পাম্প করে, আমি ত পারলে রসুন আরও বেছে বেছে খেতাম কিন্তু এবার অমান্য করিনি। আমার দোস্ত আমাকে জিজ্ঞেস করল তুই রসুন খাচ্ছিস তো? খাচ্ছি মানে সকাল, দুপুর, রাতে ২ টা করে খাচ্ছি তুই করছিস কি! ৭ দিনের খাওয়া ১ দিনে খাচ্ছিস! এত লম্বা ট্রেকিং ট্যুরে আগে এভাবে দেয়া হয়নি, সেজন্য আমাদের সবার মধ্যে একটু সিরিয়াসনেস কাজ করত।

এবার আমরা সবাই রেডি সান্দাকফু যাওয়ার উদ্দেশে। গ্রুপ ছবি তুলে রওনা হলাম, হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম এ পথে হাঁটতে আমার কষ্ট হচ্ছে না, যেটা বলা হয়েছিল যে সান্দাকফু যেতে বেগ পেতে হবে অনেকটা খাড়া উঠতে হবে। আমি বেশ ফুরফুরে মন, পা, শরীর নিয়ে চলতে থাকলাম। প্রথম ২ ঘণ্টা ট্রেক করে বিকে ভাঞ্জনে এসে পৌঁছলাম। এখানেই লাস্ট চা চিনি মিলবে এরপর আর কোথাও কিছু মিলবে না। আমি চায়ের জন্য অপেক্ষা করছি দাওয়া বলল, ‘দিদি আপ উপর যায়িয়ে ম্যা চা লেয়াউংগি।’ উপরে উঠতেই প্রথম দর্শন মিললো কাঞ্চনজঙ্ঘা, মাথা উঁচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। দাওয়া এসে আমাকে চা দিয়ে গেল, আমি চায়ে চুমুক দিব না কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখবো! ফকফকা ওয়েদার ঝকঝকা রোদ, সবাই বসে, নিলডাওন হয়ে একেকজন একেকভাবে সবকিছু মিলিয়ে নিচ্ছে। দেশে থাকতে আমাদের ওয়েদার আমাদেরকে সতর্কবাণী দিয়েছিল যে এদিন বৃষ্টি থাকবে আমরাও সে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। যাক প্রকৃতি আমাদের অনুকূলে ছিলো। সান্দাকফুর ওয়েদারের নাকি কোন ভরসা নাই। হুটহাট ওয়েদার চেঞ্জ হতে পারে, আল্লাহ আমাদের উপর সহায় হলেন।

চায়ের পর্ব শেষ এবার আমাদের উঠতে হবে উপরে যাওয়ার জন্য। তিন দিকে রাস্তা আছে যাওয়ার জন্য বাট আমাদের ট্রেকিংয়ের জন্য সিঁড়ি দিয়ে উপরে যেতে হবে। বাকি ২ দিকের রাস্তা গাড়ির রাস্তা। আমি সায়েম ভাইকে বললাম আজ কিন্তু আমাদের কষ্ট হয়নি, আমার তো সফরটা ভালো লাগতেছে। এ কথা শুনে পাশ থেকে নিয়াজ ভাই বললেন আপু ফুরফুরে মেজাজ নিয়েই চলেন আসল খেলা এখন থেকেই শুরু। চলতে চলতে রাশেদ ভাইকে ধরলাম। রাশেদ ভাই বলল আপু আমরা মনে হয় ১১,০০০ ফিট উপরে চলে আসছি হয়ত একটু পর আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হতে পারে, আমি বললাম এরপর আমাকে এটা আর স্মরণ করায়েন না দেখা যাবে যে আমার কিছু হচ্ছে না অথচ আমার মন খুতখুত করতেছে। সান্দাকফু যেতে যেতে যখন দেখি পাশ দিয়ে জিপ চলে যাচ্ছে তখন জিপ দেখে পা মনে হয় অবশ হয়ে আসে। ঠিক করলাম আর জিপের দিকে তাকাবো না।

বাকি ৪ কিলোমিটার শুধু আমাদের খাড়া পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে হবে ২ কিলোমিটার যাওয়ার পর একজাগায় আমরা বিশ্রাম নিলাম সান্দাকফুর নিচে যেখানে বসলাম তার রূপের কথা বলে শেষ করা যাবে না। রূপ দেখতে হলে ট্রেকিং করেই যেতে হবে। বেশ কিছু সময় আমরা ওখানে কাটালাম, আল্লাহ প্রত্যেকটা সৃষ্টি খুবই নিখুত। বসে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা গান শুনলাম, নেপালি গান, পাহাড়ি গান আর কেউ কেউ নিজের কণ্ঠের গান শোনালো। পরিবেশ, পরিস্থিতি সবকিছু ছিল আমাদের সাথে তাল মিলিয়ে। আমি যখন কিছুটা দুরে গিয়ে একা একা প্রকৃতি অনুভব করতে থাকলাম দাওয়া দৌড়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘দিদি আপ ঠিক ত হ্যা না?’ আমি বললাম আলবত আমি ঠিক আছি। ট্রেকিংয়ের সময় দাওয়াকে আমরা আমাদের সাথে সাথে পাই না ও কিছুটা সামনে থাকে আবার কেউ পিছিয়ে পড়লে আবার পিছিয়ে গিয়ে তার সাথে চলে। ও ওর মতো চলে কিন্তু সবার দিকে নজর থাকে।

বিশ্রামের সময় শেষ বাকি ২ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হবে এই ৪ কিলোমিটার পথ যেন শেষ হতে চায় না! একটু একটু করে আগাই আর একটু করে থামি যত উপরে উঠতে থাকলাম আম্মাকে খুব মনে পড়ল। এতটা উপরে উঠলাম যে মেঘ আমাদের নিচে বা মেঘ আমাদের সাথে সাথে চলে সে আশায় অলৌকিকভাবে যদি আম্মা আব্বার দেখা পেয়ে যেতাম! পুরনো সব স্মৃতি মনে হতে থাকল! উঠি থামি উঠি থামি আশেপাশে দেখি আবার চলি আবার থামি এ থামার মধ্যেই চলে হাসি ঠাট্টা আর অলমোস্ট শব্দটা। চলতে চলতে নিয়াজ ভাইয়ের মোবাইলের গান শুনতে শুনতে পথ এগিয়ে যাওয়া। চলতে চলতে যেদিক দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা উকি মারে সেদিক থেকেই দেখে নেই। শেষমেষ উঠেই পড়লাম স্বপ্নের সান্দাকফুকে বাস্তবে দেখার আশায়।

আমাদের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেতে ডাইনিংয়ে আসলাম কনকনে বাতাস আর ঠাণ্ডার মধ্যে খাওয়া শেষ করে আমি সোজা ওদের রান্না ঘরে চলে গেলাম চুলার আগুনের তাপ নিতে। দাওয়া আবার জিজ্ঞেস করল, ‘দিদি আপ ঠিক হ্যা?’ আমি ভাবতে লাগলাম আচ্ছা আমাকে দেখতে মনে হয় অসুস্থ লাগতেছে এজন্য ও বার বার জিজ্ঞেস করছে। রান্নাঘরে আমি যখন তাপ নিচ্ছি তখন এক লোক এসে আমাকে একটা টুল দিল বসার জন্য। বসে বসে খেয়াল হলো আমি তো এখন ১৩,০০০ ফিট উপরে। বলা হয়েছিল যে সান্দাকফুতে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হবে, মাথা ঘোরাবে, বমি হতে পারে যদি এরকম কিছু হয় তাহলে ১৩,০০০ ফিট থেকে নিচে চলে যেতে হবে ১০,০০০ ফিট লেভেলে। তখন খেয়াল হলো এজন্য দাওয়া বার বার খোঁজ নিচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ আমার তেমন কিছু হয়নি। বিকেলে ডাইনিংয়ে এসে যখন চা পান করলাম দেখি পুরো কাঞ্চনজঙ্ঘা আমার সামনে, দুপুরে খাওয়ায় ব্যস্ত ছিলাম তাই খেয়াল করিনি। সবাই বের হলাম মানে রুমের সামনেই গেলাম ৫ টা মাউন্টেইনকে একসাথে দেখলাম। দাওয়া আমাদেরকে বলে দিচ্ছে কোনটা কোন পর্বত, বুদ্ধা, থ্রি সিস্টার, এভারেস্ট, এলএইসহটে, মলে আর পুরো রেঞ্জ ধরে আছে কাঞ্চন, এত ভালো ওয়েদার নাকি গত ৩/৪ বছরে কেউ পায়নি। তামান্না আপু শাড়ি পরে চলে এল মাউন্টেন দেখতে, সবাই ছবি তুললো একেক ভঙ্গিমায়।

আমার শুধু মনে হতে থাকলো কোন পর্বত আরোহী কাঞ্চনজঙ্ঘা জয় করছে আর আমি এখান থেকে বসে দেখছি। সবাই বিকেলে সামিট করতে চলে গেল আরও অনেকটা দুরে, সামিট করে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। ডাইনিংয়ে বসে আছি কিছুক্ষণ পর দেখি এক কুকুর এসে ঘুর ঘুর করা দেখে আমি উঠে দুরে গেলাম। আর আমার জায়গা সে দখল করে নিলো। কুকুর হয়েছে তো কি হয়েছে! তারও পা আছে, পা যেহেতু আছে পায়ে ব্যাথা হতেই পারে। কারণ তারা সারাদিন পর্যটকদের সাথে ঘুরে বেরায় আবার সামিটও করতে যায়!

লেখা : সাড়া সিদ্দিকী

গ্রুপ টিজিবি:
https://www.facebook.com/groups/TourgroupBd/

Back to top