fbpx

নেপালে অ্যাডভেঞ্চার – প্যারাগ্লাইডিং

২০১৮ সালে নেপাল অনুষ্ঠিত ‘৪র্থ আন্তর্জাতিক অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় উৎসব’-সত্যিকার অর্থেই ছিল- অ্যাডভেঞ্চারে পরিপূর্ণ। বাঞ্জি জাম্প, ক্লিফ জাম্পিং, স্রোতসিনী পাথুরে-ভটিকশি নদীতে রাফটিং, সিদ্দা কেভ এক্সপ্লোর, ওয়াল ক্লাইম্বিং, হেলি রাইডে হিমালয়ের অন্নপূর্ণা সার্কেলের বেজ ক্যাম্প অভিযান, প্যারাগ্লাইডিং – এসব কিছুরই সীমাহীন আনন্দ উপভোগ করেছিলাম সে যাত্রায়। ৫ দিন ব্যাপী উৎসবের শেষের ঠিক আগের দিন অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প থেকে ফিরে এসে দুপুর নেপালের স্থানীয় সময় একটায় চলে যাই পোখরার পাহাড়ি এলাকা-সারাংকোটে। একদিন আগেই আয়োজক – বিষ্ণু কান্তি ধীমার বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন প্যারাগ্লাইডিং। যদিও পোখারার রাস্তায় রাস্তায় বুকিং সেন্টারের ছড়াছড়ি । খরচ একটু বেশিই, ছবি ভিডিও সহ ১০০ ইউএস ডলার আর বাংলাদেশি টাকায় গড়ে প্রায় ৮,০০০ টাকার মতো। আমরা প্যারাগ্লাইডিং করেছিলাম, হাই ফ্লায়ার নামে একটি প্যারাগ্লাইডিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় । কোম্পানিটির অবস্থান আমাদের লেক টাওয়ার হোটেল থেকে কয়েক মিনিটের দূরত্বে একটু উপরে। অফিসে পৌঁছানোর পর, প্রথমেই একটি ফর্ম এগিয়ে দেয় কতৃপক্ষ পূরণ করার জন্যে- ‘ডিসক্লেইমার টাইপ, দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা থেকে দায়মুক্তি বিষয়ক’। যদিও অভিজ্ঞতা বলে -তেমন ভয়ের কিছুই নেই। প্যারাগ্লাইডিং পাইলটরা যথেষ্টই অভিজ্ঞ- প্রফেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেই অনুমতি মেলে তাদের প্যারাগ্লাইডিংয়ের জন্যে।

সারাংকোটের যে জায়গা থেকে প্যারাগ্লাইডিং শুরু হয় জিপে করে ‘হাই ফ্লায়ার’ অফিস থেকে সেখানে পৌঁছে গেলাম আধা ঘণ্টার মধ্যেই। একপাশে পাহাড়ের ওপরে রয়েছে পোখারায় প্যারাগ্লাইডিংয়ের আয়োজন অন্যপাশে ত্রিশুলি নদীর পাড়ে দুটি পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে বাঞ্জি জাম্প টাওয়ার। দুটি পাহাড়ের মাঝে ২৩০ ফুট উঁচুতে (৭০ মিটার, মানে একটা ২২ তলা বিল্ডিংয়ের সমান) একটি পাহাড় থেকে তৈরি টাওয়ার থেকে বাঞ্জি জাম্প দেওয়া হয়। কন্যা ভোরের অতি আগ্রহের কারণে বাঞ্জির বুকিং দিয়ে সূর্য বাদে টিমের অন্য ৯ জন সদস্য, ২টি গাড়ি করে চলে গেলাম প্যারাগ্লাইডিংয়ের উদ্দেশে। একই সময়ে সূর্য রওনা করলো ভোরের সঙ্গে- পোখরায়- বাঞ্জি জাম্প ভ্যেনুতে।

গাড়িতে ওঠার পর আমার প্যারাগ্লাইডিংয়ের পাইলট – বসন্ত ধীমারের সঙ্গে কথা হলো। আমাকে ওয়েলকাম জানায় খুব আন্তরিকভাবে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানতে পেলাম, পোখরা শহর সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৮০০ মিটার উঁচুতে। প্রায় দ্বিগুণ দূরত্ব অতিক্রম করে আমরা আকাশে ভেসে বেড়াবো । সঙ্গে কোনো কিছুই বহন করা যাবে না। কারণ পাহাড় থেকে প্যারাগ্লাইডিং শুরু করে বাতাসে ভেসে ভেসে পোখরার বিখ্যাত ফেউয়া লেকের পাশে জিপ লাইনে ল্যান্ড করতে হবে। বলা যায় না, সেখানে ফেউয়া লেকের পাশে ল্যাণ্ড না করে লেকের নীল পানিতে পড়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

গাড়ি চলে এসে থেমেছে পাহাড়ের চূড়ায়- একটা টেইক অফ জোনে। ওই পর্বতের প্রায় সব অংশেই চলে দিনব্যাপী প্যারাগ্লাইডিংয়ের মহোৎসব। দেখতে অনেকটা আমাদের দেশে ঘুড়ি উৎসবের মতো- যেনো আকাশ জুড়ে রঙ-বেরঙের ছড়াছড়ি। প্রথমেই পাইলট বসন্তজী আমাকে বুঝিয়ে দিলেন আকাশে উড়ার কলা-কৌশল। এক ধরনের বিশেষ ভেস্ট পরিয়ে দিলেন শরীরের উপরের অংশে আর মাথায় বেঁধে দিলেন গাঢ় নীল আর জলপাই রঙের হেলমেট। অনেকটা রিকসার পাদানীর মতো আমি আটকে থাকলাম; পাইলট থেকে কিছুটা নিচে-পেলামট্রেসারের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে।

পোখরার পাহাড়ে গ্লাইডারটা খুলে বাতাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে কিছুক্ষণ, সুবিধাজনক বাতাস পাওয়ার সাথে সাথে গ্লাইডারটা ফুলে-ফেঁপে উঠলো, সেই সাথে পাইলট বসন্তজীর তড়িৎ নির্দেশ- ‘রান! রা. . . ন!’ সোজা পর্বতের উঁচু অংশ থেকে ঢালের দিকে দৌড় দিলাম–ভো-ও-ও করে। কয়েক কদম দৌড় দিয়ে লাফ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আবিস্কার করলাম পাহাড়ের চূড়ার একটু নিচে- আকাশে। বাতাসে ভেসে যেন উড়ে চলেছি স্বপ্নালোকে নীল আকাশে। আহা! এ এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা।

প্যারগ্লাইডিং কালে সারেংকোটের পাহাড়ের নিচে আকাশে

পোখরার উঁচু পাহাড় থেকে নিচের দিকে জাম্প দেয়ার সময় শুরুতে একটু বুক কাঁপছিলো, কিছুটা রোমাঞ্চিত ছিলাম তবে তা বেশিক্ষণের জন্য নয়; কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে উৎকণ্ঠা যেন হাওয়ায় মিশে যায়। আকাশে ভাসতে ভাসতে চারপাশে তাকালাম-উপর-নিচে। কি যে অদ্ভুত লাগছিলো-যতক্ষণ ছিলাম যেন বিভোর হয়ে ছিলাম কল্পনায় আর বাস্তবতার সূতায় নিজেকে জড়িয়ে। সত্যিই, একসময় আকাশ থেকে একটুও নামতে মন চাইছিল না, পাখির মতো উড়ে উড়ে- ঘুরে- ঘুরে দূরে অন্যকোথাও চলে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল । আকাশে ভেসে ভেসে নিজেকে পাখি পাখি মনে হয়েছিল।

আশেপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে প্যারাগ্লাইডিং এ আরও অনেকে। বিভিন্ন নকশার আর রঙধনুর রঙে রঙিন প্যারাগ্লাইডিং বাতাসে ভর করে পোখরার আকাশে ছড়িয়ে রয়েছে। সত্যি যেন পাখি হয়ে উড়ে উড়ে আর ঘুরে ঘুরে চলেছে বিভিন্ন নকশার গ্লাইডার। পাইলট বসন্তজীর ঘোষণা- ‘আমরা এখন পোখরার বাতাসে উড়ছি।’ একটু পরেই পাইলটের ঘোষণা থেকে জানলাম পর্বতের যে অংশ থেকে উড়াল দিয়েছি তার অন্তত ২০০ মিটার উপরে অবস্থান করছি আমরা।

একটা সেলফি স্টিক ধরিয়ে দিলেন আমাকে পাইলট বসন্তজী । স্থির চিত্রের পাশাপাশি ভিডিও হয়েছিল পুরো প্যারগ্লাইডিং ভ্রমণটি। একটা ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল পাইলটকে- আকাশে ভেসে বেডানোর অনুভূতি জানিয়ে। বসন্তজীকে জানালাম, ‘আমাকে আবারো পোখরায় আসতে হবে- ভোর আর তার বাবা সূর্যের সঙ্গে-একসঙ্গে; পাখির মতো থ্রিলিং আর অ্যাডভেঞ্চারের অনুভব পেতে।’

প্যারগ্লাইডিং শেষে ল্যান্ড করার কিছু সময় আগে

দেখতে দেখতে চোখের পলকে বাতাসে ভর করে অনেক উপরে উঠে আসলাম। ভ্রমণসঙ্গী ২-৩ জনের সঙ্গে আকাশে ভাসতে ভাসতে দেখা হয়ে গেলো। নিচে অপূর্ব সুন্দর নীল রঙের ফেউয়া লেক, লেকের চারপাশ ঘন সবুজ গাছ-পালায় প্রাচীরের মতো হয়ে আছে আর চারদিকে হিমালয় পর্বতমালা- রূপালী রঙের চোখ ঝলসানো হিমালয় পর্বতমালার চূড়া – মাছের লেজের আকৃতির- মচ্ছপুচ্ছ আর অন্নপূর্ণা রেঞ্জ। জলপাই রঙের পাহাড়ের চূড়ায় সাদা রঙের পিস প্যাগোডা দাঁড়িয়ে আছে কারুকার্যময় সোনালি রঙের গম্বুজ নিয়ে। দূর পাহাড়ের কিছুটা নিচে মেঘ ছুঁয়ে আমরা উড়ে বেড়াচ্ছি বাতাসে।

হঠাৎই পাইলট বসন্তজী জানতে চাইলেন, ‘শূন্যে ডিগবাজি দিতে চাই কিনা-অ্যাকরোব্যাট ভঙ্গিতে? এমনিতেই ভয়াবহ মজা পাচ্ছি তবে শুরুতে বাতাসের চাপের জন্যে বুকে কিছুটা চাপ অনুভব করছিলাম। তাই বিনয়ের সঙ্গে ডিগবাজির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম। এরকম অ্যাডভেঞ্চারের বেশ কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম আমরা মোটামুটি আকাশ থেকে ক্রমেই অনেকটাই নিচে নেমে এসেছি। এর মধ্যেই পেরিয়ে গেছে ৩০ মিনিটের সময়কাল। সময় হয়েছে প্যারগ্লাইডিং শেষে ল্যান্ড করার। ওপর থেকে ফেওয়া লেকের পাশে বৃত্ত আকারের জীপ লাইন পরিস্কার দেখতে পারছি। লেকের পাশে যেন উড়ন্ত রঙিন পাখিদের ল্যান্ড করার জন্য একটা মিনি এয়ারপোর্ট। ঘুড়ির মতো ঘুরে ঘুরে আকাশ থেকে নেমে এসেছি লেকের পাশের ল্যান্ডিং মাঠে- যেখানে রয়েছে সাদা বৃত্ত দেয়া জীপ লাইনের সীমানা।

শেষ মুহূর্তে দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন- পাইলট বসন্তজী। যেভাবে বসে আছি, সেই বিশেষ একধরণের ঝোলা থেকে একটু বের হয়ে ল্যান্ড করার সময়ও হাল্কা দৌড় দিয়ে সামনে এগিয়ে থেমে যেতে হবে। মনে পড়লো, সকালে অন্নপূর্ণা বেইজ ক্যাম্প থেকে আসার সময় হেলিরাইড থেকে পোখরার প্যারগ্লাইডিং দেখেছিলাম। কন্ট্রোল রুম থেকে নির্দেশনা শুনে প্যারগ্লাইডিং এর জন্য একটু ডানদিকে সরে এসে হেলিকপ্টার রাইড করেছিলেন পাইলট। দক্ষতার সাথে প্যারাগ্লাইডার অবতরণ করালেন বসন্তজী। একটু দৌড়ে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম । সঙ্গে সঙ্গে সাহায্যকারি দল এসে আমাদেরকে প্যারাগ্লাইডের ভিতর থেকে বের হতে সাহায্য করলেন। শেষ হলো প্রায় ৪০ মিনিটের প্যারাগ্লাইডে উড্ডয়ন।

প্যারগ্লাইডিং শেষে ফেওয়া লেকের পাশে


ফেউয়া লেকের ধারে দাঁড়িয়ে তখনও অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল ভেসে বেড়ানোর মুহূর্তগুলোকে। কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে মনে হয়েছিল পাখি। মনে হয়েছিল- ‘মানুষ আমি, আমার কেনো পাখির মতো মন?’ ঘোর থেকে বের হয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে দিলাম লেকের ধারে। অপেক্ষা করছিলাম অন্যান্য ভ্রমণচারীদের জন্যে। অবশেষে, অপেক্ষামান ২টি গাড়ির ১টিতে করে ফিরে এলাম অ্যাডভেঞ্চার শেষে আমাদের গন্তব্যে- হোটেল লেক টাওয়ার ভিউতে। ঘড়ির সময় মিলাচ্ছিলাম কিছুক্ষণ পর পর। কিছুক্ষণের মধ্যে রওনা দিতে হবে পোখরা থেকে রাজধানী কাঠমুন্ডুর উদ্দেশে। পরেরদিন বাংলাদেশ বিমানের টিকিট রয়েছে দেশের ফেরার জন্যে।


নেপালের পোখরায় অ্যাডভেঞ্চার প্যারাগ্লাইডিং বিস্তারিত:
স্থান: পোখরায় সারাংকোট ভিউ পয়েন্ট
মূল্য: ৮০০০ নেপালী রুপি ( ভিডিও সহ)
উড্ডয়ন সময়কাল: ৩০ মিনিট
সতর্কীকরণ: পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখা দায়িত্বশীল ট্যুরিজমের দায়িত্ব। দেশের বাইরে একজন বাংলাদেশী হিসেবে নিজের এবং দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় সর্বদা সচেতন থাকা বাঞ্চনীয়।

(কৃতজ্ঞতায়: এম হোসাইন সবুজ এবং বিষ্ণু ধীমারে)

লেখক পরিচিতি:
মার্জিয়া লিপি
লেখক, প্রাবন্ধিক ও পরিবেশবিদ।
প্রকাশিত বই ‘আমার মেয়েঃ আত্মজার সাথে কথপোকথন’, ‘৭১ মুক্তিযোদ্ধার মা’, Conversation With My Unborn Child ‘বাংলাদেশের উপকূল: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য’, ‘জীবনীগ্রন্থ সরদার ফজলুল করিম’, সম্পাদনা: ‘সরদার ফজলুল করিম দিনলিপি’, ‘মাঃ দুইবাংলার সাহিত্য সংকলন’, ‘শিশু বিশ্বকোষ’ ইত্যাদি। মার্জিয়া লিপির প্রকাশিত অন্যান্য ভ্রমণকাহিনী পড়তে ক্লিক করুন এই লিংকে: https://www.vromonguru.com/author/Lipi

ফিচার ছবি: এম হোসাইন সবুজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top