fbpx

সান্দাকফু ফালুট মিশন-সাবারগ্রাম

সন্ধ্যায় ফরেনারদের আসর বসল কফি, বারবিকিউ, গান, আড্ডা সেলিব্রেশনে মসগুল। আমরা ক্লান্ত হয়ে রুমে রেস্ট নিলাম। রুমে অনেক ঠাণ্ডা ২ দিন ধরে গোসল নাই। পানি বরফের মত ঠাণ্ডা সে পানি দিয়ে হাত ধুতেই কষ্ট গোসল তো দুরের কথা। গরম পানি পাওয়া যায় তবে খাওয়ার জন্য। গোসলের পানি নিতে হলে ২০০ রুপি গুনতে হবে, ভাবলাম কেওক্রাডংই ভালো ৫০ টাকা দিয়ে অনেক পানি পাওয়া যায়।

আমি আবার চলে আসলাম রান্নাঘরে আগুনের তাপ নিতে। শেফ তার রান্না নিয়ে ব্যাস্ত আমাকে দেখে সে বলল, ‘ক্যায়া হুয়া? বহুত ঠান্ড হ্যা। কাহা সে আইয়ে হ্যা আপ? রুম সে। নেহি নেহি কাহা ছে? অ বাংলাদেশ ছে। হুম বাংলাদেশ ছে বহুত আতি হ্যা ইহাপে। ওধার ইত্নে ঠান্ড নেহি হ্যা না? হুম।’ শেফ আমাকে জায়গা করে দিয়ে বলল, ‘বেঠিয়ে ইহাপে আরামছে।’ একটু পর দেখি আমার দোস্ত চলে আসছে। কিরে তর না শীত করে না চুলার পারে কেন? আমি অরে বললাম এত ঠাণ্ডা তো ঢাকায় পড়ে নারে অ্যাডজাস্ট হতে সময় লাগবে। শেফ আমার বান্ধবীর সাথে বেশ আলাপ দিল। একটু পর পর যেই আসে আমাকে জিজ্ঞেস করে ‘দিদি ক্যায়া হুয়া?’ আমি চুপ। একপর্যায়ে শেফ আমার বান্ধবীকে বলল, ‘দিদি আপ মেরা পেয়াজ নাড়েংগে ম্যা যারা উপর ছে আতিহু।’ আমার বান্ধবী পেয়াজ নারে আর আমি আগুন তাপি। বান্ধবী আর শেফ রান্নায় ব্যস্ত হয়ে গেল। পেয়াজ হয়ে গেলে তারা ছবি তুলল। আমরা ডাইনিংয়ে চলে গেলাম রাতের খাবার খেয়ে রুমে চলে গেলাম। কম্বলের ভিতর আমার কাপাকাপি দেখে আমার বান্ধবী বলল দাঁড়া দেশে গিয়া আমি রাহি ভাইকে বলবো যে তোমার নাকি শীত নাই! বাহাদুরি দেখায়ছিলা যে তোমার শীত নাই। আমাদের চেয়ে তোরই বেশি শীত। আমি ভাবি বান্ধবী গল্প করতে করতে চুপ হয়ে গেলাম। বান্ধবী ঘুমে ব্যস্ত এ রাতেও আমার ঘুম হোল না! ৪ টার দিকে ডাক পড়লো আমি দিব্বি চেয়ে থেকে রাত পাড় করলাম। সবাই চলে গেলো সূর্য অস্ত দেখতে, আমি অলস শুয়ে থাকলাম। ৪৮ ঘণ্টায় ৪৮ সেকেন্ড ঘুম হয়নি এবার একটু চিন্তিত হলাম কারণ আজ ফালুট যেতে হবে পথে ঘুম এসে পড়লে আমার উপায় কি! ডাইনিংয়ে আসতেই সেই রান্নাঘরের শেফ আমাকে গুডমর্নিং দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপ ঠিক হ্যা? রাত মে নিন্দ হওয়া?’ আমি, ‘হ্যা সব ঠিক হে বাট নিন্দ নেহি আয়ি।’ চা খেলাম, এক ফরেনার আমাকে হাসিমুখে গুডমর্নিং দিলো আমিও দিলাম। বাপ আর ছেলে কফি খাচ্ছে। বান্ধবী বলল বাপ না দিয়ে পোলায় দিত! তুই ত সে আশায় করতে ছিলি বলে ২ জনেই হাসলাম। গরম পানি নিয়ে ব্রাশ করতে চলে আসলাম, আমি টয়লেটে ব্রাশ না করে বাইরে খোলা জাগায় সাড়ি সাড়ি গাছের পাশে ব্রাশ করতে থাকলাম আর আশেপাশে তাকালাম কেউ আবার দেখছে কিনা? ব্রাশ করতে গিয়ে ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেলো ।

ফ্রেশ হয়ে ব্যাগ গুছিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম। ম্যাগি দেখে আমার পেট উল্টিয়ে এল এখন যদি আমি বমি করি আমাকে ওরা ফালুট নিবে না, বলবে আমার অলটিটিউট সিকনেস হচ্ছে। আমি যদি বলি ম্যাগি দেখে আমার এমন লাগতেছে ওরা বিশ্বাস করবে না, আমি না খেয়ে দ্রুত বাইরে চলে আসলাম। ওরা বলতে থাকল আপনি না খেলে ট্রেকিং করতে পারবেন না। আমি পারব আমার অভ্যেস আছে। নাস্তা ভুলে একটা বাইক দেখলাম সেইরকম বাইক দেখলাম ৩৫০ সিসি অনেকটা ডব্লিউডব্লিউএফের আন্ডারট্রেকারের বাইকের মত। ইচ্ছে করছিলো এটা দিয়ে সান্দাকফু নেমে আবার উপরে উঠে আসি। ভাবলাম এটা নিয়ে উপরে আসলো কিভাবে? বাইকের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম আর বাইকারকে দেখার ইচ্ছা হলো আবার ভাবলাম যদি কিছু বলে! কোন ভাষা বলবে কিছুই বুজবো না। কিছুক্ষণ পর বাইকার আসলো ইয়া লম্বা কোমড় পর্যন্ত চুল বেনি আর জটলা বাধা চুল মুখে খোঁচা দাড়ি বিশাল দেহ আমি আর তাহার দিকে তাকালাম না! পরে দেখি বাকিরা সবাই বাইক নিয়ে পোজ দিয়ে ছবি তুলছে। সবার নাস্তা খাওয়া শেষ। ফালুটের উদ্দেশে যাত্রা দিতে হবে। গ্রুপ ছবির পর্ব চললো। সেই শেফ এসে আমাদের সবার ছবি তুলে দিলো। শেফ বললো এভাবে ভালো হচ্ছে না তো? লাফ দিতে হবে আর অনেক সুন্দর করে হাসি দিতে হবে। আমাদেরকে চাংগা করার জন্য শেফের আইডিয়া সবাই খুশি হলো। সবাই আমরা বিদায় নিয়ে নিলাম। আমাদেরকে সবাই উইস করলো। হাসি মুখে আবার ট্রেকিং শুরু।

২৮ অক্টোবর ২০১৯
ট্রেকিংয়ের আজ হলো সব থেকে লম্বা সফর ২২ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হবে। একটু থ্রিলারও আছে নাকি! এই পথে আর কোন গাড়ি পাওয়া যাবে না, কোন খাবার পাওয়া যাবে না। যা শুকনো খাবার সান্দাকফু থেকেই নিতে হবে হবে, ফিরে যেতে হলে এখান থেকেই ফিরতে হবে কারণ ফালুট থেকে কোন গাড়ি পাওয়া যাবে না। সবকিছু জেনে নিয়ে মেন্টাল প্রিপারেশন নিয়েই আল্লাহ পাককে স্মরণ করে শুরু হলো আমাদের থ্রিলার সিরিজের মত যাত্রা। যেতে যেতে পথে খুঁজতে থাকলাম আমার হারিয়ে ফেলা গ্লাবস। ফালুটের পথে যাত্রা হতেই আমার কল্পনায় চলে এলো সমরেশ মজুমদারের গর্ভধারিণীর কথা। যেখানে চার বন্ধু মিলে আশ্রয় নিয়েছিলো সান্দাকফু আর ফালুটে সমাজকে বদলে ফেলার আশায়। অসম অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় হয়ে ওঠা চার বন্ধু, তাদের মধ্যে একজন নারি জয়িতা। জয়িতা তার তিন বন্ধুর সাথে আনন্দ, সুদিপ আর কল্লানের সাথে মিলে নেমেছিল নতুন এক সমাজে গড়ার লক্ষ্যে। গল্পে জয়িতার ভূমিকা ছিলো মুখ্য, বিপদে বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারার মত মেয়ে। সেই সময়ে জয়িতা এই দুরগম পথ পাড়ি দিয়েছে। নেটওয়ার্ক বিহীন, পরিবারকে ছেড়ে এই গ্রামে বসবাস করেছে বহুদিন। এগুলি ভাবতে ভাবতে পথ চললাম আর এই পথে আজ আমারও পায়ের ছাপ রয়ে গেলো।

ভারত পশ্চিম বাংলায় উচ্চতার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ফালুট (৩,৬০০ মিটার)। হিমালয়ের একটা অংশের হলো সিঙ্গালিলা শৈলশিরা যা সিকিম আর নেপালের বর্ডার দিয়ে পশ্চিম বাংলায় অবস্থিত যেটা কিনা ওই সিঙ্গালিলা জাতীয় পার্কের মধ্যেই আছে। একটা bunkhouse (বিশ্রামাগার) আছে ফালুটের চুরান্তে যেটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশাসন দ্বারা চালিত। সিঙ্গালিলা পাস প্রায় ১৭ কিলোমিটার দুরুত্বে আছে ফালুট থেকে। দেশীয় উপজাতি যারা চুড়ার চারপাশেই থাকে তারা ফালুতিয়ান নামেই পরিচিত বহিরাগতদের কাছে পরিচিত। ফালুতিয়ানদের ইতিহাস হচ্ছে ৩০০ বছর ধরে ফালুটের চূড়া পুজা উপাসনা করা আর তারা বিশ্বাস করে ফালুট হল সর্বজ্ঞ প্রভু আর তারা ওই চুড়ার নাম দিয়েছে ‘Omna Re Ay’।

আমি পাথরের রাস্তার চেয়ে মাটির চিকন রাস্তা দিয়ে হাঁটাটা বেশি সাচ্ছন্দবোধ করলাম। মাটির উপরে কিছু কিছু জায়গায় ঘাস বিছানো যার উপর শিশিরের কনা আটকে রয়েছে। বহুদিন পর এমন পথ পেলাম সুযোগ হাতছাড়া করিনি বাট ওটা ছিলো রিস্ক কারণ পাশেই খাদ। নুরুল ভাই কয়েকবার আমাকে বলেছে আপা এতটা কিনারে যাইয়েন না! আমার ভয়টা ছিলো অন্য জায়গায়, আমার ভারটিগো যেন আমাকে অ্যাটাক না করে। কিছুটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাওয়া, আবার খোলা ময়দানে সুবিশাল মাঠ পেরিয়ে আবার উঁচুতে উঠা, উঁচু পেরিয়ে নিচে, লেকের পাড়ে বিশ্রাম নেয়া, খোলা ময়দান সবুজ কারপেটে মোড়ানো তার উপর গা এলিয়ে দেয়া।

জীবনটাকে উপভোগ করলাম। প্রতিটা সময় খুবই দামি ভাবে কাটালাম হয়তো আর আশা হবে কিনা সে ভেবে যতটা পাড়া যায় বুক ভরে পিউর অক্সিজেন নিলাম। চলতে চলতে আমাদের অনেকটা পথ পাড়ি দেয়া হলো। আমার অগ্রসর হওয়া দেখে নিয়াজ ভাই, শিপন ভাই আর রাশেদ ভাই উপর থেকে হাত তালি দিয়ে অভিনন্দন জানালো। নিজের স্পিড নিয়ে যখন হতাশায় ছিলাম তখন ওনাদের এই অভিনন্দনটা আমার জন্য অনেক বড় পুরস্কার ছিলো মেমোরিতে গেঁথে যাওয়ার মতো।

আমাদের চলতে চলতে বিকেল, অভুক্ত সবাই। হোস্ট ঠিক করলেন আমরা আজ একটা ছোট গ্রাম সাবারগ্রামে রাতে থাকবো যা নেপালের বর্ডার পশ্চিমবঙ্গের শেষ সিমানা। তার আগে আমরা মলে যা আরমিদের গেস্ট হাউজে কিছু খেয়ে নিলাম। আমি মলেতে ডাইনিংয়ে না বসে ওদের রান্নাঘরে চলে গেলাম পায়ে তাপ দেয়ার জন্য আর ওদের নুডুলস এবং আণ্ডা ভাজি দেখলাম। খাওয়া শেষ হতেই সন্ধ্যা আর ১ কিলোমিটার যেতে হবে। সবাই লাইট নিয়ে চললাম। খুবই শুনশান নীরবতা এলাকা পিন ড্রপ সাইলেন্সে হাঁটতে হলো। দেখা মিলল সাভারিয়ার কটেজ, বিশাল কটেজ বড় বড় রুম বাট ইলেক্ট্রেসিটি নেই বাকি সব পারফেক্ট বিশাল ডাইনিংয়ে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। একটু পর শুনতে পেলাম পর পর ৩টা গুলির আওয়াজ, আমি ভয়ে শেষ, ভাবতে লাগলাম আর বুঝি ফালুট যাওয়া হলো না৷ কি বুঝে দাওয়া এসে বলে গেলো দিদি, ‘ডরনাইয়ে মাথ, হামারা ইহা পে দিবালি হে ত আতসবাজি ফোটানো হচ্ছে।’ এবার একটু সাহস পেয়ে ঘুমকে স্বাগত জানালাম।

লেখা : সাড়া সিদ্দিকী

গ্রুপ টিজিবি:
https://www.facebook.com/groups/TourgroupBd/


Back to top